এবার মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার নটেশ্বর দেউলে প্রত্নখননে ১১শ বছরের পুরোনো বৌদ্ধ কুঠুরি, সুরক্ষা প্রাচীরের অংশ ও নকশাকৃত ইট আবিষ্কৃত হয়েছে।
অষ্টকোনাকৃতির স্তূপের কেন্দ্র বিশেষ ধরনের এই বৌদ্ধ স্থাপত্যকে বলা হয় ‘স্মারক কুঠুরি’। বাংলাদেশের প্রথম আবিষ্কৃত এই স্মারক কুঠুরিতে গৌতম বুদ্ধ বা তার গুরুত্বপূর্ণ শিষ্যের দেহ ভস্ম বা ব্যবহৃত জিনিসপত্র রাখা হতো। স্মারক কুঠুরির গোলাকার অংশ বৌদ্ধ ধর্মের দর্শনের সৃষ্টিতত্ত্ব ‘শূন্যবাদের’ প্রতীকী রূপ।
বুধবার বেলা ১১ টার দিকে নটেশ্বর দেউলে ‘বিক্রমপুর অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণা’ শীর্ষক কর্মসূচি উপলক্ষে আয়োজিত এক প্রেস কনফারেন্সে এ তথ্য জানানো হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার, পুলিশ সুপার আব্দুল মোমেন পিপিএম, অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের সভাপতি ড. নূহ-উল-আলম লেনিন, বিক্রমপুর অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণা প্রকল্পের গবেষণা পরিচালক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান, টঙ্গিবাড়ী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জগলুল হালদার ভুতু, টঙ্গিবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদা পারভীন।
প্রেস কনফারেন্সে লিখিত বক্তব্যে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী জানান, নটেশ্বরে দ্বিতীয় পর্যায়ে সমস্ত স্থাপত্যে বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন প্রতীকী রূপে প্রতিফলিত হয়েছে। স্মারক কুঠুরির চতুস্কোণ ‘চার আর্য সত্যের’ আকার ১৮ মিটার বাই ১০ মিটার। ওপরের অংশ গোলাকার (৪ টি ধাপ), এর নিচের অংশ চতুস্কোণাকৃতি। আর সুরক্ষা প্রাচীরের অংশ ১৭ মিটার উন্মোচিত এবং নকশাকৃত ইট। স্মারক কুঠুরির গোলাগার অংশ বৌদ্ধ ধর্মের দর্শনের সৃষ্টিতত্ত্ব শূন্যবাদের প্রতীকী রূপ। শূন্যতত্ব অনুযায়ী শূন্যই হলো সব সৃষ্টি এবং বিলয়ের উৎস। স্মারক কুঠুরির চতুস্কোণের চার আর্যসত্য হলো- জীবনে দুঃখ আছে, দুঃখের কারণ আছে, দুঃখের বিনাশ আছে, দুঃখ বিনাশের উপায় আছে। দুঃখ বিনাশের উপায় হলো অষ্টমার্গ। অষ্টমার্গ হলো- সত্য জ্ঞান অর্জন/দুঃখ বিষয়ে যথার্থ জ্ঞান, সৎ সংকল্প, সৎ বাক্য, সৎ কর্ম, সৎ জীবিকা, সৎ চিন্তা, সঠিক চৈতন্য/চিত্তের প্রশান্তি, সৎ ধ্যান/সম্যক সমাধি/সঠিক ধ্যান। অষ্টকোনাকৃতি মূল স্তূপের আটটি কোন এই অষ্টমার্গের প্রতীকস্বরূপ।
প্রসঙ্গত, অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন ২০১০ সালে এ অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন, গবেষণা ও অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেয়। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সীমিত আর্থিক সহায়তায় ওই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক খনন। সার্বিক গবেষণা পরিচালনায় রয়েছেন নূহ-উল-আলম লেনিন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের তত্ত্বাবধানে জরিপ ও উৎখনন কাজে ঐতিহ্য অন্বেষণের গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা অংশগ্রহণ করেছেন। প্রথম বছর ২০১০ সালে জেলা সদরের রামপালের রঘুরামপুরে বৌদ্ধ বিহার আবিষ্কৃত হয়। এ ছাড়া জেলার টঙ্গিবাড়ী উপজেলার নটেশ্বরে প্রায় ১১শ বছর আগের একটি বৌদ্ধ মন্দির, অষ্টকোনাকৃতির ইটের নালাসহ অসংখ্য নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়। সেখানে খ্রিষ্টীয় অষ্টম বা নবম শতকে নির্মিত এই বৌদ্ধমন্দিরের সন্ধান পাওয়া যায়। এ ছাড়া বজ্রযোগিনী ইউনিয়নের তিনটি গ্রামে ৯ টি পরীক্ষামূলক উৎখনন পরিচালিত হয়। প্রতিটি প্রত্ন স্থানে প্রাচীন বসতির চিহ্ন পাওয়া গেছে।