মিয়ানমারে দীর্ঘায়িত সামরিক শাসনের শঙ্কা

মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধস নামিয়ে বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দেওয়া ব্যক্তিটি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার জন্য এ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে মাত্র বারদুয়েক উপস্থিত হয়েছেন। ভাষণের সময় স্পষ্টতই অপ্রস্তুত জেনারেল মিন অং হ্লাইং তার অভ্যুত্থান, নির্বাচিত নেতাদের আটক রাখা, মিয়ানমারের সর্বত্র এবং সর্বস্তরের জনগণের তরফ থেকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, আন্তর্জাতিক মহলের নিন্দার ঝড় বা নতুন করে নিষেধাজ্ঞার হুমকি বিষয়ে কোনো কিছু উল্লেখ করেননি। এর পরিবর্তে তিনি আওড়েছেন শৃঙ্খলা আর ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে গৎবাঁধা পুরনো সামরিক বুলি। গত নভেম্বরের নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগেরও পুনরাবৃত্তি করেন তিনি যে অভিযোগ এখনো নিরপেক্ষ সূত্র থেকে সমর্থিত হয়নি।

বিশ্বের অন্যান্য দেশ এবং গত নভেম্বরে বিপুলসংখ্যায় ভোট দেওয়া লাখো বর্মীর দৃষ্টিকোণ থেকে এই অভ্যুত্থান হচ্ছে সামরিক বাহিনীর বেপরোয়া এক ক্ষমতা দখল যারা কিনা ব্যালট বাক্সে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আর এতে ভূমিকা রেখেছেন এমন এক কমান্ডার যার এই বছরের জুলাই মাসেই অবসরে যাওয়ার কথা ছিল। আসন্ন অবসরের পরে তার ক্যারিয়ারের সম্ভাব্য চিত্রটি ছিল খুবই অনুজ্জ্বল। কিন্তু মিয়ানমারের জেনারেলরা নিজেরা এটিকে সেভাবে দেখেন না। তারা সশস্ত্র বাহিনীর প্রভাবশালী ভূমিকা বহাল রাখার জন্য নতুন সংবিধান তৈরিতে বছরের পর বছর ব্যয় করেছেন। মিয়ানমারের রাজনৈতিক চালচিত্রকে তারা এখনো ‘শৃঙ্খলা শিখতে থাকা গণতন্ত্র’ বলে অভিহিত করেন। এই ‘গণতন্ত্র বিকাশ’ প্রকল্পটি তাদের পছন্দ নয় এমন কোনো পথে এগোলে তারা সবসময়ই হস্তক্ষেপের অধিকার সংরক্ষণ করে এসেছেন। মিন অং হ্লাইয়ের সঙ্গে যখনই আমার দেখা হয়েছে তখনই তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ‘সামরিক বাহিনীর কাজ গণতন্ত্র রক্ষা করা।’ বেশ কয়েক বছর ধরে মিয়ানমারে বসবাসরত এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বিবিসিকে বলেছেন এ কথা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কূটনীতিক বলেন, ‘সশস্ত্র বাহিনীর বক্তব্য হচ্ছে, তাদের এই পদক্ষেপ নিতে হয়েছে কারণ মিয়ানমারের গণতন্ত্র ত্রুটিপূর্ণ। এটাই অভ্যুত্থানের পক্ষে তাদের যুক্তি। সশস্ত্র বাহিনী বিশ্বাস করে, তারা সংবিধান অনুযায়ীই কাজ করেছে। তাদের প্রত্যাশা বহির্বিশ্ব এটা বুঝতে পারবে। তারা মনে করে না যে, যা ঘটেছে তা একটি অভ্যুত্থান।

মিয়ানমারের ২০০৮ সালের সংবিধান একটি হাইব্রিড গণতন্ত্রের জন্ম দিয়েছে। শুধু বাছাই করা প্রতিনিধিদের দিয়ে এর আগের মেয়াদের সামরিক শাসনে এটি প্রণীত হয়েছিল। ওই সংবিধানে ‘তাতমাদো’ নামে পরিচিত সশস্ত্র বাহিনীর জন্য পার্লামেন্টের উচ্চ ও নিম্নকক্ষে এক-চতুর্থাংশ আসন নিশ্চিত রাখা হয়েছে। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তিনটি শক্তিশালী মন্ত্রণালয়ের ওপর তারা নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রেখেছিল। প্রাদেশিক প্রশাসনের ওপরও ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ ছিল তাদের। এই সংবিধানে অ-বর্মী স্বামী-স্ত্রী বা সন্তান রয়েছে এমন ব্যক্তিকে প্রেসিডেন্ট পদেও অযোগ্য করা হয়েছে। এতে অং সান সু চি শীর্ষ পদটি থেকে বাদ পড়ে যান। তার প্রয়াত স্বামী মাইকেল অ্যারিস ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক। সন্তানও তাই।

সু চির মুক্তির মধ্য দিয়ে ২০১০ এর শেষের দিকে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা শুরু করার সময় মিয়ানমারের জেনারেলরা আশা করেছিলেন, রাজদন্ড তাদের হাতেই থাকবে। মনে আশা ছিল ২০১৫ সালের নির্বাচনে তাদের পুতুল রাজনৈতিক দল ইউএসডিপি অনির্বাচিত সামরিক এমপিদের সঙ্গে মিলে এনএলডির একক দল হিসেবে সরকার গঠন করা ঠেকাতে সক্ষম হবে। এ কারণে নিজেদের পরাজয়ের মাত্রা দেখে তারা হতবাক হয়ে যান। এনএলডি সরকারের হতাশাজনক কার্যকলাপের প্রেক্ষাপটে গত বছরের নির্বাচনে তুলনামূলকভাবে আরও ভালো ফলাফল প্রত্যাশা করেছিল সেনাবাহিনী। অথচ পার্লামেন্টে তাদের আসন আরও কমে সাত শতাংশেরও নিচে নেমে আসে। সশস্ত্র বাহিনী তাদের পছন্দের ধরনের গণতন্ত্র রক্ষার জন্য ক্ষমতা দখল করেই বসায় এ প্রশ্নটা উঠেই আসে যে, তাদের পরবর্তী করণীয় কী হবে। অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে ক্রমেই গড়া ওঠা এক জাতীয় প্রতিরোধ আন্দোলন মোকাবিলা করা হবে তাদের তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ। মিয়ানমারের সবার মনে প্রশ্ন যে জান্তা অতীতের মতো ব্যাপক রক্ত না ঝরিয়ে এটি করতে পারবে কি না। সামরিক জান্তার জন্য এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক বৈধতা ফিরে পাওয়া। সামরিক কর্তৃপক্ষ ভোটের বাক্সে এনএলডির ‘পাকাপোক্ত জনপ্রিয়তার সমস্যা’ সুরাহা করার জন্য নিজেদের এক বছর সময় দিয়েছে। তবে তার মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ইতিমধ্যে অং সান সু চি এবং নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট উইন মিন্টের (তিনি এনএলডির লোক) বিরুদ্ধে হাস্যকর ও তুচ্ছ ধরনের অপরাধের অভিযোগ দায়ের করেছে। এনএলডি সদর দপ্তর এবং সারা দেশে নির্বাচন কমিশনের অফিসগুলোতে যে নৈশকালীন অভিযান চালানো হয়েছে তার লক্ষ্য সম্ভবত এমন সব নথিপত্র জোগাড় করা যা সামরিক বাহিনীকে আরও বিশ^াসযোগ্যভাবে নির্বাচনী কারচুপির মামলা দিতে সহায়তা করতে পারে। এতে সু চিসহ অন্য শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ভবিষ্যৎ নির্বাচন থেকে অযোগ্য ঘোষণা করা যেতে পারে।

মিয়ানমারে এই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে জনসাধারণের ব্যাপক প্রতিবাদের মাত্রা থেকে ধারণা করা যায়, ভবিষ্যতে মোটামুটি সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও ইউএসডিপি বা তাতমাদো সমর্থিত অন্য কোনো দল গত নভেম্বরের চেয়েও খারাপ ফল করতে পারে। অদূর ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচনে সামরিক বাহিনীর দলকে জয়ী করার জন্য নির্বাচনে যে পরিমাণ অপকৌশল আর দমন-পীড়ন লাগবে যে ওইসব অনিয়মের পর গঠিত সরকারের বৈধতা থাকবে না বললেই চলে। এর বিকল্প হচ্ছে আরও অনেক দিনের টানা সামরিক শাসন। জেনারেলরা আশা করতে পারেন যে, বয়স এবং ক্ষমতার বাইরে থাকার ফলে ৭৫ বছর বয়সী অং সান সু চি ও এনএলডি দৃশ্যপট থেকে বিদায় নেবে। বিগত দশ বছরের বিশাল উন্নতির পর এটি মিয়ানমারের জন্য অত্যন্ত মারাত্মক সমস্যার ইঙ্গিতবহ।

আন্তর্জাতিক প্রভাব নিয়ে অনেক কিছুই বলা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সরকার ইতিমধ্যে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের একার প্রভাব খুব কাজে আসবে না। রাজনৈতিক উদারীকরণের পর মিয়ানমারে প্রথম মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেরেক মিচেল বলেন, ‘আমাদের খুব বেশি প্রভাব খাটানোর সুযোগ নেই। আসল চাবিকাঠি আমাদের মিত্রদের হাতে। এটা খুবই জটিল পথ। কারণ মিত্রদের মধ্যে কেউ কেউ, যেমন জাপান, ভারত ও কোরিয়া মিয়ানমারে বিপুল বিনিয়োগ করছে। তারা দেশটিতে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বিগ্ন।’

ডেরেক মিচল বললেন, পশ্চিমা মিত্রদের এসব মাথায় রেখেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে অতীতের আমলের ঢালাও নিষেধাজ্ঞা আর ফিরবে না। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী গুরুত্ব দেয় এমন কিছু ক্ষেত্রের ওপর সীমিত রেখে (যেমন অর্থ, অস্ত্র ও মান মর্যাদা) সতর্কভাবে এগোতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে, এমনভাবে আর চলবে না। তবে তাতমাদো কি বিদেশিদের কথা কানে তুলবে? অর্থনীতি বেশি চাপে পড়লে হয়তো শুনবে। তবে গত এক দশকের পরিবর্তনকে এগিয়ে নেওয়া ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যবস্থাটি ধ্বংস করে ফেলায় সামরিক বাহিনী এখন চাইলেও কীভাবে পিছু হটবে তা স্পষ্ট নয়। যে কায়দায় উৎখাত হয়েছেন সেটি মাথায় থাকলে সু চি সেনাবাহিনীকে কোনো ছাড় দেবেন বলে মনে হয় না। আবার তাকে মুক্তি দিলেও অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে আরও বড় প্রতিবাদ শুরু হতে পারে। তাই জেনারেল মিন অং হ্লাইংকে হয়তো গদি আঁকড়ে থেকে চালিয়েই যেতে হবে। দীর্ঘায়িত হবে মিয়ানমারের সামরিক কুশাসনের পর্ব।

লেখক: বিবিসির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া প্রতিনিধি

বিবিসি অনলাইন থেকে ভাষান্তর: আবু ইউসুফ