অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসের রপ্তানি আয়

মহামারীতেও প্রবৃদ্ধিতে নিটওয়্যার খাত

মহামারী করোনাভাইরাস সংক্রমণের মধ্যে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্প কিছুটা হোঁচট খেলেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আয় আসছে নিটওয়্যার খাত থেকে। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের শুরু থেকেই এ খাতটির রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি রয়েছে। তবে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে তৈরি পোশাকশিল্পের ওভেন খাতে। এ খাতটির রপ্তানি আয় প্রতি মাসেই কমে যাচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র মিলেছে।

গতকাল চলতি অর্থবছরের ৯ মাসের রপ্তানি আয়ের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে ইপিবি। এতে দেখা যায়, মহামারী করোনার মধ্যেও চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) ২ হাজার ৮৯৩ কোটি ৮৩ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা দেশি মুদ্রায় ২ লাখ ৪৫ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে গত মার্চে ৩০৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা গত বছরের মার্চের চেয়ে ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ বেশি। গত বছরের মার্চে ২৭৩ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল। অবশ্য গত মাসে ভালো হলেও অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সামগ্রিক পণ্য রপ্তানি দশমিক ১২ শতাংশ কমে গেছে। মূলত ওভেন খাতের আয় কমে যাওয়ায় সামগ্রিক পণ্য রপ্তানির পরিমাণ কমেছে।

ইপিবির দেওয়া তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সামগ্রিক পণ্য রপ্তানিতে তৈরি পোশাকশিল্পের অবদান ৮১ দশমিক ১৬ শতাংশ। এই সময়ে ২ হাজার ৩৪৯ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হলেও গত বছরের প্রথম ৯ মাসের চেয়ে আড়াই শতাংশ কম। তৈরি পোশাক খাতের আয় কমে যাওয়ার প্রধান কারণ ওভেন পোশাকের রপ্তানি কমে যাওয়া। আগের অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে ওভেন পোশাকের রপ্তানি আয় প্রায় ১১ শতাংশের মতো কমেছে। যদিও এ সময়ে নিট পোশাকের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৬ শতাংশ।

দেশের পোশাক রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র। করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকায় গত কয়েক মাস ধরেই ইউরোপের অনেক দেশ লকডাউনে রয়েছে। এর ফলে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।  

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই নিটওয়্যার খাতের রপ্তানি ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিতে রয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই মাসের তুলনায় চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে নিট পোশাকে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয় ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। এ সময় নিট পোশাকের রপ্তানি আয় হয় ১৭৫ কোটি মার্কিন ডলার। এখন পর্যন্ত এটি চলতি অর্থবছরের এ খাতের সবচেয়ে বেশি আয়। অর্থবছরের পরের মাসগুলোতে নিট খাতের আয় জুলাই মাসের তুলনায় কমলেও আগের অর্থবছরের তুলনায় রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি রয়েছে। চলতি অর্থবছরের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে নিট পোশাকের রপ্তানি আয় ১৩৩ কোটি থেকে প্রায় ১৩৯ কোটি ডলারের মধ্যে ওঠানামা করে। গত জানুয়ারিতে এ খাতের রপ্তানি আয় ১৪৬ কোটি ডলারে উন্নীত হলেও পরের দুই মাস ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ১৩৫ কোটি ও ১৩১ কোটি ডলারে নেমে আসে।

তবে আয় কিছুটা কমলেও ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে নিট পোশাকের রপ্তানি আয় ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেড়েছে। এ সময় এ খাতে রপ্তানি আয় হয়েছে ১ হাজার ২৬৫ কোটি ৪১ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ১৯৫ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় নিট পোশাকের রপ্তানি আয় বেড়েছে ২ দশমিক ৬ শতাংশ। বিপরীতে করোনার কারণে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই ওভেন খাত চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের চেয়েও খাতটির রপ্তানি আয় কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ওভেন খাতে রপ্তানি আয় হয়েছে ১ হাজার ৮৩ কোটি ৩৭ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ কম।

চলতি অর্থবছরে তৈরি পোশাকের রপ্তানি কিছুটা কমলেও পাট ও পাটজাত পণ্য, জুতা, প্রকৌশল পণ্য, হোম টেক্সটাইল, হস্তশিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, রাসায়নিক পণ্য ও সিরামিক পণ্যের রপ্তানি আয় বেড়েছে। তবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং হিমায়িত খাদ্য কমেছে।

ইপিবির তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ৯৫ কোটি ৩৫ লাখ ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই আয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২২ দশমিক ৯৪ শতাংশ বেশি। পাটপণ্যের মধ্যে পাটের সুতা ও বস্তার রপ্তানি বেড়েছে যথাক্রমে ২৫ ও ২৩ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে ৬৮ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই আয় গত বছরের একই সময়ের চেয়ে দশমিক ৫৩ শতাংশ কম।

করোনার কারণে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি কমলেও আবার গতি ফিরেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ৭৪ কোটি ৬৭ লাখ ডলারের কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া হিমায়িত খাদ্যের রপ্তানি ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ কমে গেছে। রপ্তানি হয়েছে ৩৬ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের হিমায়িত খাদ্য।