উদীয়মান অর্থনীতির সহায়তায় ব্রিকস

বর্তমান বিশ্বে প্রধান উদীয়মান জাতীয় অর্থনীতির দেশ হিসেবে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা সংযুক্তকে ধরা হচ্ছে। ব্রিকস ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সংক্ষিপ্ত রূপ। গোল্ডম্যান স্যাকসের অর্থনীতিবিদ জিম ও’নিল ২০০১ সালে ব্রিক (দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়া) শব্দটি তৈরি করেছিলেন এবং দাবি করেছিলেন যে ব্রিক অর্থনীতি, ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আধিপত্য অর্জন করবে। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা এই তালিকায় যুক্ত হয়েছিল। ২০০১ সালে জিম ও’নিল তার একটি গবেষণাপত্র ‘বিল্ডিং বেটার গ্লোবাল ইকোনমিক ব্রিকস’-এ এই বিষয় নিয়ে প্রথম আলোচনা করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তবে প্রকৃত প্রতিবেদনটির গবেষণা সহকারী রূপা পুরুষোথমন  (Roopa Purushothaman)  মূলত এই ধারণার জন্ম দেন বলে অনেকেই বলে থাকেন। এই গবেষণাপত্রে অর্থনীতির এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতির অবস্থা নিয়ে তারা আলোচনা করেন, বিশেষ করে জি-৭ এবং কিছু বৃহত্তর উদীয়মান বাজার অর্থনীতির মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে এই পত্রে তুলে ধরা হয়।

২০০৯ সাল থেকে ব্রিকস দেশগুলো আনুষ্ঠানিক সম্মেলনে বার্ষিক মিলিত হতে শুরু করে। সম্মেলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার। এ ছাড়া কীভাবে এ দেশগুলো ভবিষ্যতে আরও ভালোভাবে সহযোগিতা করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা ছিল। উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নত করার উপায় নিয়েও আলোচনা হয়েছিল। রাশিয়ার ইয়েকাটারিনবুর্গে সম্মেলনের পরে, ব্রিক দেশগুলো নতুন বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রার প্রয়োজনীয়তা ঘোষণা করেছিল, যা হতে হবে ‘বৈচিত্র্যময়, স্থিতিশীল এবং অনুমানযোগ্য’। তখন এই মুদ্রা অন্যান্য প্রধান মুদ্রার তুলনায় ডলারের মূল্যহ্রাসের সূচনা করেছিল। বেশ পরে, ২০১২ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত চতুর্থ ব্রিকস সম্মেলনে একটি ব্যাংক স্থাপন করা যায় কি না সেটি নিয়ে একটি ধারণা প্রস্তাব করা হয়েছিল। ওই সভার প্রধান বিষয় ছিল একটি নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা নতুন উন্নয়ন ব্যাংক নির্মাণ। এ দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীদের এই উদ্যোগের সম্ভাব্য এবং বাস্তবতা পরীক্ষা করার জন্য এবং এটা নিয়ে আরও পড়াশোনার জন্য একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়। ২০১৩ সালের পরবর্তী শীর্ষ সম্মেলনে সেই রিপোর্ট উপস্থাপন করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। ফলে ব্রিকস নেতারা ২৭ মার্চ ২০১৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান শহরে অনুষ্ঠিত পঞ্চম ব্রিকস সম্মেলনে একটি উন্নয়ন ব্যাংক স্থাপনে রাজি হন বা সম্মতি দেন। ব্রাজিলের ফোর্টালিজা শহরে ২০১৪ সালে ষষ্ঠ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের সময় নেতারা নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) প্রতিষ্ঠার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। সেই ফোর্টালিজা ঘোষণাপত্রে নেতারা জোর দিয়েছিলেন যে, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) ব্রিকসের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করবে এবং বৈশ্বিক বিকাশের জন্য বহুপক্ষীয় ও আঞ্চলিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রচেষ্টাকে পরিপূরক করবে। এভাবে শক্তিশালী, টেকসই ও সুষম বিকাশের লক্ষ্য অর্জনের জন্য সম্মিলিত প্রতিশ্রুতিতে অবদান রাখবে। ২০১৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জনগণের প্রজাতন্ত্রের চীন সরকারের সঙ্গে সদর দপ্তরের চুক্তি এবং সাংহাই পৌর জনগণের সরকারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সময় নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) পুরোপুরি কার্যকর হয়েছিল।

নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) ব্রিকস দেশগুলো (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা) দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি বহুমুখী উন্নয়ন ব্যাংক। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) তার ম্যান্ডেট বাস্তবায়নের জন্য এবং কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের লক্ষ্যে টেকসই অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোর একটি শক্তিশালী এবং বৈচিত্র্যময় পোর্টফোলিও তৈরি করছে। উল্লেখ্য, আগে এটি ব্রিকস ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক নামে পরিচিত ছিল। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) চুক্তির মতে ব্যাংকঋণ, গ্যারান্টি, ইক্যুইটি অংশগ্রহণ এবং অন্যান্য আর্থিক উপকরণের মাধ্যমে সরকারি বা বেসরকারি প্রকল্পগুলোকে সমর্থন করবে। তা ছাড়া নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং অন্যান্য আর্থিক সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা করবে এবং ব্যাংক দ্বারা সমর্থিত প্রকল্পগুলোর জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে।

এই আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে (এনডিবি) ১ শতাংশ শেয়ার চায় বাংলাদেশ। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে (এনডিবি) যোগদান এবং আনুষঙ্গিক এসব বিষয়ে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে। বৈঠকে শেয়ারের পাশাপাশি ঋণের সুদের হার, রেয়াতকাল, চাঁদার পরিমাণ ইত্যাদি বিষয়েও আলোচনা করা হয়েছে। এই ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে যোগ দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে আগেই। এই ব্যাংকে (এনডিবি) যোগদান বাংলাদেশের জন্য সার্বিক অর্থেই কল্যাণকর হবে বলে মনে করা যায়। এর সদস্য হলে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি বাড়বে অনেক গুণ। বর্তমানে এই ব্যাংকে যোগ দেওয়ার বিষয়টি খুব সময়োপযোগী। কারণ, এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থা থেকে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে পারে বাংলাদেশ। কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। ১ শতাংশ শেয়ার থাকার সুবিধা থাকলে বা বেশি হারে শেয়ার থাকলে নীতিনির্ধারণী আলোচনায় বাংলাদেশের একটা প্রভাব থাকার সুযোগ থাকে। আবার ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। সেদিক থেকে শেয়ার ধারণও বাংলাদেশের জন্য সম্মানজনক ও লাভজনক হবে। গত বছর ১৭ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে বাংলাদেশকে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে (এনডিবি) যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বৈঠকের পর যোগ দেওয়ার ব্যাপারে লাভ-ক্ষতির বিষয়ে বিশ্লেষণ করা হয়। আগামী ২০২৪ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হওয়ার পর সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার সুযোগটি সীমিত হয়ে যাবে আশঙ্কা করা যায়। ৫ বছরমেয়াদি অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২১-২৫), টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), ভিশন-২০৪১, ডেল্টাপ্ল্যান বাস্তবায়ন এবং কভিড-১৯-পরবর্তী চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার লক্ষ্যে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন অর্থায়নের উৎস হিসেবে সূচনা করবে বলে আশা করছে সরকার।

আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশসহ ১১টি দেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বেরিয়ে যাবে। তবে আগামী বছর স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার জন্য সুপারিশ করতে পাঁচটি দেশকে বাছাই তালিকায় রেখেছে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। আগামী ২২-২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় সভায় সিডিপি ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন করবে। ওই তালিকায় বাংলাদেশ আছে। অপর চার দেশ হলো নেপাল, মিয়ানমার, লাওস ও তিমুর লেসেতে। যদিও এর মধ্যে নেপাল ও তিমুর লেসেতে ২০১৮ সালেই সুপারিশ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) ওই দুদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই না হওয়ায় সুপারিশ করেনি বা নাম প্রস্তাব করেনি। অবশ্য নেপাল তখনো ভূমিকম্পের ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এবারের মূল্যায়নে করোনার প্রভাবও বিবেচনা করা হবে বলে ধারণা করা যেতে পারে।

ইতিমধ্যে কভিড-১৯ মহামারির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার লক্ষ্যে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কার্যক্রমে ব্যাংকটি অংশগ্রহণ করছে। গত বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে এই ব্যাংকটি একসঙ্গে ৭২টি প্রকল্পে ২৫.৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এনডিবি) সদস্যপদ অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য ব্যাংকের পণ্য এবং পরিষেবা ক্রয়কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, সহনীয় সুদহারে ঋণ নেওয়ার সুযোগ তৈরি, ব্যাংকের কৌশল, নীতি, পদ্ধতি ও কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ এবং সদস্য দেশের নাগরিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ফলে বাংলাদেশি দক্ষ ব্যক্তি এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এনডিবি) আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১৫ সালের ২১ জুলাই। ব্যাংকটির মূলধন ১০ হাজার কোটি ডলার। এ ছাড়া প্রাথমিক মূলধন পাঁচ হাজার কোটি ডলার রাখা হয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে এনডিবি অবকাঠামো এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ব্রিকসভুক্ত দেশে ১.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ বিতরণ করেছে। এ ছাড়া ব্যাংকটি অবকাঠামো, সেচ, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, পয়ঃনিষ্কাশন, সবুজ জ্বালানি এবং নগর উন্নয়ন খাতসংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নে ঋণ দিয়ে থাকে। ফলে এটা হতে পারে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এক নয়া আশীর্বাদ।

লেখক ব্যাংকার ও গবেষক

liplisa7@gmail.com