অলিম্পিকের বৃত্তি পাওয়াদের বেহাল দশা

এক বছর পিছিয়ে যাওয়া টোকিও অলিম্পিক গেমস আসছে জুলাইয়ে হবে কি হবে না, তা নিয়ে এখনো সংশয় আছে। করোনার কারণে এখনো অনিশ্চয়তায় দুলছে অলিম্পিকের ভাগ্য। তবে অলিম্পিককে সামনে রেখে প্রস্তুত হচ্ছেন সারা বিশ্বের বিভিন্ন খেলার ক্রীড়াবিদরাও। বৈশ্বিক এই আসরে পদক থেকে আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করলেও সেই ২০১৭ সাল থেকেই অলিম্পিককে লক্ষ্য রেখে অনুশীলনে আছেন বাংলাদেশের সাত ক্রীড়াবিদ। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটিই তাদের দিয়ে যাচ্ছে আকর্ষণীয় বৃত্তি। গেমস পেছানোর পাশাপাশি বৃত্তির মেয়াদও বেড়েছে। অলিম্পিক যখন দরজায় কড়া নাড়ছে, তখন প্রশ্ন উঠেছে, আইওসি’র বৃত্তি নিয়ে কতটা উন্নতি করেছেন সাত ক্রীড়াবিদ? উত্তরটা খোঁজার সেরা মঞ্চ ছিল সদ্যসমাপ্ত বঙ্গবন্ধু নবম বাংলাদেশ গেমস। দেশের সর্ববৃহৎ আসরে ওই সাতজনের পারফরমেন্স ব্যাপক হতাশার।

২০১৭-এর সেপ্টেম্বর থেকে আইওসি মাসিক ৫০০ মার্কিন ডলার (জনপ্রতি) বৃত্তির আওতায় আনে বাংলাদেশের এই ক্রীড়াবিদকে। এর মধ্য শুটিং থেকেই বেছে নেওয়া হয় চারজনকে। শুরুতে রাইফেল শুটার রিসালাতুল ইসলাম ও উম্মে জাকিয়া সুলতানা টুম্পা এবং পিস্তল শুটার শাকিল আহমেদ খান ও আনোয়ার হোসেন ওই বৃত্তি নিয়ে দেশেই কোচের অধীনে প্রস্তুতি শুরু করেন। অবশ্য গত সেপ্টেম্বরে বাজে পারফরমেন্সের কারণে বৃত্তি থেকে বাদ দেওয়া হয় টুম্পা ও আনোয়ারকে। তাদের স্থলাভিষিক্ত করা হয়ে দুই রাইফেল শুটার আব্দুল্লাহ হেল বাকী ও সৈয়দা আতকিয়া হাসান দিশাকে। এর বাইরে আর্চার রোমান সানা ও বিউটি রায়কে দেওয়া হয় এই বৃত্তি। আর সাঁতারু আরিফুল ইসলামকে বৃত্তির আওতায় এনে ২০১৮ সালের জুনে পাঠানো হয় ফ্রান্সে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য।

যাদের অলিম্পিকের মতো মর্যাদার আসরে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য ভাবা হচ্ছে, তারা কেউই নিজ নিজ খেলায় সেরা ফর্মে নেই। বাকী, রিসালাত ও দিশার মূল ইভেন্ট ১০ মিটার এয়ার রাইফেল। বাংলাদেশ গেমসে ছেলেদের বিভাগে রিসালাত পেয়েছেন রুপা, আর বাকী পেয়েছেন ব্রোঞ্জ। তাদের ছাপিয়ে সেরা হয়েছেন ইউসুফ আলী নামে এক অপরিচিত শুটার। নারীদের ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে ফেভারিট হওয়া সত্যেও কাক্সিক্ষত সোনার পদক পাননি দিশা। ১০ মিটার এয়ার পিস্তলে কমনওয়েলথ গেমসে রুপাজয়ী শাকিল আহমেদ খান পেয়েছেন ব্রোঞ্জ। পরে অবশ্য বাকী, দিশা ও শাকিল ৫০ মিটার রাইফেল ও পিস্তল ইভেন্টে সোনা জিতে হতাশা ভোলার চেষ্টা করেছেন। যদিও অলিম্পিকে সুযোগ পেলে তাদের খেলতে হবে ১০ মিটার রেঞ্জে। 

টোকিও অলিম্পিকে সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জন করা আর্চার রোমান সানার ধারাবাহিক ব্যর্থতায় হতাশার কালো মেঘ ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে। বিজয় দিবস আর্চারি, জাতীয় আর্চারিতে শ্রেষ্ঠত্ব হারানো রোমান বাংলাদেশ গেমস শেষ করেছেন শূন্য হাতে। নিজের সেরা ইভেন্ট রিকার্ভ এককের সেরা ১৬ থেকে বিদায় নেওয়ার পর দলগত ও মিশ্র দলগত ইভেন্টেও কোনো পদক পাননি। রোমান ছাড়াও অলিম্পিকের বৃত্তি পাচ্ছেন রিকার্ভ আর্চার বিউটি রায়। বাংলাদেশ গেমসে নারীদের রিকার্ভ এককে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেন অভিজ্ঞ এই আর্চার। তবে দলগত ইভেন্টে সোনা এবং মিশ্র দলগত ইভেন্টে ব্রোঞ্জ জেতেন পুলিশ আর্চারি ক্লাবের হয়ে।

বৃত্তির আওতাধীনদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন সাঁতারু আরিফুল ইসলাম। বছর দুই-তিন আগেও জাতীয় পর্যায়ে নিজের পারফরমেন্স দিয়েই পুলে ঝড় তুলতেন আরিফুল। ২০১৮ সালের জুন থেকে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সহায়তায় ফ্রান্সে উচ্চতর প্রশিক্ষণে রয়েছেন নৌবাহিনীর এই সাঁতারু। গেমসে অংশ নিতে দেশে ফিরেছিলেন। কিন্তু বিদেশে দীর্ঘদিন প্রশিক্ষণের ছাপ পারফরমেন্সে রাখতে পারেননি। তাকে সেরা সাঁতারু হিসেবে দেখার প্রত্যাশা ছিল অনেকের। কিন্তু ২০০ মিটার ব্যাক স্ট্রোক ও ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে সোনা ও ১০০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে রুপা জিতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে আরিফুলকে। নতুন কোনো রেকর্ড তো গড়তে পারেনইনি, নিজের সেরা টাইমিংকেও পেছনে ফেলতে পারেননি ১৪ এপ্রিল ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়তে যাওয়া এই সাঁতারু।

২০১৬ রিও গেমসে সিদ্দিকুর রহমান সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জন করে মান বাঁচিয়েছিলেন। এবার রোমান সানা সেই যোগ্যতা দেখালেও ক্রমাগত খারাপ পারফরমেন্সে তাকে নিয়েও তৈরি হয়েছে সংশয়। এমনও গুঞ্জন আছে, নিম্নমুখী পারফরমেন্সের কারণে তার বিকল্পও ভাবতে শুরু করেছে আর্চারি ফেডারেশন। কারণ আর্চারিতে কোটা প্লেসটা এসেছে দেশের নামে, ব্যক্তির নামে নয়। বিওএ কিংবা ফেডারেশন কেউই অবশ্য রোমানের ক্ষেত্রে কঠিন কোনো সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছতে চায় না, তারা এখনো আশায় আছেন রোমানের ফর্মে ফেরার।

শেষ পর্যন্ত রোমান খেললে সেটা নিজ যোগ্যতায়ই খেলবেন। তবে অন্যদের অলিম্পিক স্বপ্ন সত্যি হবে আইওসি’র ওয়াইল্ড কার্ড নামক ‘করুণায়’ ভর করে। বিওএ গত বছর সাত খেলার ১১ জনের জন্য ওয়াইল্ড কার্ডের আবেদন করেছে আইওসির কাছে। আর্চারি থেকে বিউটি রায় ছাড়াও ওয়াইল্ড কার্ডের জন্য নাম গেছে ইতি খাতুন ও মেহনাজ আক্তার মনিরার। শুটিং থেকে বৃত্তির আওতায় থাকা চার শুটারের নাম পাঠানো হয়েছে ওয়াইল্ড কার্ডের জন্য। সাঁতার থেকে কেবল দেওয়া হয়েছে আরিফুলের নাম। তবে তার যাওয়া না যাওয়া পুরোটাই নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক সাঁতার সংস্থা ফিনার সিদ্ধান্তের ওপর। এছাড়া ২০১৯ এসএ গেমসে সোনাজয়ী কারাতেকা হুমায়রা আক্তার অন্তরা, টানা দুই এসএ গেমসে সোনাজয়ী ভারোত্তোলক মাবিয়া আক্তার সীমান্ত ও এসএ গেমসে রুপাজয়ী বক্সার রবিন মিয়ার নাম পাঠানো হয়েছে ওয়াইল্ড কার্ডের জন্য। এর মধ্যে থেকে ক’জন আইওসি’র করুণা পাবেন, সেটা জানা যাবে জুনে। এর বাইরে মাদার ইভেন্ট অ্যাথলেটিক্স থেকেও হয়তো দু-একজনের ভাগ্যে অলিম্পিক দর্শনের সুযোগ তৈরি হতে পারে আইওসি ও আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের বদান্যতায়। 

যুগ যুগ ধরেই বাংলাদেশিদের জন্য অলিম্পিক কেবলমাত্র অভিজ্ঞতা অর্জন, আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার আর দেশ-শহর দেখার আনন্দ উপলক্ষ। ১৬০ মিলিয়ন মানুষের বাংলাদেশ এখনো অলিম্পিকে কোনো পদক জিততে না পারাটা লজ্জার। আর সেই লজ্জার খবর ফলাও করে ২০১৬ রিও গেমসের সময় ছাপা হয়েছিল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। অলিম্পিকের মাস তিনেক আগে বাংলাদেশিদের যে করুণ দশা, তাতে এমন খবর ফের আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছাপা হওয়ার আশঙ্কা অমূলক নয়।