ষষ্ঠ শ্রেণি : বাংলা প্রথম পত্র

কবিতা : সুখ

কবি : কামিনী রায়

সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর

আনোয়ার ও সানোয়ার দুই ভাই। বিভিন্ন ব্যবসা করে আনোয়ার প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছে। সহায় সম্পত্তি, আলিশান বাড়ি সবই করেছে সে। নিজের সুখের সব ব্যবস্থাই তার সামর্থ্য অনুযায়ী করেছে। অন্যদিকে সানোয়ার কেবল নিজের সুখ নিয়েই ব্যস্ত নয়। পরিবার ও পাড়া-প্রতিবেশী, সমাজের আর দশজনের সুখে-দুঃখে সে এগিয়ে যায় অকাতরে, দ্বিধাহীনভাবে। অন্যের উপকার করার সুযোগ পেলে আন্তরিকভাবে আনন্দিত হয়।

ক. ‘সমর’ শব্দের অর্থ কী?

খ. সংসারকে সমর-অঙ্গন বলা হয়েছে কেন?

গ. উদ্দীপকের সানোয়ার ‘সুখ’ কবিতায় বর্ণিত সুখী হওয়ার কোন প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করেছে ব্যাখ্যা করো।

ঘ. ‘আনোয়ারের সুখ প্রকৃত সুখ নয়।’ ‘সুখ’ কবিতার আলোকে মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করো।

উত্তর

ক. ‘সমর’ শব্দের অর্থ যুদ্ধ, লড়াই।

খ. সংসারে নানা রকম দুঃখ-যন্ত্রণা, সংকট মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে হয় বলে সংসারকে সমর-অঙ্গন বলা হয়েছে।

পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষই সুখের পেছনে মরিয়া হয়ে ছুটছে। কিন্তু জীবন পুষ্পশয্যা নয়। এখানে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সুখ পাখিকে ছিনিয়ে আনতে হয়। কঠিন তপস্যার মাধ্যমেই তা সম্ভব। যে জীবন-সংগ্রামে সফল হয়, সেই সুখ লাভ করে। তাই এ জগৎ সংসারকে সমর-অঙ্গন বলা হয়েছে।

গ. উদ্দীপকের সানোয়ার সুখী হওয়ার জন্য ‘সুখ’ কবিতার যে প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করেছে, তা হলো নিজের কথা না ভেবে অন্যের কথা ভাবা, নিজের স্বার্থকে বড় করে না দেখে অপরের স্বার্থকে বড় করে দেখা।

‘সুখ’ কবিতায় বলা হয়েছে যে, জীবনে সুখী হতে চাইলে অন্যকে আপন ভাবতে হবে। অন্যের সুখ-দুঃখের অংশীদার হতে হবে। প্রীতি, ভালোবাসা, সেবা ও কল্যাণের মাধ্যমে অন্যের মঙ্গলের চেষ্টা করতে হবে। অন্যের কল্যাণের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। পৃথিবীতে মানুষের সৃষ্টি হয়েছে অপরের কল্যাণের জন্য। নিজের ভোগবিলাসিতা ও আরাম-আয়েশের জন্য নয়। এসবের পেছনে ছুটলে মানুষ হয়ে যায় স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক। আর স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক মানুষ কোনো দিন প্রকৃত সুখ লাভ করতে পারে না। বরং নিজের সুখের জন্য ব্যগ্র হলে দুঃখভার আরও বেড়ে যায়। অপরের জন্য আত্মত্যাগের মধ্যেই রয়েছে পাওয়া যায় সুখের সন্ধান।

প্রকৃত সুখ লাভের এ প্রক্রিয়াটি হুবহু অনুসরণ করেছে উদ্দীপকের সানোয়ার। আনোয়ার যেখানে নিজের সুখের জন্য ব্যস্ত সেখানে সানোয়ার নিজের সুখ নিয়ে ব্যস্ত নয়। পরিবার ও পাড়া-প্রতিবেশীর সুখে-দুঃখে সে সর্বদা এগিয়ে যায়। প্রতিবেশীদের বিপদে শ্রম দিয়ে, অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করে। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের সানোয়ার সুখী হওয়ার জন্য ‘সুখ’ কবিতার অপরের কল্যাণে কাজ করার প্রক্রিয়াটিই অনুসরণ করেছে।

ঘ. ‘আনোয়ারের সুখ প্রকৃত সুখ নয়’ মন্তব্যটির যথার্থ।

কবি কামিনী রায় ‘সুখ’ কবিতায় বলেছেন, নিজের সুখ সুখ নয়, সবার কল্যাণ কামনায় নিহিত রয়েছে প্রকৃত সুখ। সবার কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত সুখ। দুঃখ-যন্ত্রণা সয়ে, সব সংকট মোকাবিলা করে জীবন-সংগ্রামে সফলতার মধ্যেই প্রকৃত সুখ অর্জিত হয়। কিন্তু সমাজের অন্য সবার কথা ভুলে কেউ যদি নিজের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন সে হয়ে যায় আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর। সমাজের আর দশজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া-ই হয় তার নিয়তি। আর মানুষ যেহেতু সামাজিক জীব, তাই একজন সমাজবিচ্ছিন্ন মানুষ কখনো প্রকৃত সুখ লাভ করতে পারে না।

উদ্দীপকের আনোয়ারের মধ্যে লক্ষ করা যায়, সে প্রবাসে গিয়ে প্রচুর সহায় সম্পদের মালিক হয়ে আত্মসুখে মগ্ন হয়ে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। আলিশান বাড়ির মালিক হয়ে সে নিজেকে এখন সমাজের উঁচুতলার মানুষ বলে মনে করে। অন্যের ব্যাপারে খোঁজখবর রাখার প্রয়োজন সে বোধ করে না। নিজের সুখের সব ব্যবস্থাই সে করেছে। কিন্তু আত্মকেন্দ্রিক মানুষ হওয়ায় প্রকৃত সুখ তার আজও অধরা। আনোয়ার আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর হয়ে সবাইকে বাদ দিয়ে নিজে একা সুখী হতে চেয়েছে। কিন্তু এভাবে প্রকৃত সুখ অর্জন সম্ভব নয়। অন্যের কল্যাণে ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমেই অর্জিত হয় প্রকৃত সুখ। অন্যের সুখের জন্য ত্যাগ স্বীকারে যে পরিতৃপ্তি তা নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার মধ্যে নেই।

তাই বলা যায়, আনোয়ারের সুখ প্রকৃত সুখ নয়।