রাজধানীর মিরপুর বেড়িবাঁধ সংলগ্ন সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ করায় ইতিমধ্যে দর্শনার্থীদের কাছে এলাকাটি গোলাপ গ্রাম নামেই পরিচিত পেয়েছে।
বছরজুড়েই নদী পথে এবং সড়ক পথে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পরিবার, বন্ধুদের নিয়ে এই গোলাপ গ্রামে ঘুরতে আসেন বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ।
কারণ ফুলকে ভালোবাসে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। জন্মদিন থেকে মৃত্যুদিনে সর্বত্র ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে ফুলের ব্যবহার হয়। এর সুবাস এবং সৌন্দর্য প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়।
সরেজমিনে গোলাপ গ্রাম ঘুরে ফুল চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছরের শেষ দিকে ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত এখানে উৎপাদিত বিভিন্ন জাতের ফুলের চাহিদা এবং দাম বেশি থাকে।
এর মধ্যে ফেব্রুয়ারি মাসে ফুলের চাহিদা বৃদ্ধি ও দাম ভালো থাকায় দিন-রাত পরিশ্রম করেও কৃষকের মুখে হাসি ফুটে উঠে।
ইউনিয়নটির কালিয়াকৈর, বাগ্নিবাড়ি, সাদুল্লাহপুর, মৈস্তাপাড়া ও শ্যামপুরসহ প্রায় প্রতিটি গ্রামেই বছরজুড়ে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন প্রায় ৮০ ভাগ লোক।
রাজধানীর বিখ্যাত ফুলের বাজার শাহবাগ, আগারগাঁও ছাড়াও এখানকার আকর্ষণীয় গোলাপের চাহিদা রয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে।
বছর জুড়ে গোলাপের চাহিদা থাকলেও বিশেষ উৎসবের দিনগুলোতে এর চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়। নিজেদের প্রয়োজনেই চাষিরা গড়ে তুলেছেন ফুলের বাজার।
প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে বেচাকেনা চলে রাত পর্যন্ত। প্রতিদিন ছয় থেকে আট লাখ টাকার গোলাপ কেনা-বেচা হয় এই বাজারে।
তবে বিশ^ব্যাপী করোনার কারণে গত ৬-৭ মাস ফুল বিক্রি না হওয়ায় ফুলচাষীদের জীবনে নেমে আসে দুঃখ দুর্দশা এবং হতাশা।
ফুল বিক্রি করতে না পারায় ফুল বাগানেই শুকিয়ে ঝড়ে গেছে।
গত এক মাস ধরে করোনার প্রকোপ না থাকায় আবারও দর্শনার্থীরা ভিড় জমাচ্ছেন সাভারের গোলাপগ্রাম খ্যাত বিরুলিয়া এলাকায়।
প্রতিদিনই নদীপথে এবং সড়ক পথে আসা দর্শনার্থীরা। বাগান ঘুরে দেখার পাশাপাশি নিজেদের চাহিদা ও পছন্দ অনুযায়ী ফুল কিনছেন তারা।
এ ছাড়া পয়লা ফাল্গুন, ভালোবাসা দিবস ও অমর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে ঘিরে বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা।
দাম ভালো থাকায় করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে প্রকৃতিজুড়ে উৎসবের আগমনী বার্তা ঘিরে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন এখানকার ফুল চাষিরা।
ফুল চাষি নজরুল ইসলাম বলেন, করোনার কারণে গত এক বছরের বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন বন্ধ থাকায় ফুল বিক্রি করতে পারিনি। এ সময় বাগানের ফুল বাগানেই শুকিয়ে গেছে। একমাত্র আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় টিকে থাকার জন্য বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করেছে অনেকেই।
অপর চাষি জহিরুল হক বলেন, গত ৬ মাস ফুল বিক্রি না হওয়ায় আমরা আর্থিকভাবে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এরপরও ফেব্রুয়ারি মাসকে ঘিরে ক্ষতি পুষিয়ে লাভবান হওয়ার স্বপ্নে বাগানে সার, বিষ দিয়ে পরিচর্যা করে গেছি।
বর্তমানে করোনার পরিস্থিতির উন্নতির কারণে আগের চেয়ে ফুল বিক্রি এবং দামও ভালো পাইতেছি। আর কোন সমস্যা না হলে এই মাসেই পূর্বের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন।
প্রান্তিক চাষি সুরুজ মিয়া বলেন, সারা বছর গোলাপের চাষ হলেও ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত গোলাপ ফুলের জমজমাট মৌসুম থাকে। এ সময় তিন’শটি ফুলের একটি বান্ডিল বিক্রি হয় ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা। তবে অফ সিজনে বান্ডিল বিক্রি হয় ১৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকায়। এ জন্য অনেক কৃষক বিভিন্ন দিবসকে টার্গেট করে ফুলের চাষ বেশি করেন।
ফুল চাষ টিকিয়ে রাখতে কৃষকদের বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে উদ্বুদ্ধ করার করা হয়।
করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ফুল চাষিদের সহায়তার জন্য উপজেলা পরিষদ থেকে অর্থায়ন পেয়েছি যা খুব শিগগিরই প্রদান করা হবে। প্রতিবছর প্রায় তিন’শ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হলেও এবার করোনার প্রভাবে কিছুটা কমেছে। এরপরও এবার দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার ফুল বিক্রি হতে পারে জানান তিনি।