মাহমুদ আব্বাসের বছরের পর বছর অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, তার হয়তো এখন ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। আব্বাসের এখন উচিত অন্য কারও কাছে নেতৃস্থানীয় ফিলিস্তিনি সংগঠন ফাতাহর হাল তুলে দেওয়া। আমি এ কথা তার বয়সের কারণে বলছি না। আব্বাসের বয়স নিয়ে আমার আপত্তি নেই। দুর্নীতির অভিযোগও তুলব নাযেহেতু আমার কাছে তার কোনো প্রমাণ নেই। আমি বিচলিত ফিলিস্তিনিদের জন্য তার একটি কৌশলগত দূরকল্পের অনুপস্থিতি দেখে। বিষয়টি ফিলিস্তিনিদের তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত করেছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নেতৃত্ব দেওয়ার ব্যাপারে আব্বাসের ঘাড়ের পাহাড়সম বোঝাটির বিষয়ে আমি সহানুভূতি পোষণ করি। হাজারো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন এবং বিভিন্ন জরুরি পরিষেবার জন্য অর্থের সংস্থান করতে হয় তাকে। একটি সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তি ছাড়াই এ কাজটি চালিয়ে নিতে হচ্ছে ফিলিস্তিনি সরকারকে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ যে আন্তর্জাতিক মহলের সাহায্য আর ইসরায়েলিদের খেয়ালখুশির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে তা কিন্তু মাহমুদ আব্বাসের দোষ নয়। তেল আবিবের নীতি ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করেনি। ওই নীতি তাদের পশ্চিমতীরের ৮০% এর বেশি ভূমিতে যাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে এবং ফিলিস্তিনি নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়া অঞ্চলগুলোতেও তাদের চলাচলকে সীমাবদ্ধ করেছে। এমনকি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নামমাত্র নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর অবাধ রাজত্ব বিরাজমান।
শান্তি প্রক্রিয়ায় প্রত্যাবর্তন
এহেন পরিস্থিতির মুখে, আব্বাস যে সর্বোত্তম প্রস্তাবটি দিতে পেরেছেন তা হলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ‘বৈধতার’ স্বীকৃতির আবেদন ও ‘দুই-রাষ্ট্র সমাধানের’ জন্য শান্তি প্রক্রিয়ায় ফিরে আসার মতো শূন্যগর্ভ আর ক্লান্তিকর আহ্বান, যার কোনোকিছুরই আর তেমন প্রাসঙ্গিকতা নেই। বিষয়টিকে আরও খারাপ করে তুলেছে জনগণের সমালোচনা এবং উদীয়মান সুশীল সমাজের নেতৃত্বের প্রতি কর্তৃপক্ষের অসহিষ্ণু হয়ে ওঠা। ফলস্বরূপ, ফিলিস্তিনি জাতীয় আন্দোলনের এক সময়ের প্রভাবশালী শক্তি ফাতাহ হয়ে পড়েছে স্থবির এবং গণমুখী সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন। নেহাত কিছু পৃষ্ঠপোষকতার জোরে এটি কোনোমতে টিকে আছে। জরিপের ফলে অবশ্য এখনো দেখা যায়, ফাতাহ তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হামাসের চেয়ে বেশি সমর্থনের অধিকারী। তবে আমাদের জরিপ এ-ও বলছে, মুসলিম ব্রাদারহুডের ফিলিস্তিনি শাখা হামাস উল্লেখযোগ্য সমর্থন হারিয়েছে নিজেদের সমস্যার কারণেই। এসব জরিপ আরও দেখাচ্ছে, ফিলিস্তিনিরা খুব বেশি করেই ঐক্য কামনা করে। তবে, মিসরীয় জাতীয়তাবাদী সাদ জগলুলের কথা স্মরণ করে বলা যায়, ফাতাহ ও হামাসের বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় থাকলে সংগঠন দুটির মধ্যে ঐক্যের সম্ভাবনা হচ্ছে : ‘শূন্য যোগ শূন্য সমান শূন্য’।
ফিলিস্তিনিদের জন্য বিপদ
ফিলিস্তিনিদের জন্য বিপদের কথা হলো, মাহমুদ আব্বাস যদি ফাতাহর ওপর তার কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন আর সংগঠনটি থেকে বহিষ্কার করা নানামুখী আনুগত্যের নেতাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তাহলে এই নির্বাচনে ২০০৬ সালের নির্বাচনী বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তিই হতে পারে।
সাধারণ ধারণা ছিল ২০০৬ সালের নির্বাচনে হামাসের জয়ের কারণ, ভোটাররা ফাতাহর নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তবে এটা মোটেই সত্যি না। আমাদের জরিপে স্পষ্ট দেখা যায়, ভোটাররা মনে করেছিল উভয় দলই সমানভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত। তবে দুইদল দুইভাবে।
হামাসের জয়ের কারণ ছিল দুটি বিভক্ত ফাতাহর নেতাদের পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়া এবং ভোটারদের এ সিদ্ধান্ত যে, ‘তোমরা ১০ বছরে শান্তির পথে অগ্রগতি করতে পারোনি। এবার অন্যদের সুযোগ দিয়ে দেখি।’ এই পর্যবেক্ষণকে জোরালো করেছিল ভোটারদের প্রতি একটি বিশেষ প্রশ্নের জবাব। প্রশ্নটি ছিল : ‘আপনি যদি মনে করেন শান্তি সম্ভব তাহলে কাকে ভোট দেবেন?’ হামাসের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ভোটার জবাব দিয়েছিল তারা ফাতাহর পক্ষে রায় দেবে। আসলে তারা বিশ্বাস করত না যে শান্তি সম্ভব। এবং সে জন্যই স্রেফ পুরনোদের তাড়াতেই ভোট দিয়েছিল। অন্য বেশি কিছু ভেবে না।
জনগণের জন্য দূরকল্প
আমরা জানি, সেবারের নির্বাচনের পরিণতি হয়েছিল বিপর্যয়কর। নির্বাচনে বিজয়ীদের কাজ ছিল দুটি : সরকার অর্থাৎ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে চালানো এবং জনগণের জন্য নেতৃত্ব আর দূরকল্প সৃষ্টি করা। তবে হামাস এসব প্রয়োজন পূরণ করতে আগ্রহী ছিল না। তারা যে দূরকল্প নেয় আর যে কৌশল অবলম্বন করে তা ধ্বংসই ডেকে আনে। তার পনেরো বছর পরে, আজ সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাসের আল কিদওয়া এবং জনপ্রিয় কারাবন্দি সাবেক ফাতাহ নেতা মারওয়ান বারঘুতি নির্বাচনী মাঠে নামায় ফাতাহর জন্য আরেকটি সুযোগ এসেছে। ফাতাহর ওপর মাহমুদ আব্বাসের নিয়ন্ত্রণের গতিশীল বিকল্প প্রদান এবং পরিবর্তনের কর্মসূচি উপস্থাপনের পাল্লায় যোগ দিয়েছেন তারা।
আল কিদওয়ার প্রস্তাবগুলো আধুনিক আর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। অন্যদিকে দ্বৈরথে বারঘুতির প্রবেশও চাঞ্চল্যের সঞ্চার করেছে। ফিলিস্তিনিদের এখন এটিই প্রয়োজন। আর এ কারণেই আব্বাসের উচিত ফাতাহর নিয়ন্ত্রণের ওপর তার মরণকামড় ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়ানো।
১৯৯৬ সালে কার্টার সেন্টার নির্বাচন পর্যবেক্ষণ দলের সদস্য ছিলাম আমি। ভোটের দিন দেইর আল বালাহ শরণার্থী শিবিরে গিয়েছিলাম। সেখানে ভোটারদের সারি এত দীর্ঘ ছিল যে সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও কেন্দ্র কয়েক ঘণ্টা বেশি খোলা রাখতে হয়েছিল। মানুষের অনুভূতি ছিল যে, তারা বড় এক পরিবর্তনের পথে রয়েছে। বেশ উৎসাহ নিয়ে ভোট দিচ্ছিল ফিলিস্তিনিরা। মনে হচ্ছিল, একটি রাষ্ট্র তাদের হাতের নাগালেই। সারা বিশ্বের দৃষ্টি ছিল তাদের ওপর। সেই দিনটির পঁচিশ বছর পর, আজ সেই অনুভূতি বাতাসে মিলিয়ে গেছে। স্বপ্নের সেই রাষ্ট্র আগের চেয়ে আরও দূরে। এমনকি বেশিরভাগ ভোটার এ বিষয়েও নিশ্চিত নয় যে, জাতিকে হতাশার অতলে নিমজ্জিত করা সেই একই পুরনো নেতৃত্ব নির্বাচন করা ছাড়া এই ভোট দিয়ে কী অর্জিত হবে। একটিমাত্র নির্বাচনের মাধ্যমে বারঘুতি এবং আল কিদওয়া ফিলিস্তিনিদের জাদু দিয়ে সেই অতল গর্ত থেকে উদ্ধার করতে পারবেন না। তবে তারা গর্তটা আরও গভীর করা বন্ধ করবেন। তাদের মধ্যে রয়েছে কৌশলে পরিবর্তন আনা, নতুন দূরকল্প তৈরি ও নতুন আশা জাগিয়ে তোলার প্রতিশ্রুতি। ফিলিস্তিনিদের ঠিক এটাই চাই এখন।
লেখক : ওয়াশিংটন ডিসির গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘আরব আমেরিকান ইনস্টিটিউট’ (এএআই) এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট।
এএআই একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান এবং আরব বংশোদ্ভূত মার্কিনিদের রাজনৈতিক ও নীতিগত বিষয় নিয়ে কাজ করে।
গালফ নিউজ থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ