পুরান ঢাকার সদরঘাটের ১ নম্বর লিয়াকত এভিনিউয়ে অবস্থিত ব্যাপ্টিস্ট চার্চ। মূল গেট পার হয়ে ভেতরে ঢুকলে চোখে পড়বে যীশুর বাণী ‘তোমাদের পিতা যেমন দয়ালু, তোমরাও তেমনি দয়ালু হও’। তবে চার্চের দায়িত্বে থাকা কর্তাদের দয়া হয়নি এখানকার ছাত্রাবাসে থাকা গরিব শিক্ষার্থীদের ওপর। সেখানে থাকা গাছ কাটার প্রতিবাদ করায় বহিষ্কার করা হয়েছে ১০ শিক্ষার্থীকে। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মুখে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ছাত্রাবাসটি। ফলে আশ্রয়হীন ও গরিব অর্ধশত শিক্ষার্থী অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
রাজধানী ঢাকার সদরঘাটের ১ নম্বর লিয়াকত এভিনিউয়ের বিবিসিএস হলটি প্রায় ১০৯ বছরের পুরনো ব্রিটিশ স্থাপত্য । এক সময় হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের গরিব শিক্ষার্থীদের এখানে থাকার সুযোগ থাকলেও তা এখন আর নেই। শুধু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদেরই এখানে থেকে পড়ালেখা করার সুযোগ রয়েছে।
ছাত্রাবাসটির একাধিক শিক্ষার্থী জানান, ‘বাংলাদেশ ব্যাপ্টিস্ট চার্চ সংঘ ছাত্রাবাস’র সংস্কারের জন্য ৩৪টি গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নেয় কর্র্তৃপক্ষ। এর মধ্যে কিছু কাটা হলে ছাত্রাবাসে থাকা শিক্ষার্থীরা তাতে বাধা দেন। শিক্ষার্থীরা এই গাছ কাটার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ছাত্রাবাসের ভেতরে প্রতিবাদ করেন। তাতেও গাছ কাটা বন্ধ না হলে তারা স্থানীয় কাউন্সিলরের কার্যালয়ে অভিযোগ করেন।
এ ঘটনায় ছাত্রাবাস কর্র্তৃপক্ষ ক্ষুব্ধ হয়ে গত ১ ডিসেম্বরের মধ্যে ছাত্রাবাস বন্ধ ঘোষণার নির্দেশ দেয়। প্রথমে ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ছাত্রাবাস বন্ধের নোটিস দিলেও পরে তা বাড়িয়ে ৩১ জানুয়ারি করা হয়। এর মধ্যে ৯ জানুয়ারি কমিটির সভায় দশ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাপ্টিস্ট চার্চ সংঘ ছাত্রাবাসে (বিবিসিএস) থেকে পড়াশুনা করছেন হেনরি ভাস্করভিল। হেনরি জানান, গত ৯ জানুয়ারি তাকে ছাত্রাবাস থেকে বহিষ্কার করা হয়। জন্মের পর তার মা মারা যান। বাবাও ২০১৭ সালে মারা যান। পড়ালেখায় প্রবল আগ্রহ থাকায় পোশাক কারখানায় কাজ করে ছাত্রাবাসের সিকিউরিটি মানি জমা দেন হেনরি। জানুয়ারির ৩১ তারিখ ছাত্রাবাসে ঢুকতে চাইলে তাকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। বহিষ্কারের নোটিস হাতে ধরিয়ে বের করে দেওয়া হয় তাকে।
হেনরি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাপ্টিস্ট চার্চ সংঘ ছাত্রাবাস একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান। গরিব মেধাবী ছাত্ররা এখানে থেকে পড়াশুনা করেন। আমার সামনে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা। ছাত্রাবাস থেকে বহিষ্কার করার পর সদরঘাটের বেঞ্চিতে রাত কাটাতে হচ্ছে। ঢাকায় পরিচিত স্বজন নেই যে সেখানে উঠব। এখন কী করব বুঝতে পারছি না।’
একই অবস্থা ছাত্রাবাসের আবাসিক ছাত্র হেন্ড্রিসনের। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। ছাত্রাবাস ছাড়া আমাদের থাকার কোনো জায়গা নেই। সামনে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা। এভাবে চলতে থাকলে আর অনার্স ফাইনাল দেওয়া হবে না। বাইরে কোনো মেসে উঠব, পরিবারের সে অবস্থাও নেই।’
নাম না প্রকাশ করার শর্তে ব্যাপ্টিস্ট চার্চের এক সদস্য বলেন, বর্তমান কমিটি দায়িত্ব গ্রহণের পর করোনা পরিস্থিতি বিবেচনা না করেই ছাত্রাবাসের সিট ভাড়া দেড়গুণ বাড়িয়ে দেয়। ৮০০ টাকার সিঙ্গেল সিট ১১০০ টাকা করা হয়। ১ হাজার টাকার সিট ১ হাজার ৬০০ টাকা করা হয়। হঠাৎ করে ভাড়া বাড়ানোয় ছাত্রদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। অনেকেই প্রতিবাদ করতে থাকেন। সর্বশেষ ছাত্রাবাসের ৩৪টি গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নেয় কর্র্তৃপক্ষ। ছাত্ররা গাছ কাটার বিরোধিতা করলে তাদের হল থেকে বের করে দেওয়া হয়।
গাছ কাটা ও ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রাবাসের ইনচার্জ অ্যালবার্ট বিকাশ বাড়ৈ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্রাবাসের বিদ্যুৎ বিলসহ অনেক টাকা বকেয়া আছে। সংঘের ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষ বলেছে বকেয়া পরিশোধ করতে, তাই ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া ছাত্রবাসে কিছু ফার্নিচার প্রয়োজন তাই গাছ কাটা হয়েছে।’
তবে ছাত্রদের বহিষ্কারের বিষয়ে বিবিসিএস হলের আহ্বায়ক প্রদীপ সরকার কথা বলতে রাজি হননি।