গাইবান্ধায় স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ি থেকে এক ব্যবসায়ীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ওই ব্যবসায়ীর স্ত্রী থানায় মামলা দায়ের করতে গেলেও তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে পুলিশ। এই ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তুলেছেন নিহত ব্যবসায়ীর পরিবার। এর প্রতিবাদে এলাকায় বিক্ষোভ করেছে পরিবারের লোকজন ও এলাকাবাসী। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর, কিন্তু উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই অপরাধে জড়িয়ে পড়া বা অপরাধ সংঘটনে সহায়তার অভিযোগ খুবই উদ্বেগের। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় সদস্যের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মিলে গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, গত শনিবার দুপুরে গাইবান্ধা সদর উপজেলার নারায়ণপুর এলাকায় জেলা আওয়ামী লীগের উপদপ্তর সম্পাদক দাদন ব্যবসায়ী মাসুদ রানার বাসা থেকে জুতা ব্যবসায়ী হাসান আলীর লাশ উদ্ধার করা হয়। লাশ উদ্ধারের মাসখানেক আগে ব্যবসায়ী হাসান আলীকে (৪৫) আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ রানার হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। ব্যবসায়ী হাসান আলীর আফজাল সুজ নামের জুতার দোকান রয়েছে। ব্যবসার জন্য মাসুদ রানার কাছ থেকে টাকা নেন হাসান আলী। টাকা আদায়ের জন্য মোটরসাইকেলে করে হাসান আলীকে তুলে নিয়ে আসেন মাসুদ রানা। তাকে গাইবান্ধা সদর উপজেলার নারায়ণপুর এলাকায় নিজ বাসায় আটকে রাখেন। পরে সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মজিবুর রহমান ও উপপরিদর্শক (এসআই) মোশারফ হোসেন এবং একজন অজ্ঞাতনামা পুলিশ কর্মকর্তা মাসুদের বাড়ি থেকে হাসানকে সদর থানায় নিয়ে আসেন। তিনি মাসুদের টাকা ফেরত দিতে বলেন এবং তার স্ত্রীকে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে বলেন। তাতে সম্মত না হলে মজিবুর হাসান আলীকে মাসুদের জিম্মায় দেন। এরপর এক মাস আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেউ টাকা ঋণ নিলে তাকে আটক রাখার আইন দেশে আছে কি না? মাসুদ রানা আইনের আশ্রয় না নিয়ে একজন মানুষকে বাড়িতে আটকে রেখেছেন, যা বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ। একইসঙ্গে এই ঘটনায় পুলিশ ‘সালিশ’ বৈঠকের যে চেষ্টা করেছে, সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে। ব্যবসায়ী হাসান আলীকে দাদন ব্যবসায়ী মাসুদের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনায় সদর থানার কোনো কর্মকর্তা জড়িত আছে কি না, তা খুঁজে বের করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ আমলে এনে হত্যায় সহায়তার অভিযোগ তদন্ত করতে হবে। এই ঘটনায় দোষী কেউ যাতে পদ-পদবি বা ক্ষমতা ব্যবহার করে ছাড় না পায়, সেদিকেও সজাগ থাকতে হবে। ব্যবসায়ী হাসান আলীকে হত্যার ঘটনায় পুলিশ সরাসরি জড়িত না হলেও অপকর্মে সহায়তা করেছে। পাশাপাশি মৃত ব্যবসায়ী হাসানের স্ত্রী বীথি অভিযোগ করেছেন, শনিবার রাতে থানায় এজাহার দিতে গেলে পরিদর্শক মজিবুর এজাহারের বর্ণনা থেকে মাসুদ রানার নাম বাদ দিতে বলেন। এই ঘটনা পুলিশের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
এদিকে, আওয়ামী লীগের উপদপ্তর সম্পাদক মাসুদকে কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলেও দেশ রূপান্তরের সংবাদে বলা হয়েছে। অপরদিকে, ব্যবসায়ী হাসান আলীকে থানায় ডেকে আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে জেলা পুলিশ। এই ঘটনার পরেও পুলিশের তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা যথেষ্ট সন্দেহজনক, কারণ এখন পর্যন্ত পুলিশের অভিযুক্তদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া বা সাময়িক অব্যাহতির খবর পাওয়া যায়নি। তারা একই পদে থাকলে তদন্ত কাজে প্রভাবিত করবে বলে ভুক্তভোগী পরিবারের আশঙ্কা তৈরি হওয়াটা তাই স্বাভাবিক। এখন এই ঘটনার সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। অপরাধ আড়াল করার কোনো সুযোগ নেই। জনগণের জানমাল রক্ষার দায়িত্ব পুলিশের, তারাই যদি তা পালনে গাফিলতি করে বা নিজেরাই অপরাধমূলক কাজে জড়ায় তাহলে সাধারণ মানুষ বিচারের জন্য কোথায় যাবে?