স্বাদু পানির দেশি মাছের বাজার দখল নিয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির হাইব্রিড মাছ। গ্রামাঞ্চলে ছোট ছোট মুক্ত জলাশয় ও পুকুরে এখনো কিছু দেশি প্রজাতির মাছ আছে। তবে বিগত কয়েক বছর এসব মাছ ধরতে জালের পরিবর্তে বিষ ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। মৃত্যু পর্যন্ত ঘটেছে। জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে বলে সতর্ক করেছেন পরিবেশবাদী ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাছ ধরতে একধরনের অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড বা গ্যাস ট্যাবলেট ও রোটেনন ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলো মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ ট্যাবলেট অথবা রোটেনন পানিতে ফেললে সব মাছ মারা যায়। এরপর তা সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করছেন জেলেরা।
গত ৩০ মার্চ সিরাজগঞ্জের তাড়াশের ভায়াট গ্রামের মাছচাষি বারাত আলী মাছ ধরার জন্য পুকুরে কীটনাশক দেন। পরে পুকুরে ভেসে ওঠা মাছ ধরতে গিয়ে বিষাক্ত পানি খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে জান্নাতি খাতুন ও বীথি নামের দুই শিশু। তাদের উদ্ধার করে সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় অন্তত চারজন অসুস্থ হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাছ চাষের সঙ্গে জড়িতরা খরচ কমাতে পুকুর ও জলাশয়ে বিষটোপ দেন। এতে ডোবা ও জলাশয় থেকে দেশি প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হচ্ছে। কয়েক বছরের ব্যবধানে অর্ধশত দেশি প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিষপ্রয়োগের ফলে মানুষের শরীরে নানা রোগব্যাধি দেখা দিচ্ছে।
তবে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের কথা অস্বীকার করে সিরাজগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. সাহেদ আলী বলেন, ‘আমাদের কাছে এমন কোনো অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
একই ঘটনা ঘটছে সুন্দরবনের নদী-খালে। একশ্রেণির অসাধু মাছশিকারি প্রতিদিন বিষ দিয়ে মাছ ধরছে। এতে পানি বিষাক্ত হয়ে প্রাণবৈচিত্র্য হুমকিতে পড়েছে। বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বনে প্রবেশের সময় জেলেরা নৌকায় কীটনাশক লুকিয়ে রাখেন। জোয়ারের আগে নদী ও খালের পানির মধ্যে এগুলো ছিটিয়ে দেওয়া হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নিস্তেজ হয়ে ভেসে উঠলে জেলেরা সংগ্রহ করেন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের (বিভাগীয় প্রধান) ড. মাহমুদ হোসেন জানান, প্রাচীনকাল থেকে জেলেরা গাছের লতাপাতা, ফল দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে বিষ তৈরি করে নির্দিষ্ট ধরনের মাছ শিকার করতেন। কিন্তু এখন গণহারে নিষিদ্ধ কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে যেমন মাছ বিলুপ্ত হচ্ছে, তেমনি অন্যান্য জলজ প্রাণীরও ক্ষতি হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে কয়েকটি অসাধু সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এরা সাধারণ জেলেদের জিম্মি করে বিষ দিয়ে মাছ ধরতে বাধ্য করছে।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ) বেলায়েত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন সুন্দরবনে অবৈধ মাছশিকারি অনেক কম। গত এক বছরে ৩০-৪০ জনকে গ্রেপ্তার করে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। স্মার্ট প্যাট্রল টিমের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এরপরও কিছু তৎপরতা রয়েছে। স্থানীয়রা সহযোগিতা না করলে এদের নির্মূল করা সম্ভব হবে না।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘যে কেমিক্যাল দিয়ে মাছ মারা হয়, এগুলো মাছের চেয়ে মানুষের জন্য বেশি ক্ষতিকর। এসব মাছ খেলে কিডনি, যকৃৎ, হৃৎপি- অকেজোর মতো জটিল রোগে আক্রান্তের সম্ভাবনা থাকে এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। প্রশাসনের উচিত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া।’
পবার চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, ‘মাছ ধরতে বিষপ্রয়োগ, এটার বাস্তব চিত্র ভয়াবহ। গ্রামাঞ্চলে এসব কেমিক্যাল সহজলভ্য হওয়ায় অনেক ইজারাদার ও মাছ ব্যবসায়ী ব্যবহার করছেন। এতে একদিকে পরিবেশের; অন্যদিকে মানুষের ক্ষতি হচ্ছে। খামারে অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়াও দ্রুতবর্ধক ওষুধ ব্যবহার হচ্ছে। আমরা বিষয়গুলো নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি। শিগগিরই বাস্তব চিত্র সবার সামনে তুলে ধরব।’