বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তে দুই দেশের মধ্যে সংযোগকারী প্রথম কোনো নদী সেতুর উদ্বোধন হতে যাচ্ছে আজ।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বিবিসি জানায়, ফেনী নদীর ওপর নির্মিত সেতুটির নামকরণ করা হয়েছে ‘মৈত্রী সেতু’। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভার্চ্যুয়ালি সেতুটির উদ্বোধন করবেন।
প্রায় দুই কিলোমিটার লম্বা মৈত্রী সেতু নির্মাণ করেছে ভারতের সরকারি সংস্থা ন্যাশনাল হাইওয়েজ অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন লিমিটেড তথা এনএইচআইডিসিএল।
প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, সেতুর একপ্রান্তে দক্ষিণ ত্রিপুরার সাবরুম শহর, অন্যপ্রান্তে বাংলাদেশের রামগড়। আর চট্টগ্রাম বন্দরে সহজ অ্যাকসেসের মাধ্যমে এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যের ছবিটাই আমূল বদলে দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্থল সীমান্ত চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি লম্বা। এই সুদীর্ঘ সীমান্তের অনেক জায়গাতেই ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা, ইছামতী বা ফেনীর মতো অনেক নদীই দুই দেশকে আলাদা করেছে।
আন্তর্জাতিক সীমারেখা এই নদীগুলোর বুক চিরে গেলেও সীমান্তে দুই দেশকে সংযুক্ত করেছে এমন কোনো সেতু কিন্তু এত দিন ছিল না।
বলা হচ্ছে, সাবরুম ও রামগড়ের মাঝে ফেনী নদীর ওপর নির্মিত মৈত্রী সেতু সেই অভাবই শুধু মেটাবে না, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের একেবারে হাতের নাগালে এনে দেবে।
ত্রিপুরার উপ-মুখ্যমন্ত্রী তথা অর্থমন্ত্রী জিষ্ণু দেববর্মা বিবিসিকে বলেন, এই একটি সেতুই তার রাজ্যকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গেটওয়ে বা প্রবেশপথে পরিণত করবে।
তার কথায়, “এর মাধ্যমে ত্রিপুরা হয়ে উঠবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের লজিস্টিকাল গেটওয়ে। সুতরাং এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।”
“দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের তো সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আছেই, ভাষাগত বন্ধনও আছে। এই সেতুটা খুলে গেলে আমাদের মধ্যে ব্যবসায়িক বন্ধনও আরও ভালোভাবে গড়ে উঠবে।”
“এতে আমাদের নেইবারহুডের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করার খুব সুবিধে হবে। আমাদের ব্যবসায়ীরা পুরো ভারতে মালপত্র পাঠাতে পারবেন, পূর্ব এশিয়াতেও নতুন একটা দিগন্ত খুলে যাবে আমাদের জন্য।”
“আজকের যুগে একটা লজিস্টিক হাব হয়ে উঠতে পারাটা খুব জরুরি। সেখানে ত্রিপুরার মতো ছোট্ট একটা স্থলবেষ্টিত রাজ্য, সেরকম একটা হাব হয়ে উঠতে পারে শুধু এই ব্রিজটার সুবাদে”, বলছিলেন ত্রিপুরার এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ।
আরও জানান, এই রুটে ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্ট দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ কোনো শুল্ক নেবে কিনা, বা নিলেও কী হারে নেবে - সেটা এখনো স্থির হয়নি।
মৈত্রী সেতুর মোট দৈর্ঘ্য ১.৯ কিলোমিটার, বানাতে খরচ হয়েছে ১৩৩ কোটি রুপি। সময় লেগেছে প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর।
ভারত সরকার আরও জানিয়েছে, মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী মোদি সেতুর সাবরুমের দিকে একটি ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্টেরও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন।
দিল্লির থিঙ্কট্যাঙ্ক রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমের অধ্যাপক ও আঞ্চলিক কানেকটিভিটির বিশেষজ্ঞ ড. প্রবীর দে-ও বলছেন, এই সেতুর মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশ - উপকৃত হবে দুপক্ষই।
“আমার মতে এই ব্রিজটা একটা গেম চেঞ্জার, কারণ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে পণ্য চলাচল যেমন এতে সহজ হবে, তেমনি চট্টগ্রাম বন্দরেরও অ্যাকসেস মিলবে অনায়াসে। তার কারণ, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সীমান্তের রামগড়ের দূরত্ব মাত্র আশি কিলোমিটার - তারপরেই ব্রিজ পেরিয়ে ভারতে ঢুকে পড়া যাবে।”
আরও বলেন, “বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিমধ্যেই ভারতকে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন, সে দেশের পার্লামেন্টও সে প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে। তবে এই ট্রানজিট বা ট্রান্সশিপমেন্ট-টা শুধু ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্যই।”
“এখন যেটা হয়, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কার্গো এই পথে আসতেই পারে না। কিন্তু ব্রিজটা খুলে গেলে তাদের মালপত্র চট্টগ্রাম দিয়ে সারা ভারতে আনা-নেওয়া করাটা অনেক অনেক সহজ হবে।”
“ফলে পরিবহনের খরচ অনেক কমবে, সময়ও কম লাগবে - যে দুটো ফ্যাক্টর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এত দিন প্রধান অসুবিধা ছিল”, বলেন প্রবীর দে।
এর পাশাপাশি মৈত্রী সেতু যাতায়াতের জন্য খুলে গেলে আসাম, ত্রিপুরা বা মিজোরাম থেকেও পর্যটক বাংলাদেশের কক্সবাজার কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো জায়গাগুলোয় অনেক সহজেই যেতে পারবেন।
২০১৫ সালের জুন মাসে যখন এই সেতু প্রকল্পের সূচনা করা হয়, তখন ঢাকাতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনা মিলে যৌথভাবেই এর উদ্বোধন করেছিলেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব থাকবে কিনা সে ব্যাপারে ভারতীয় বিবৃতিতে কিছু বলা হয়নি।