কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস পরিত্যাজ্য

সমাজ জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কুসংস্কারজনিত অন্ধবিশ্বাস সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু ইসলামে কুসংস্কারের কোনো স্থান নেই। কুসংস্কারের জন্য আল্লাহর ওপর আস্থা, ধর্মবিশ্বাস এবং আল্লাহর প্রতি পরম নির্ভরতা বহুলাংশে লোপ পায়। কুসংস্কার হলো ধর্মীয় অনুশাসনের বাইরে একটি প্রচলিত নিয়মবিধি। যার প্রতি মানুষ অন্ধবিশ্বাস স্থাপন করে এবং জীবনের কর্মক্ষেত্রে এ বিশ্বাসকে আশ্রয় করে ধাবিত হয়। সাধারণত গ্রামীণ লোকাচারে এ ধরনের বিশ্বাসজাত কুসংস্কার বেশি দেখা যায়। আমাদের বিবিধ আচার-অনুষ্ঠানেও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে কুসংস্কার তথা কুপ্রথার প্রচলন রয়েছে।

যেমন যাত্রাকালীন শুভ-অশুভ মেনে চলা, পশুপাখির ডাক, সৌর জগতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন এবং হস্তরেখা নির্ণয়ে ভাগ্য পরীক্ষা করা। ইসলামের দৃষ্টিতে এসব গর্হিত কাজ ও কুসংস্কারের আওতাভুক্ত। আল্লাহতায়ালা ও নবী করিম (সা.) কুসংস্কারজনিত বিশ্বাসকে হারাম বলে অভিহিত করেছেন। এসব শিরকের নামান্তর। কারণ সব মঙ্গল-অমঙ্গলের শক্তি ও ক্ষমতার মালিক একমাত্র আল্লাহতায়ালা। এই বিশ্বাস প্রতিটি মুমিন মুসলমানের অন্তরে সুদৃঢ় থাকতে হবে। এক হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, শুভাশুভ লক্ষণ ও দিনক্ষণ ঠিক করা এবং কুসংস্কারজনিত অন্ধবিশ্বাসকে আঁকড়ে থাকা বা বিচার করা শেরিকি পৌত্তলিকতার পর্যায়ভুক্ত। (মিশকাত)

আবু দাউদ শরিফের এক হাদিসে উল্লেখ আছে, অশুভ লক্ষণ মানা শিরক। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এ কথা তিনবার উচ্চারণ করেছেন। মিশকাত শরিফে একটি ঘটনা উল্লেখ আছে, এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করেছিল, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা)! আমরা এক বাড়িতে অবস্থান করতাম। সেখানে আমাদের সন্তান-সন্ততি ও ধন-সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছিল, অতঃপর আর এক বাড়িতে গেলাম, সেখানে আমাদের সন্তান-সন্ততি ও ধন-সম্পদ হ্রাস পেল। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) একে অস্বস্তিকর জায়গা বলে অভিহিত করেন। 

কুসংস্কারে বিশ্বাস স্থাপন, কোনো কিছুর প্রতি কুলক্ষণ ভেবে মন-মানসিকতা তৈরি করা বা তার প্রতি আস্থাশীল হওয়া পাপ। পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে যে, গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট লোক আল্লাহর রহমত থেকে অনেক দূরে অবস্থান করবে। তারা আল্লাহ-রাসুলের নীতি আদর্শবিরোধী অলীক ধ্যানধারণায় বুঁদ হয়ে আছে।

কুসংস্কারের প্রভাবে পড়ে যারা এহেন অলীক কল্পনাপ্রসূত কুরীতিগুলো মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে আসছে, পবিত্র কোরআন ও হাদিসের মতাদর্শবহির্ভূত নতুন নতুন ভ্রান্ত ধারণাকে সৃষ্টি ও প্রচলন রাখার জন্য সচেষ্ট রয়েছে, তাদের সম্পর্কে তিরমিজি ও আবু দাউদে উল্লেখ আছে যে, এ ধরনের নব নব পন্থা উদ্ভাবন করা কিংবা নতুন কিছু সৃষ্টি বা প্রচলন করা গোমরাহি। এ ধরনের পথভ্রষ্টদের পরিণামে দোজখে শাস্তিভোগ করতে হবে। পবিত্র কোরআনে আরও বলা হয়েছে, যারা স্বেচ্ছায় পাপের পথের প্রতি আসক্ত হয়, নিশ্চয়ই যাক্কুম বৃক্ষ তাদের আহার্য হবে, গলিত তামার মতো এবং চামড়াদগ্ধকারী ফোটানো পানির মতো, যা তাদের পেটের ভেতরে ফুটতে থাকবে।

যাত্রাকালীন টিকটিকির ডাক, কাকের ডাক, পশুপাখির ডাক, গ্রহ-নক্ষত্র-চন্দ্র-সূর্যের প্রতি অলীক বিশ্বাস এবং খালি কলসি দেখে রওনা হওয়া, ডিম খেয়ে পরীক্ষা দিতে না যাওয়া, যাত্রাকালে হোঁচট খাওয়া, রাশিফল নির্ণয় করে প্রতিদিনের কর্মক্ষেত্রে গমন করা কুসংস্কারের বহিঃপ্রকাশ। শুধু তা-ই নয়, মুসলিমসমাজের অনেক কল্যাণের আশায় বিয়ে-শাদিতে ধান-দূর্বা দিয়ে বহুরঙা কুলোয় বর-কনেকে বরণ করে, কবরে বাতি জ্বালায়, ফুল ছড়ায়, চাদর দেয়, মহররম ও শবেবরাতে বিভিন্ন রীতি-রেওয়াজ পালন করে। জিন-ভূত ছাড়ানো থেকে শুরু করে তাবিজ-কবজের নামেও নানা ধরনের কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। যেসবের কোনো ভিত্তি নেই ইসলামে। কুসংস্কারের কারণে অনেক সময় নারীর সম্ভ্রমহানি এমনকি জীবনহানির ঘটনা ঘটে। এভাবে নানা কুসংস্কার আমাদের সমাজ ও ব্যক্তিজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। কুসংস্কার থেকে বাঁচতে মসজিদের ইমাম খতিব, শিক্ষক ও গণমাধ্যমকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, কুসংস্কারের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে মানুষকে সজাগ করতে হবে, কুসংস্কারের প্রচার হয় এমন কোনো খবর বা বিজ্ঞাপন প্রকাশ থেকে বিরত থাকতে হবে। সম্মিলিতভাবে এভাবে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে সমাজ থেকে কুসংস্কার কমে আসবে।