জলবায়ু পরিবর্তন

গরম হাওয়ায় ফলন বিপর্যয়

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, আগাম বন্যা ও সিডর, আইলা, আম্পান, বুলবুলের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন বাংলাদেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী। বিশেষ করে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি খাত। শত প্রতিকূলতাকে মোকাবিলা করে এ দেশের কৃষক জমিতে ফসল ফলায়। স্বপ্ন দেখে বেঁচে থাকার। অথচ মুহূর্তেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে সবকিছু সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। গত ৪ এপ্রিল রাতে ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে গরম ‘লু’ হাওয়ায় গোপালগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলায় হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধানের শীষ নষ্ট হয়ে সাদা হয়ে গেছে। গোপালগঞ্জ কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর গোপালগঞ্জে ৭৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরোর চাষ হয়েছে। এসব জমিতে এখন ফ্লাওয়ারিং স্টেজ চলছে। অর্থাৎ ধানের শীষে দুধ এসেছে। মাত্র আধা ঘণ্টার ‘লু’ হাওয়ায় গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া, কোটালীপাড়া ও কাশিয়ানী উপজেলার শত শত হেক্টর জমির বোরো ধানের শীষ সাদা হয়ে গেছে। একই সময়ে কিশোরগঞ্জ জেলায়ও ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে গরম হাওয়ায় হাওরের ধানের শীষও সাদা হয়েছে। অর্থাৎ এসব শীষে কোনো চাল নেই। সব পুড়ে গেছে। ধান তো পুড়েনি, পুড়েছে কৃষকের কপাল।

মূলত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সময়ে-অসময়ে নানা রূপে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানে। যে আঘাতে খান খান হয়ে যায় কৃষকের স্বপ্ন। অনেকেই সর্বস্বান্ত হয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে নগর-মহানগরে বস্তিবাসী হয়ে যান। এভাবেই গোটা দুনিয়ার উন্নয়নশীল দেশের লাখ লাখ মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আইলার আঘাতে ল-ভ- হয়ে যাওয়া নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ খুলনার বস্তিতে আশ্রয় নিয়ে পেশা পরিবর্তন করে কোনো রকমে বেঁচে আছেন। শুধু খুলনায় নয়, জলবায়ু উদ্বাস্তুরা এখন গোটা দেশের নগর-মহানগরে বস্তিবাসী হয়েই মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

বাস্তবেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশ হিসেবে আমাদের ক্ষতির পরিমাণ প্রতিনিয়তই বাড়ছে। মূলত বৈশ্বিক উষ্ণতার দরুণ প্রকৃতি রুক্ষ হয়ে উঠছে। ফলে খরা, অতিবৃষ্টি, আগাম বন্যা, ঝড়ের প্রকোপের কারণে কৃষি চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে উফশী ধানের ফলন কমে যাচ্ছে এবং গমের ক্ষেতে পোকার আক্রমণও বাড়ছে। এমনকি অতিরিক্ত তাপ ও আর্দ্রতার কারণে গাছের ছত্রাক রোগ বেড়ে যাচ্ছে। আবার বোরো মৌসুমে রাতে যদি ঠান্ডা ও কুয়াশা পড়ে ধানের পাতায় পানি জমে এবং দিনে গরম পড়ে, তাহলে ব্লাইট রোগের আক্রমণ বেড়ে যায়। যদিও বিগত ২৫ বছরের আবহাওয়ার উপাত্ত থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের গড় উষ্ণতা তেমন বাড়েনি। তবে আশঙ্কা করা হয়, আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ গড় তাপমাত্রা ১.০ ডিগ্রি, ২০৫০ সাল নাগাদ ১.৪ ডিগ্রি ও ২১০০ সালে ২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যেতে পারে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাপমাত্রা কম-বেশি হওয়ায় ফলনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। যেমন কৃষিতে খরা একটি বহুল প্রচলিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতি বছরই ৩০ থেকে ৪০ লাখ হেক্টর জমি বিভিন্ন মাত্রায় আক্রান্ত হয়। ফলে গাছের বৃদ্ধিতে বাধার সৃষ্টি হয় এবং বৃষ্টিপাতের অভাবে মাটিতে পানিশূন্যতা সৃষ্টি হয়, যা গাছের বেড়ে ওঠার পথে বড় অন্তরায় সৃষ্টি করে। অর্থাৎ আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবে কৃষকদের নানা প্রতিকূলতাকে মোকাবিলা করে চাষাবাদ করতে হয়। শুধু তাই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের দরুন পানি স্তরে পানির শূন্যতা, লবণাক্ততাও বেড়ে যাচ্ছে।

বিশেষ করে, লোনা পানির অনুপ্রবেশ বাংলাদেশের জন্য একটি মারাত্মক সমস্যা। ১৯৭৩ সালে ১৫ লাখ হেক্টর জমি মৃদু লবণাক্ততায় আক্রান্ত হলেও ১৯৯৭ সালে এসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২৫ লাখ হেক্টরে। বর্তমানে এর পরিমাণ ৩০ লাখ হেক্টরেরও বেশি। উজান থেকে স্বাভাবিক পানির প্রবাহে বাধা, কম বৃষ্টিপাতের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা ভবিষ্যতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও পরিমিত বৃষ্টির অভাবে সমস্যা প্রকট হতে পারে। লবণাক্ততা কৃষি চাষাবাদের জন্য অনুকূল নয়। কারণ লবণাক্ত পানিতে কৃষি চাষাবাদ হয় না। যদিও বাংলাদেশের কৃষি বিজ্ঞানীদের অভাবনীয় সফলতায় লবণাক্ত সহনীয় খাদ্যশস্যের জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। কিন্তু মিঠা পানির চাষাবাদ আর লবণাক্ত পানির চাষাবাদের মধ্যে যথেষ্ট ফারাক রয়েছে। শুধু লবণাক্ততাই নয়, জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূ-উপরিস্থ পানির বদলে ভূ-গর্ভস্থ পানি অতিমাত্রায় ব্যবহার করায় ইতিমধ্যেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঝিনাইদহ জেলার ছয় উপজেলায় ভূ-গর্ভস্থ পানি শূন্য হয়ে পড়েছে। সেখানকার বসবাসরত মানুষ এখন বেঁচে থাকার নিয়ামক বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকটে পড়েছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় লক্ষাধিক নলকূপ অকেজো হয়েছে। আবার দুর্ভোগেও পড়েছেন চাষিরা। পানির অভাবে জমিতে সেচ দিতে পারছেন না। অনেকেই ২০-২৫ ফুট পর্যন্ত মাটি খুঁড়ে গর্ত করে নিচে সাবমারসিবল পাম্প বসিয়ে কোনো রকমে সেচ দিচ্ছেন এবং খাবার পানি সংগ্রহ করছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত নিয়ে অতিসম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন উপমহাদেশের দেশগুলোকে সবচেয়ে বেশি নাজুক অবস্থায় ফেলেছে। যদিও জলবায়ু পরিবর্তনে আমাদের কোনো ভূমিকা নেই, তারপরও আমরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তের সম্মুখীন। অভিযোজনের মাধ্যমে আমরা নিজেদের রক্ষা করতে পারলেও এই জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা বন্ধ করা না গেলে অভিযোজন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা দেওয়া কঠিন হবে। তিনি বলেন, আমরা এমন একটি অঞ্চলে বসবাস করি, যা প্রাকৃতিক ভাবে দুর্যোগপূর্ণ। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত দেশগুলো যেমন ভূমিকম্প, ফ্লাউডবার্স, বরফ ধস, ভূমি ধস, ফ্লাশ বা হরকাবানের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ, তেমনি বাংলাদেশের মতো সাগর উপকূলীয় অঞ্চলগুলো বারবার বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, অতিবৃষ্টি বা খরার মতো দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছে।

বাস্তবতা হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার এক বিশাল সংখ্যক মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। বিপুল সংখ্যক মানুষ এখনো অর্ধাহারে, অনাহারে প্রতি রাতে ঘুমাতে যায়। আমাদের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ যারা জীবন ধারণের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা থেকে আজও বঞ্চিত। এ সংকট দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে। গত ১১ মার্চ নিরাপত্তা পরিষদের খাদ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক এক বৈঠকে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তেনিও গুতেরেস বলেছেন, কভিড-১৯ মহামারী ও জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি বৃদ্ধি এবং ক্ষুধার কারণে বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ না নিলে লাখ লাখ মানুষ ক্ষুধা ও মৃত্যুর মুখে পড়বে। তিনি শঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, তিন ডজনের বেশি দেশের ৩০ মিলিয়ন লোক দুর্ভিক্ষ ঘোষণা থেকে ‘মাত্র এক পা দূরে রয়েছে।’

আসলে ওই বৈঠকে যেসব উন্নত দেশের প্রতিনিধিরা বলেছেন, মূলত বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য তারাই দায়ী। এমনকি উষ্ণায়ন কমানোর ক্ষেত্রে তাদের কোনো আন্তরিকতাই নেই। আর এর বিরূপ প্রভাবে আমাদের কৃষি ও অর্থনীতি দিন দিন মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে। এ অবস্থা থেকে আমাদের দেশের মানুষকে বাঁচাতে হলে নিজ উদ্যোগেই জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় নিজেদের তহবিল গঠন করেই পরিকল্পনা মাফিক কাজ করতে হবে, যা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প পথ আমাদের সামনে খোলা নেই।

 লেখক : কৃষিবিষয়ক লেখক

ahairanju@gmail.com