মুক্তিযোদ্ধা অভিনেতা আহসানুল হক মিনু কথা বললেন স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী নিয়ে। সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণও করলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুদীপ্ত সাইদ খান।
সুবর্ণ জয়ন্তীর আনন্দ
এটা আমার জন্য বড় পাওয়া যে সুবর্ণ জয়ন্তীর এই সময়েও বেঁচে আছি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে যুদ্ধে গিয়েছিলাম। আজ বঙ্গবন্ধু নেই কিন্তু আমরা একটা দেশ পেয়েছি। এই দেশের সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করছি। এটা আমার জন্য আনন্দের। খুবই আত্মতৃপ্তি পাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুবর্ণ জয়ন্তী পালনের আয়োজন করছেন, সেই উদ্যাপনে আমিও আছি। আমরা যারা নাগরিক তাদের সবার জন্যই এটা সত্যিই আনন্দের।
যে স্বপ্ন, যে উদ্দেশ্য নিয়ে যুদ্ধে গিয়েছিলেন- সেই স্বপ্ন বা উদ্দেশ্য আজ পূরণ হয়েছে কিনা…
যে স্বপ্ন, যে উদ্দেশ্য নিয়ে যুদ্ধে গিয়েছিলাম সেই স্বপ্ন বা উদ্দেশ্য আজ পূরণ হয়েছে কিনা, সে প্রশ্নের জবাবে বলতে চাই, পুরোপুরি হয়তো উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি, তবে আস্তে আস্তে মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হচ্ছে। পুরোটা হয়তো দেখে যেতে পারব না, তবে আমি বিশ্বাস করি আমরা মুক্তিযোদ্ধারা যে শোষণমুক্ত স্বনির্ভর দেশের স্বপ্নে নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম সেটা একদিন ঠিকই বাস্তবায়িত হবে। ভবিষ্যতের প্রজন্ম এই সফল ভোগ করবে। আমরা হয়তো সেটা ভোগ করতে পারব না। তবে যদি তত দিন বেঁচে থাকতে পারতাম, সেটা যদি দেখে যেতে পারতাম তখন হয়তো বলতে পারতাম তোমাদের জন্য বঙ্গবন্ধু একটা দেশ উপহার দিয়ে গিয়েছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতি…
আমরা তো চিন্তা করিই নাই যে আমরা বেঁচে থাকব বা আজ আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারব। আমরা যুদ্ধে গিয়েছিলাম দেশকে রক্ষা করার জন্য। আমরা একটা পতাকা পেয়েছি, এবং বেঁচে থাকার উপলক্ষ পেয়েছি। সেই উপলক্ষেই সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করছি। যদি বেঁচে থাকি তাহলে শততম বার্ষিকীও হয়তো দেখে যেতে পারব। সেই সুযোগ যেন পাই, সেই প্রত্যাশায় করব আমি।
আমি যখন যুদ্ধে যাই তখন আমি এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলাম। বগুড়ায় যুদ্ধ করেছি। যুদ্ধকালীন একটি স্মৃতি এখনো মনে পড়ে। আমি যখন যুদ্ধের ময়দানে তখন আমাদের মা আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে যান। এই স্মৃতি আমার বুকে লালন করা আছে। কিন্তু সেই স্মৃতি ভুলে গেছি তখনই যখন একটি পতাকা পেয়েছি। একটা ভালোবাসা পেয়েছি। একটা মাটি পেয়েছি। মায়ের মৃত্যুকে ছাপিয়ে যে দেশটি পেয়েছি সেটাই আমার কাছে বড় পাওয়া। এটার চেয়ে বড় পাওয়া আমার কাছে আর কিছু নেই। মানুষজন আমাকে বলেছে, আমার মা আমার কারণেই মারা গেছেন। তিনি শুনেছিলেন যুদ্ধের মাঠে আমি গুলি খেয়ে মরে গেছি। এমনিতেও তিনি ওই সময়ে অসুস্থ ছিলেন আর এই খবর শোনার পর হার্ট ফেল করেন। ওনার মৃত্যুর খবর আমি অনেক পরে জানতে পেরেছি।
আরেকটা স্মৃতি মনে পড়ে বগুড়ায় আমি রেকি করতে গিয়ে আর্মিদের হাতে ধরা পড়েছিলাম। বগুড়া শহরে একটি মহিলা ক্যাম্প ছিল আর্মিদের সেটা রেকি করতে গিয়েছিলাম। রেকি করতে যাওয়ার সময় আমার কাঁধে স্টেনগান ছিল। তো পাক সেনারা আমার নাম জিজ্ঞেস করলে নাম বলি। নামের আগে মোহাম্মদ ছিল না, কিন্তু ওদের সামনে নামের আগে মোহাম্মদ যোগ করে দিই। পরে ওরা আমাকে ছেড়ে দেয়। আমি ভয়ে ছিলাম হয়তো পেছন থেকে গুলি করবে। কিন্তু করেনি। ওই দিন বেঁচে যাওয়ার কারণ হিসেবে পরে জেনেছিলাম, ওই ক্যাম্পে ছিলেন বেলুচি সেনারা। তাদের ওখানেও সংগ্রাম চলছিল। তারা এখানে এসে দেখে মুসলমানরাই মুসলমানদের মারছে। সে কারণে তারা ক্যাম্প থেকে বের হয়নি। একই কারণে হয়তো তারা আমাকে মারেনি। এভাবেই আমি বেঁচে গিয়েছিলাম।
দেশ স্বাধীন হওয়ার মুহূর্তের অনুভূতি….
বগুড়া মুক্ত হয় ১৩ তারিখে। তখন আমরা দৌড়ে ক্যাম্পে এলাম। আমার কমান্ডার একটা পতাকা এনে কঞ্চির সঙ্গে লাগালেন। আশপাশের লোকজন এসে ওই কঞ্চির সঙ্গে বড় একটা পতাকা লাগিয়ে দিল। আর আমরা চলে গেলাম পুলিশ লাইনের দিকে, যেখানে পাক সেনারা সারেন্ডার করেছে।