উল্টে পড়া বিমান দেখতে আলুক্ষেতে মেলা

রাজশাহীর তানোরে আলুক্ষেতে আছড়ে পড়া প্রশিক্ষণ বিমানটি ঘিরে গত বুধবার দিনভর যেন মেলা বসেছিল দুর্ঘটনাস্থল লাগোয়া এলাকায়। দূরদূরান্ত থেকে নারী-শিশুসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ পড়ে থাকা বিমানটি দেখতে আসেন। আর শত শত মানুষের আগমনকে ঘিরে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ওই এলাকায় বসে যায় অস্থায়ী বেশ কিছু খাবারের দোকানও। তবে এ মেলার অবসান ঘটেছে বুধবার সন্ধ্যার পরই। কারণ সেদিন রাতেই বিমানটি ক্ষেত থেকে সরিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে রাজশাহীর শাহমখদুম বিমানবন্দরে। ডানা ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ খুলে সরানো হয় বিমানটি।

গত মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে তানোরের লালপুরের একটি আলুর ক্ষেতে আছড়ে পড়ে প্রশিক্ষণ বিমানটি। বাংলাদেশ ফ্লাইং ক্লাবের এ বিমানটি শাহমখদুম বিমানবন্দর থেকে মঙ্গলবার দুপুরে ওড়ে। তানোরে গিয়ে সেটি আলুক্ষেতে আছড়ে পড়ে। এ দুর্ঘটনার খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তের মধ্যেই। এরপর থেকে মানুষের আগ্রহ তৈরি হয় উল্টে পড়ে থাকা বিমানটি দেখার জন্য। ঘটনার পরপরই লালপুরের ওই মাঠে উৎসুক মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। দ্বিতীয় দিন এ ভিড় আরও বেড়ে যায়। আর এতে দুদিনে দফারফা হয়েছে আলুক্ষেতের। স্থানীয়রা জানান, মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার পর থেকেই লালপুর মাঠে মানুষের ভিড়ের শুরু। দূর-দূরান্ত থেকে আসা কৌতূহলী মানুষ অপলকে দেখেছে বিমানটিকে। কেউ যাচ্ছেন তো কেউ আসছেন। মানুষের ভিড় লেগে থাকায় বসে যায় ঝালমুড়ি, মিষ্টি জিলাপি, বাদাম ভাজা ও আইসক্রিমের অস্থায়ী দোকান। দেখে মনে হয় যেন সেখানে মেলা বসেছে। আর এই কৌতূহলী মানুষ আসা-যাওয়ায় চিঁড়েচ্যাপ্টা অবস্থা আলুচাষিদের। বুধবার ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, উল্টানো বিমানের পাশে ব্যবসা পেতে বসেছেন ভাজাওয়ালা মুজাহিদুল ইসলাম। তার বাড়ি ঘটনাস্থলের পাশেই দেবীপুর গ্রামে। তিনি জানান, আগের দিনই অনেকে তাকে এখানে আসতে বলেছিলেন। কিন্তু দুর্ঘটনার দিন ব্যবসা করলে ভালো দেখায় না। তাই তিনি পরদিন এসেছেন। লোকসমাগমের কারণে তার বেচাবিক্রি খুব ভালো হয়েছে। ষাটোর্ধ্ব নাসের আলী তানোরের লালপুর এসেছেন নাটোর থেকে। ৭০ কিলোমিটার দূর থেকে আসার উদ্দেশ্য আলুক্ষেতে আছড়ে পড়া বিমানটি নিজ চোখে দেখা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে এসেছিলেন আবু বকর। মঙ্গলবার তার ছেলে সায়েম টিভিতে দেখেছিল ক্ষতিগ্রস্ত বিমানটি। তারপর থেকেই আবদার। ছেলের সেই বায়না পূরণে আবু বকর চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে এসেছিলেন আলুর মাঠে। তবে মানুষের এ সমাগমে আলুচাষিরা বেশ চটেছেন। কারণ এতে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তারা বলেন, যে স্থানটিতে বিমান আছড়ে পড়েছে সেই জমিটি ইজারা নিয়েছেন নুরুল ইসলাম। মোহনপুর থানার মৌগাছি গ্রামের নুরুল ইসলাম বিমানের আশপাশের ১৮০ বিঘা জমি ইজারা নিয়ে আলুচাষ করছেন। তার দাবি, মানুষের আসা-যাওয়ায় পায়ের চাপে অন্তত ২৫ বিঘা জমির আলু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নুরুল ইসলামের আলুচাষ প্রকল্প দেখভাল করেন সাইফুল ইসলাম। সকাল থেকেই তার তোড়জোড় মানুষ নিয়ন্ত্রণে। সাইফুল জানান, মানুষের পায়ের চাপে আলুর উপরিভাগে কালশিটে দাগ পড়েছে। এসব আলু কোল্ডস্টোরে সংরক্ষণের জন্য নেওয়া হলে পচন ধরবে। এ আলু বিক্রি বা সংরক্ষণ কোনোটাই হবে না। পুরোটাই ক্ষতি। তার দাবি, অন্তত ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হলো তাদের। নুরুল ইসলামের আলু প্রজেক্টে প্রতিদিন আলু তুলতে শ্রমিকরা কাজ করছেন। বিমান আছড়ে পড়ার পর থেকে শ্রমিকরা ঠিকমতো কাজও করতে পারেননি। এসব নিয়ে ক্ষোভের শেষ নেই সাইফুল ইসলামের। তিনি বলেন, ‘বিমান আছড়ে পড়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটি হয়েছে। কিন্তু আলুর যে ক্ষতি হলো তার কী হবে? যে ক্ষতি হয়েছে সে ক্ষতিপূরণ কে দেবে?’

এদিকে বুধবার সন্ধ্যা থেকে বিমানটির বিভিন্ন অংশ খুলতে শুরু করেন বাংলাদেশ ফ্লাইং ক্লাবের কর্মীরা। খোলার কাজ শেষ হলে রাত ৯টার দিকে বিমানের অংশগুলো ট্রাকে করে নেওয়া হয় শাহমখদুম বিমানবন্দরে।