ডিউক অব এডিনবরা প্রিন্স ফিলিপ মারা গেছেন। বাকিংহাম প্যালেস থেকে বিবৃতি দিয়ে এই খবর জানানো হয়েছে। শুক্রবার বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘গভীর দুঃখের সঙ্গে রানি তার প্রিয় স্বামীর মৃত্যুর ঘোষণা দিয়েছেন। ‘তার রয়্যাল হাইনেস আজ সকালে উইন্ডশোর ক্যাসলে শান্তিতে বিদায় নিয়েছেন।’ফিলিপ ব্রিটিশ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দিন এক স্ত্রীর সঙ্গে বসবাস করা রাজপরিবারের পুরুষ সদস্য। দুজনে ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে একসঙ্গে কাটালেন।
প্রিন্স ফিলিপ ছিলেন গ্রিসের এক রাজপরিবারের সন্তান। অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালাতে হয় তার পরিবারকে। আশ্রয় মেলে ইংল্যান্ডে। নৌবাহিনীর ক্যাডেট হিসেবে মন জয় করেন ইংল্যান্ডের ভবিষ্যৎ রাণী প্রিন্সেস এলিজাবেথের। ষাট বছরেরও বেশি সময় ব্রিটেনের রানির পার্শ্ব-সহচর ও একান্ত সমর্থক প্রিন্স ফিলিপ বা ডিউক অফ এডিনবারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ রাজ পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তিতে পরিণত হন । রানির জীবন সঙ্গী হলেও ফিলিপের কোনো সাংবিধানিক দায়িত্ব ছিল না। কিন্তু রাজ পরিবারের এতো ঘনিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ তিনি ছাড়া আর কেউ ছিলেন না।
তিয়াত্তর বছর তিনি ছিলেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের স্বামী। রানির আদেশেই ব্রিটিশ রাজতন্ত্রে একসময় তিনি হয়ে ওঠেন দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। জীবন সঙ্গী হিসেবে রানিকে তাঁর কাজে সহযোগিতা করলেও বিশেষ কিছু কাজের ব্যাপারে প্রিন্স ফিলিপের বিশেষ আগ্রহ ছিল। পরিবেশ ও তরুণদের জন্যে অনেক কাজ করেছেন তিনি। স্পষ্টভাষী হিসেবেও পরিচিতি ছিল প্রিন্স ফিলিপের।
এই দীর্ঘ সময় ধরে রানি ও ব্রিটিশ রাজ পরিবারের প্রতি একনিষ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতার জন্যে তিনি যথেষ্ট শ্রদ্ধাও অর্জন করেন। রাজ পরিবারের নানা আনন্দ উৎসব আর কঠিন চ্যালেঞ্জের সময় তিনি সব সময় ছিলেন রানির পাশে। নিজের ভূমিকার কথা বলতে গিয়ে তিনি একবার বলেছিলেন, তার কাছে যেটা সবচেয়ে ভালো মনে হয়েছে তিনি সেই কাজটাই করেছেন।
তিনি বলেন, "কেউ কেউ মনে করেন ঠিক আছে, আবার কেউ ভাবেন ঠিক হয়নি- তো আপনি কি করতে পারেন! আমি যেভাবে কাজ করি সেটাতো আমি হঠাৎ করে বদলাতে পারি না। এটা আমার স্টাইলেরই একটা অংশ।"
ডিউক অফ এডিনবারার জন্ম গ্রিসের রাজ পরিবারে ১৯২১ সালের ১০ই জুন। গ্র্রিসের কর্ফু দ্বীপ যেখানে তার জন্ম, সেখানে তার জন্ম-সনদে অবশ্য তারিখ নথিভুক্ত আছে ২৮শে মে ১৯২১। এর কারণ গ্রিস তখনো গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করেনি। তার পিতা ছিলেন গ্রিসের প্রিন্স অ্যান্ড্রু আর মা ব্যাটেনবার্গের প্রিন্সেস অ্যালিস। বাবা মায়ের সন্তানদের মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র ছেলে। খুবই আদরে কেটেছে তার শিশুকাল। তার জন্মের এক বছর পর ১৯২২ সালে এক অভ্যুত্থানের পর বিপ্লবী এক আদালতের রায়ে প্রিন্স ফিলিপের পিতার পরিবারকে গ্রিসের ওই দ্বীপ থেকে নির্বাসনে পাঠানো হয়।
তার কাজিন রাজা পঞ্চম জর্জ তাদের উদ্ধার করে আনতে একটি ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ পাঠান, যে জাহাজে করে সেখান থেকে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় ফ্রান্সে। ফ্রান্সে লেখাপড়া শুরু করার পর সাত বছর বয়সে তিনি ইংল্যান্ডে মাউন্টব্যাটেন পরিবারে তার আত্মীয়স্বজনদের কাছে চলে আসেন এবং এরপর তার স্কুল জীবন কাটে ইংল্যান্ডে। এ সময় তার মা মানসিক রোগে আক্রান্ত হলে তাঁকে মানসিক রোগের হাসপাতালে রাখা হয়, এবং তখন কিশোর ফিলিপকে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হতো না। এরপর প্রিন্স ফিলিপ তার লেখাপড়া শেষ করেন জার্মানি ও স্কটল্যান্ডে। স্কটিশ একটি বোর্ডিং স্কুল গর্ডনস্টোনে তিনি লেখাপড়া করেন। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় তিনি সামরিক বাহিনীতে ক্যারিয়ার গড়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং চাকরি নেন রয়্যাল নেভিতে।
প্রিন্স ফিলিপ যখন ডার্টমাথে ব্রিটানিয়া রয়্যাল নেভাল কলেজের ক্যাডেট, তখন ওই কলেজ পরিদর্শন করেন রাজা ষষ্ঠ জর্জ এবং রানি এলিজাবেথ, সঙ্গে ছিলেন তাঁদের দুই কিশোরী কন্যা- প্রিন্সেস এলিজাবেথ ও প্রিন্সেস মার্গারেট। ওই সফরে দুই কিশোরী প্রিন্সেসের সাথী হয়ে তাঁদের সঙ্গ দেন প্রিন্স ফিলিপ। তরুণ প্রিন্স ওই সফরে ১৩ বছরের প্রিন্সেস এলিজাবেথের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিলেন। সেটা ছিল ১৯৩৯ সাল। ১৯৪২ সালের অক্টোবরের মধ্যে প্রিন্স ফিলিপ হয়ে ওঠেন রয়্যাল নেভির তরুণতম ফার্স্ট লেফটেন্যান্ট। এই সময় তারা দু'জন প্রচুর চিঠি চালাচালি করেছেন। বেশ কয়েকবার রাজপরিবারের সঙ্গে থাকার আমন্ত্রণও পেয়েছেন তিনি। এ রকমই একটি সফরের পর ১৯৪৩ সালের বড়দিনের সময় এলিজাবেথ তার প্রসাধনের টেবিলে প্রিন্সের একটি ছবি সাজিয়ে রাখেন।
তাদের সম্পর্ক গভীর হয়ে ওঠে যুদ্ধ পরবর্তী দিনগুলোতে। কিন্তু তাদের এই সম্পর্কের বিরোধিতা করেছিলেন রাজপরিবারের কেউ কেউ। কারণ তারা মনে করতেন ফিলিপের আচরণ "রুক্ষ ও খুব ভদ্রোচিত" নয়। কিন্তু প্রিন্সেস এলিজাবেথ বেশ ভালোভাবেই ফিলিপের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। ১৯৪৬এর গ্রীষ্মে ফিলিপ রাজার কাছে গিয়ে তার কন্যাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন এবং প্রথম সাক্ষাতের আট বছর পর তাঁরা বিয়ে করেন। বিয়ের আগে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিতে হয় ফিলিপকে। গ্রিক পদবী বাদ দিয়ে তিনি নেন মায়ের ইংরেজ পদবি মাউন্টব্যাটেন। বিয়ের অনুষ্ঠানের আগের দিন রাজা ষষ্ঠ জর্জ তাকে ‘হিজ রয়্যাল হাইনেস’ উপাধি দেন। আর বিয়ের দিন সকালে তাকে করা হয় ‘ডিউক অফ এডিনবারা।’
ওয়েস্টমিনস্টার গির্জায় ১৯৪৭ সালের ২০শে নভেম্বর তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সেই সময় উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন যুদ্ধ পরবর্তী ব্রিটেনের ধূসর দিনগুলিতে ওই বিয়ে ছিল ‘রং-এরঝলকানি।’
তাঁদের বিবাহিত জীবনের শুরুটা ছিল খুবই আনন্দঘন। এক সময় রয়্যাল নেভিতেও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে তার ক্যারিয়ার, বিয়ের পর তার পোস্টিং হয় মাল্টায় কিন্তু এই জীবন খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। তাদের প্রথম সন্তান প্রিন্স চার্লসের জন্ম হয় বাকিংহাম প্রাসাদে ১৯৪৮ সালে। তার দু'বছর পর ১৯৫০ সালে জন্ম হয় কন্যা প্রিন্সেস অ্যানের।
১৯৫০-এ নৌবাহিনীতে তরুণ ফিলিপ তার ক্যারিয়ারের তুঙ্গে। এ সময় রাজা ষষ্ঠ জর্জের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকায় তার কন্যাকে আরও বেশি করে রাজার দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয়। এবং ফিলিপের তখন স্ত্রী এলিজাবেথের পাশে থাকা প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
উনিশশ' একান্নর জুলাই মাসে রয়াল নেভি ছেড়ে দেন প্রিন্স ফিলিপ। ক্ষোভ পুষে রাখার মানুষ ছিলেন না তিনি। তবে পরবর্তী জীবনে তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছিল নেভিতে তার ক্যারিয়ার আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ না পাওয়া তাকে দুঃখ দিয়েছিল।
উনিশশ' বাহান্নয় রাজ দম্পতি কমনওয়েলথ সফরে যান। ওই সফরে প্রথমে যাওয়ার কথা ছিল রাজা এবং রানির। ওই সফরে ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁরা যখন কেনিয়ায় শিকারিদের একটি বাসস্থানে ছিলেন, তখন খবর আসে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে রাজা ষষ্ঠ জর্জ মারা গেছেন। মৃত্যুর খবর ফিলিপই পৌঁছে দেন এলিজাবেথের কাছে। প্রিন্স ফিলিপের একজন বন্ধু পরে বলেছিলেন, এই খবর শুনে ফিলিপের মনে হয়েছিল "তার মাথায় অর্ধেক পৃথিবী ভেঙে পড়েছে।"
১৯৫৩ সালে রানির সিংহাসন আরোহণ অনুষ্ঠানের পর তাকে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ হিসাবে শ্রদ্ধা জানান ডিউক অফ এডিনবারা। রানির অভিষেকের সময় রাজ পরিবার থেকে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয় যে রানির পর সবকিছুতেই সবার আগে থাকবে ফিলিপের স্থান, কিন্তু সংবিধানে তার কোনো স্থান থাকবে না।
রাজ পরিবারকে আধুনিক করে তোলার এবং জাঁকজমক সংকুচিত করার অনেক চিন্তাভাবনা ছিল ডিউকের, কিন্তু প্রাসাদের নিয়মনীতির রক্ষক যারা ছিলেন, তাদের অব্যাহত বিরোধিতায় তিনি ক্রমশ উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন।