লাশবাহী মাইক্রোবাস চক্রের কাছে জিম্মি স্বজনরা

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে (রামেক) ঘিরে লাশ বহনকারী মাইক্রোবাসগুলোর একটি চক্র বেশ তৎপর। রামেক হাসপাতাল বা নগরীর যেকোনো বেসরকারি হাসপাতালে যে কেউ মারা গেলেই চক্রটি জড়ো হয়। তারা নিজেদের নির্ধারিত ভাড়াতেই সেই লাশ বহন করতে বাধ্য করে মৃত ব্যক্তির স্বজনদের। আবার ভাড়ার দরদামে না মিললে কেউ যদি অন্য কোনো গাড়ি ঠিক করে মরদেহ নিয়ে যেতে চায় তাতেও বাধা আসে। সেক্ষেত্রে চক্রের সদস্যদের জন্য গুনতে হয় চাঁদা।

গত রোববার বিকালে নগরীর লক্ষ্মীপুরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জয়নাল আবেদীন নামে মেহেরপুরের এক ব্যক্তি মারা যান। স্বজনরা নিজস্ব গাড়িতে করে লাশটি নিয়ে যাচ্ছিলেন বাড়ি। কিন্তু লাশবাহী গাড়ি চক্রের সদস্য আব্দুল্লাহ ও রাজন তাদের পথ আটকান।

তারা লাশ আটকে চাঁদা দাবি করেন। বলেন, এখান থেকে কোনো লাশ নিজ এলাকায় নিয়ে যেতে হলে তাদের রাজশাহীর মাইক্রোবাসে করেই নিয়ে যেতে হবে। তা না হলে তাদের লাশ বহনকারী মাইক্রো সমিতিকে ১০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হবে। এভাবে তারা লাশ আটকে রাখেন। দীর্ঘসময় এ নিয়ে বাগ্বিতন্ডা আর দর কষাকষির পর মৃতের স্বজনরা বিষয়টি পুলিশকে অবগত করেন।

পরে পুলিশ গিয়ে এই চক্রের সাত সদস্যকে আটক করে। এদের মধ্যে একজন জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। বাকিরা এখনো কারাগারে।

এর আগে গত ২ ডিসেম্বর রাজশাহী নগরীর আমানা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। রোগীর স্বজনরা লাশটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ নেওয়ার জন্য নিজেদের মতো একটি গাড়ি ভাড়া করেন। কিন্তু এরই মধ্যে হাজির হয়ে যায় লাশ টানা মাইক্রো চক্রের সদস্যরা। গাড়ি নিতে হবে তাদের। ভাড়া দিতে হবে সাড়ে ৫ হাজার টাকা। নিজস্ব গাড়িতে নিয়ে যেতে চাইলে তারা বাধা দেয়। বাধ্য হয়ে তাদের মাধ্যমেই লাশ নিয়ে যাওয়া হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

এমন ঘটনা প্রায় প্রতিদিনকারই। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিনই গড়ে মারা যান আনুমানিক ২৫ জন রোগী। কেউ মারা যাওয়ার পর স্বজনরা কান্নাকাটি শুরু করলেই সেখানে হাজির হয় মাইক্রোবাস চক্রের সদস্যরা। তাদের সঙ্গে দরদাম করতে গিয়ে অনেক সময় স্বজনরা ভুলতে বসেন কান্না। আর নিম্ন আয়ের পরিবারের কেউ মারা গেলে তাদের মাইক্রো চক্রের টাকা জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হয়। শুধুমাত্র রামেক হাসপাতালে কেউ মারা গেলেই এই চক্রের ফাঁদে পড়তে হয় এমনটা নয়। রাজশাহীর যেকোনো বেসরকারি হাসপাতালে কেউ মারা গেলেও একই বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন।

সূত্র জানায়, এই চক্রটির অবস্থান মূলত নগরীর লক্ষ্মীপুর এলাকাকে ঘিরেই। এর আশপাশেই তাদের অবস্থান। লাশবাহী মাইক্রোবাসের সিরিয়াল নিয়ন্ত্রণ করেন সেলিম রেজা। তিনি দাবি করেন, শুধু রাজশাহীতে নয়, দেশের অন্যান্য জেলাতেও নির্ধারিত গাড়িতেই লাশ বহন করা হয়।

এদিকে, পুলিশ বলছে গত কয়েকদিন ধরে তারা এ বিষয়ে খুবই তৎপর। রাজশাহী মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার গোলাম রুহুল কুদ্দুস জানান, এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পুলিশ তাদের ওপর নজর রাখছে।