বাইপোলার ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত হয়েও জীবনের ছন্দ হারাতে দেননি সালি অল্টার। জীবনকে সামলেছেন একহাতে। ৫৪ বছর বয়সে বিস্ময়করভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়েছেন এই নারী। তাকে নিয়ে লিখেছেন মুমিতুল মিম্মা
সালি অল্টার
১৯৪৭ সালে এক নিম্নবিত্ত পরিবারের সবার ছোট মেয়ে হিসেবে সালি অল্টারের জন্ম হয় লন্ডনে। পারিবারিক করুণ দশা সালির মনের স্বপ্নকে প্রভাবিত করতে পারেনি। গোবরে ফোটা পদ্মের মতো মেধাবী হিসেবে আত্মপ্রকাশ হয় তার। কিন্তু পারিবারিক সিদ্ধান্তের ফলে ভালো স্কুলে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন তিনি। দারিদ্র্যের কশাঘাতে বিপর্যস্ত সালি একসময় বাড়ি থেকে বিতাড়িত হন। চাকরি খুঁজতে গিয়ে নার্সিং পড়ার হাতেখড়ি হয় তার। পাশাপাশি চলতে থাকে বাইপোলার ডিজঅর্ডারের চিকিৎসা ও থেরাপি। ইংল্যান্ডের নামকরা সব হাসপাতালের মার্কেটিং ম্যানেজার হিসেবে কাজ করা সালি ৫৪ বছর বয়সে ভর্তি হন টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে সেরা ফলাফল নিয়ে বেরিয়ে আসেন তিনি।
ইলেভেন প্লাস পরীক্ষা
সে সময়ের ইংল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থা ছিল খুবই করুণ। এগারো বছর বয়সী ছাত্রছাত্রীদের তখন ইলেভেন প্লাস নামক একটি পরীক্ষায় বসতে হতো। ইংল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে তখন ইলেভেন প্লাস পরীক্ষা চালু ছিল। এটি ছিল মূল প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা। সাধারণত এগারো বারো বছর বয়সী বাচ্চারা এই পরীক্ষা দিতে বসত বলে বাচ্চাদের বয়সের নামানুযায়ী এই পরীক্ষার নামকরণ করা হয়। ইলেভেন প্লাস পরীক্ষায় পাস করলে শিক্ষার্থীরা গ্রামার স্কুলে ভর্তি হতে পারত। গ্রামার স্কুল তখন নামকরা মাধ্যমিক স্কুলগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই পরীক্ষায় পাস করা ছাত্রছাত্রীদের ভাগ্যে তখন ভালো মাধ্যমিক স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় অপেক্ষা করত। এমনকি চাকরির দুয়ারও খুলে যেত। এক কথায় একজন শিশুর জীবনের সব কিছু নির্ধারিত হয়ে যেত এই পরীক্ষার মাধ্যমে। ছোট শিশুদের জীবনে তখন এগারো বছর বয়সে এই প্রাথমিক পরীক্ষার ঝড় আসত। পাস করতে না পারলে তাদের ভাগ্যে জুটত কটূক্তি। সামাজিকভাবেও হেয় করা হতো তাদের। পরীক্ষায় ফেল করলে তারা চলে যেত সেকেন্ডারি স্কুলে। ১৫ বছর বয়সে সেই স্কুল শেষ হতো। ভালো চাকরি, সুযোগ-সুবিধার কিছুই পেত না তারা।
বেশ কঠিন হলেও ১৯৫৮ সালের সেই ইলেভেন প্লাস পরীক্ষায় সালি অল্টার পাস করে গেলেন। নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান সালির ভাগ্য যেন সত্যিই খুলে গেল। সালির সেই ছোট্ট মনে দুর্বার স্বপ্ন সে লেডি ইলিনর হলিস স্কুলে ভর্তি হবে। তখন লন্ডনে মেয়েদের জন্য বিখ্যাত স্কুল- লেডি ইলিনর হলিস। সচ্ছল পরিবারের মেধাবী মেয়েরা এই স্কুলে ভর্তি হয়। সালির পরিবারের না হয় সচ্ছলতা নেই, তাই বলে কি সে মেধার জোরে লেডি ইলিনর হলিস স্কুলে ভর্তি হতে পারবে না?
পারিবারিক জীবন
পৃথিবীর সব মায়েরা চান ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে।’ সালির মা-ও তার ব্যতিক্রম নন। সালির লেডি ইলিনর হলিস স্কুলে ভর্তি হওয়ার আশায় জল ঢেলে মা তার মেয়ের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানালেন না। সালির সহজ-সরল মা ভাবলেন মেধাবীদের স্কুলে সালি খাপ খাওয়াতে পারবে না। স্কুলের পড়াশোনার চাপও বেশি থাকবে। এত সব সামলাতে গিয়ে তার মেয়ে হয়তো অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। তাছাড়া সালির মায়ের বিশাল এক পরিবার সামলাতে হতো। সন্তান, শাশুড়ি, তিন ভাড়াটে সামলাতে গিয়ে তার সারা দিন কীভাবে যে ফুরিয়ে যেত তা তিনি নিজেও জানতেন না। তার ওপরে সালির মায়ের ছিল শ্বাসকষ্টের সমস্যা। তখনকার দিনের প্রথাগত নারী হিসেবে সালির মা চাইলেন মেয়ে তার সেকেন্ডারি স্কুলে পড়–ক এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সেবার ভার নিক। জীবনের দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে সালির মায়ের কাছে মেধাবীদের স্কুলে পড়াশোনাকে তার কাছে খানিকটা বাহুল্যই মনে হতে থাকে। অবশ্য সালির মাকে দোষ দেওয়া যায় না। নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ে ছিলেন তিনি। তীব্র দারিদ্র্যের মধ্যে তেমন পড়াশোনা করা হয়ে ওঠেনি তার। জীবনের তাগিদে বিয়ের আগে কাজ করতেন বেকারিতে। বিয়ের পরে সারা দিন রান্নাঘর আর পরিবারে লোকেদের যতœ করে আর কোনো ভাবনার ফুরসত মেলে না তার। কাজেই মেয়ের উচ্চাশাকে ছুঁয়ে দেখার ক্ষমতা সালির মায়ের থাকবে না এটাই স্বাভাবিক।
সালির মা সালিকে লেডি ইলিনর হলিস স্কুলের হেডমিস্ট্রেসের কাছে নিয়ে গেলেন। হেডমিস্ট্রেসের কাছে অনুরোধ করলেন তার মেয়েকে যেন সেকেন্ডারি স্কুলে ভর্তির জন্য সুপারিশ করা হয়। কারণ সেকেন্ডারি স্কুলের মেয়েরা টাইপিং শিখতে পারে। টাইপিং শিখলে ভবিষ্যতে মেয়ের আয়-রোজগারের জন্য ভাবতে হবে না। কিন্তু সহজ-সরল মায়ের এই ভাবনার ফলাফল হিসেবে সে সময় মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও সালিকে ‘মেধাহীন’ ট্যাগ লাগিয়ে ঘুরতে বাধ্য হয়েছে। অবশ্য সেকেন্ডারি স্কুলে ভর্তি হয়ে জীবনের মোড় ঘুরে গেল তার।
বাইপোলার ডিজঅর্ডার
দশ বছর বয়সে বাবা ও পনের বছর বয়সে সালি তার মাকে হারান। স্কুল ত্যাগ করে ভাইয়ের সঙ্গে বাস করা শুরু করেন। ভাইয়ের সংসারেও তখন ভীষণ টানাটানি। একরাতে ভাই তাকে ঘর থেকে বের করে দিলে উপায় না পেয়ে তিনি তার বোনের বাড়িতে যান। বোনের স্বামী তাকে ধর্ষণ করতে উদ্যত হলে বোনের বাড়ি থেকেও পালিয়ে যান সালি। নিরুপায় হয়ে লন্ডনের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে থাকেন। কফিশপে কিশোরী সালিকে দেখে এক লোকের খুব মায়া হয়। তার বাসায় তিনি তখন অচেনা সালিকে থাকার বন্দোবস্ত করে দেন। ভাইবোনের সঙ্গে এরপরে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি তার। তেমন কোনো পড়াশোনা না থাকায় ভালো কোনো কাজও জোটেনি তার। এরই মধ্যে সালির বাইপোলার ধরা পড়ে। মানসিক অবস্থার চূড়ান্ত উত্থান পতনে সালি তার চাকরি হারান। তখন কর্মচারীদের মধ্যে কোনো রোগ লক্ষণ দেখা দিলেই চাকরি চলে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক ছিল।
বাইপোলার ডিজঅর্ডারকে তীব্র বিষণœতা হিসেবে উল্লেখ করা হতো। একজন মানুষের মানসিক অস্থিরতার তীব্রতম বহিঃপ্রকাশ এই অসুস্থতা। এতে মানসিক অবস্থার এত ঘন ঘন পরিবর্তন হয় যে মানসিক শক্তি, মনোযোগ ও সারা দিনের সমস্ত কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। কোনো দিন ঘুম থেকে উঠে বাইপোলার আক্রান্ত মানুষটির মনে হতে থাকে সে খুব ভালো আছে। সে নিজেকে ভীষণ কর্মোদ্যম মনে করতে শুরু করে। যাকে বলা হচ্ছে ম্যানিয়াক ধাপ। কিছুক্ষণ পরেই হয়তো সে তীব্র বিষণœতায় আক্রান্ত হলো। এত খারাপ লাগতে থাকল তার যে, সে আর মনোযোগই ধরে রাখতে পারছে না কোনো কাজে। এই ধাপটিকে বলা হয় বিষণ্ন ধাপ। মানসিক অবস্থার এই ঘন ঘন ছন্দপতন তার মূল জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে।
খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বাইপোলার কোনো রোগ নয়। বাইপোলার আক্রান্ত মানুষের নাওয়া-খাওয়া ঘুমের মতো ম্যানিয়াক ও বিষণ্ন ধাপটিও সহজাত। ওষুধ ও ঠিকঠাক জীবনযাপনের মাধ্যমে একজন বাইপোলার আক্রান্ত মানুষ তার এই সমস্যাটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন যাতে তার স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত না হয়।
নার্সিং পড়ার শুরু
সালি তখন স্কটল্যান্ডে বসবাস করেন। তখন চাকরি ছিল না তার। চাকরির খোঁজে গ্লাসগো হাইস্ট্রিট ধরে কাকভেজা হয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। এক জায়গায় ‘স্বাস্থ্য পরিদর্শক’ হিসেবে চাকরির বিজ্ঞাপন দেখতে পেলেন। এই পদের নামই শোনেননি তিনি কখনো। কিন্তু মেধাবী মেয়ে সালির কাছে পদটা খুব আকর্ষণীয় লাগতেই দরজা ঠেলে অফিসের ভেতরে ঢুকে পড়লেন। অফিসে বসে থাকা নারী তাকে দেখে পরামর্শ দিলেন স্বাস্থ্য পরিদর্শক হিসেবে আবেদন না করে তার উচিত নার্সিং পড়া শুরু করা। কিন্তু বেশি একটা পড়াশোনা করেননি বলে সালি নার্সিং ভর্তি পরীক্ষায় টিকলেন না সে বছর। তবে হাল ছেড়ে দেননি। আটাশ বছর বয়সে সালি রেজিস্টার্ড নার্স হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। সঙ্গে ধাত্রীবিদ্যার কাজও শিখে নেন তিনি।
এবারে আর তিনি ভুল করেননি, কলেজে ভর্তি হয়ে গেলেন। তার মনে ভয় ছিল তার বাইপোলার আবার ফিরে আসতে পারে। তখন যেন তাকে চাকরিচ্যুত হতে না হয় সেই ব্যবস্থা করছিলেন। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। সালির বাইপোলার তাকে তাড়া করে ফিরল। তখনকার মানুষ মানসিক অবস্থা নিয়ে এত জ্ঞান রাখত না বলে মানসিক রোগকে লুকিয়ে রাখার চল ছিল তখন। বাইপোলারের ফলাফল হিসেবে পেনিক অ্যাটাকের মাঝখানেই সালি অফিস ছেড়ে বেরিয়ে যান। তখন অস্থির অবস্থায় গাড়ি চালানোর ফলে গাড়ি দুর্ঘটনায় তার আর সেই কলেজে ফিরে যাওয়া হয়নি।
চাকরি জীবন
কিছুদিন পরেই সালি মার্কেটিং ম্যানেজার হিসেবে লন্ডনের একদল হাসপাতালে কাজ নেন। সে সময় এই চাকরিকে খুব মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে ধরা হতো। ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে তাকে মার্কেটিংয়ের জন্য যেতে হতো। একদিন ডিউটিতে যাওয়ার পরে বাইপোলার সালিকে খুব ক্লান্ত করে তোলে। পরের দিন প্রধান অফিস থেকে তাকে ডাকা হয়। তিনি তার সমস্ত অসুস্থতার কথা খুলে বললে তাকে অফিসে বলবৎ রাখা হয়। কারণ ততদিনে দক্ষ কর্মী হিসেবে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে কোম্পানিতে।
বিয়ে
এই চাকরিরত অবস্থায় স্বামীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সে সময় তার উচ্চ বেতনের চাকরি, নিজের বাড়ির পরে একটা পরিবারের অভাববোধ করছিলেন তিনি। নিজের ছেলেবেলা খুব বেশি পারিবারিক আবহে পার না করায় নিজের পরিবারের জন্য তার হাহাকার লাগতে থাকে। ততদিনে সালির বাইপোলার চিকিৎসার আঠারো বছর চলছে। সালির স্বামী ছিলেন খুবই কর্র্তৃত্বশীল। ফলে সালির প্রতিটি পদক্ষেপ তার কথামতো হতে থাকে। মেধাবী কর্মজীবী নারী হিসেবে সালির এত কর্র্তৃত্বশীল পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে বেশ কষ্ট হয়। পরিবারের সঙ্গে বহু বছরের দূরত্বের ফলে সালি বুঝে উঠতে পারেন না এটা কি যতœ নাকি কর্র্তৃত্ব। বিয়ের কিছুদিনের মাথায় সালির স্বামী আত্মহত্যা করে বসেন।
ততদিনে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন সালি। স্বামীর মৃত্যুতে সালির মানসিক অবস্থা আরও ভেঙে পড়ে। স্বামীর মৃত্যুর প্রথম পাঁচ বছর ক্ষোভ-দুঃখের চক্র থেকে বের হতে পারেননি তিনি। শরীর এত ভেঙে পড়ে যে ছয় মাস সময় তাকে হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি
২০০১ সালে ৫৪ বছর বয়সে টেক্সাসে বসবাস করা অবস্থায় তার মনে হলো নিজের বাইপোলারকে না লুকিয়ে রেখে, নিজের মুখোমুখি বসা উচিত তার। আরও উচিত লোকদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানোর কাজ করা। নানা সমস্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন ছোটবেলায় পূরণ না হলেও মনের ভেতরে টিমটিম করে সে বাতি জ্বলছিল। সে বাতির সলতেয় নতুন করে আলো জ্বাললেন তার ব্যক্তিগত থেরাপিস্ট। থেরাপিস্টের অনুরোধে তিনি টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। অদম্য এই নারী সবাইকে অবাক করে দিয়ে সিজিপিএ ৪ পেয়ে সম্মানের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। এগারো বছর বয়সে যে সালি মেধাবী জীবনযাপনে স্বপ্ন দেখতেন, চুয়ান্ন বছর বয়সে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় নিজেকে মেধাবী হিসেবে সমাজের কাছে তুলে ধরতে সক্ষম হন তিনি।
বর্তমান পরিস্থিতি
বর্তমানে ৭৪ বছর বয়সী এই নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সবখানে বাইপোলার ডিজঅর্ডার নিয়ে সচেতন করার কাজ করে যাচ্ছেন। তার লেখার মাধ্যমে বহুলোক বাইপোলার নিয়ে সচেতন হচ্ছেন। সর্বোপরি বয়স যে মানুষকে বেঁধে রাখতে পারে না ইংল্যান্ডের সালি অল্টার তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।