করোনার কারণে গত বছর একটা বড় সময় স্থবিরতা নেমে এসেছিল ক্রীড়াঙ্গনে। করোনার বিস্তার কমতে শুরু করলে গত বছর আগস্টের পর থেকে ফের জেগে উঠতে শুরু করে ক্রীড়াঙ্গন। স্বাস্থবিধি মেনে দর্শকশূন্য গ্যালারিতেই স্বাভাবিকভাবেই চলছিল বিভিন্ন খেলা। সর্বশেষ বঙ্গবন্ধু নবম বাংলাদেশ গেমস দিয়ে পুরোদমে জেগে উঠেছিল দেশের ক্রীড়াঙ্গন। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউ অতিমারী আকার ধারণ করায় সরকার ফের কঠোর লকডাউনের পথে হাঁটছে। বুধবার থেকে দেশে এক সপ্তাহের জন্য কঠোর বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। ফলে জেগে ওঠা ক্রীড়াঙ্গনে ফের নেমে আসছে নিস্তব্ধতা।
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের দ্বিতীয়পর্ব বাংলাদেশ গেমসের পরপরই শুরুর পরিকল্পনা ছিল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের। সেটা এখন কবে শুরু হবে, সে সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিতে হচ্ছে সময়ের ওপর। ঘরোয়া ক্রিকেট স্থগিত হয়ে গেছে কয়েকদিন আগেই। সফর অসম্পূর্ণ রেখে দেশে ফিরে গেছে দক্ষিণ আফ্রিকা ইমার্জিং মহিলা ক্রিকেট দল। লকডাউনে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধের সিদ্ধান্ত হওয়ায় আবাহনী লিমিটেড এএফসি কাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচও নিয়ে রয়েছে শঙ্কায়। একইভাবে টোকিও অলিম্পিকের ওয়াইল্ড কার্ড পাওয়ার শর্ত পূরণে ভারোত্তোলক মাবিয়া আক্তার সীমান্তের উজবেকিস্তানে এশিয়ান ওয়েটলিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপে খেলতে যাওয়াও হচ্ছে না লকডাউনের কারণে। অলিম্পিককে সামনে রেখে আর্চারদের চলমান আবাসিক ক্যাম্প নিয়েও দ্বিধায় কর্তারা।
অনিশ্চয়তায় প্রিমিয়ার লিগ
গত ৭ মার্চ শেষ হয়েছিল বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের প্রথমপর্ব। পরিকল্পনা ছিল বাংলাদেশ গেমসের পুরুষ ফুটবল শেষ হওয়ার পর অর্থাৎ ৮ বা ৯ এপ্রিল দ্বিতীয়পর্ব শুরু করার। ১৩টি ক্লাবও সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু করোনার ব্যাপক সংক্রমণে সরকার লকডাউনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। ৫ এপ্রিল থেকে দেশে শুরু হয়েছিল ঢিলেঢালা লকডাউন। সেদিনই বাফুফে সব ধরনের ঘরোয়া কার্যক্রম স্থগিত করে দেয়। বুধবার থেকে কড়াকড়ি লকডাউন শুরু হলে লিগ শুরু করার কোনো সুযোগই থাকবে না। বাফুফের সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগ বিষয়টি সময়ের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছেন, ‘বাংলাদেশ গেমসের পরপরই লিগ শুরুর সব প্রস্তুতিই ছিল আমাদের। কিন্তু লকডাউনের কারণে এখন কোনো কিছুই আরম্ভ করার সুযোগ নেই। সব কিছুই এখন নির্ভর করছে করোনা পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ওপর। গত বছর মাত্র ছয় রাউন্ড হওয়ার পর স্থগিত হয়ে গিয়েছিল লিগ। পরে পুরো মৌসুম বাতিল ঘোষণা করা হয়েছিল। এবারও সে পথে হাঁটলে পরপর দু’টি মৌসুম শেষ হয়ে যাবে ফুটবলের পঞ্জিকা থেকে।
দ্বিধাদ্বন্দ্বে আবাহনী
১৪ এপ্রিল ঘরের মাঠে এএফসি কাপের প্রাক-বাছাইপর্বের ম্যাচে মালদ্বীপের ঈগলস এফসির মোকাবিলা করার কথা ছিল আবাহনী লিমিটেডের। লকডাউনের প্রথম ঘোষণার পরপরই এএফসিকে এই ম্যাচ ঢাকায় আয়োজনে অপারগতা জানায় আবাহনী। প্রথমে দর্শকশূন্য মাঠে এই ম্যাচ আয়োজনের কথা বলেছিল এএফসি। কিন্তু কঠোর লকডাউনের ঘোষণা আসায় ম্যাচটি নিরপেক্ষ ভেন্যুতে আয়োজন করতে বলে এশিয়ান ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থা। আবাহনী ২১ এপ্রিল ম্যাচটির বিকল্প ভেন্যু হিসেবে নেপালকে বেছে নিয়েছিল। নেপালও নিরপেক্ষ ভেন্যু হওয়ায় প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছিল। কিন্তু বাদ সেধেছে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধের সিদ্ধান্ত। বুধবার থেকে শুরু হওয়া লকডাউন চলাকালীন বন্ধ থাকবে সবধরনের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। তার মানে আবাহনীর নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলাও এখন অনিশ্চয়তায়। ক্লাবটির ফুটবল ম্যানেজার সত্যজিৎ দাস রুপু বলেন, ‘নেপালও রাজি হয়েছিল নিরপেক্ষ ভেন্যু হতে। আমরাও সব প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কিন্তু এখন আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সব কিছুই ফের অনিশ্চিত হয়ে গেছে। আমরা বাফুফের মারফত বিষয়টি এএফসিকে জানিয়েছি। এখন তাদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।’
উজবেকিস্তান যেতে পারছেন না সীমান্ত
ফেডারেশনের অন্তর্কোন্দলে ২০১৬ সালে ওয়াইল্ড কার্ড পেয়েও রিও অলিম্পিকে খেলা হয়নি দেশসেরা ভারোত্তোলক মাবিয়া আক্তার সীমান্তর। অলিম্পিক স্বপ্ন পূরণ করতে এবার ধনুুর্ভঙ্গপণ করেছিলেন এই ভারোত্তোলক। আন্তর্জাতিক ভারোত্তোলন ফেডারেশন এবার ১০টি ওয়াইল্ড কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোকে। তবে সেটা পেতে তারা শর্ত জুড়ে দিয়েছিল কমপক্ষে সাতটি আন্তর্জাতিক আসরে অংশ নেওয়া এবং ভাল পারফরমেন্স করার। ছয়টা আন্তর্জাতিক আসরে এর মধ্যেই অংশ নেয়া মাবিয়ার শর্তপূরণের শেষটিতে অংশ নিতে ১৯ এপ্রিল উজবেকিস্তান যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়া হচ্ছে না তার। হতাশা নিয়ে মাবিয়া জানান, ‘গতবার ফেডারেশনের ঝামেলার কারণে অলিম্পিক স্বপ্নপূরণ হয়নি। এবার টোকিও অলিম্পিকের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কিন্তু শেষ আসরটায় খেলা হচ্ছে না লকডাউনের কারণে। আমার ইভেন্ট ২১ এপ্রিল। যাওয়ার কথা ছিল ১৯ তারিখ। ফ্লাইট বাতিল হয়ে যাওয়ায় এখন যাওয়া হচ্ছে না। ওয়াইল্ড কার্ড পাব কি না এখন একটা ভীতি মনের মধ্যে থেকেই যাচ্ছে।’ বাংলাদেশ ভারোত্তোলন ফেডারেশন অবশ্য আশাবাদী সীমান্তের ওয়াইল্ড কার্ড পাওয়ার ব্যপারে। সহ-সভাপতি উইং কমান্ডার (অব.) মহিউদ্দিন আহমেদ জানান, ‘ওর পারফরমেন্স ভালো। তাছাড়া করোনার এই পরিস্থিতি সবারই জানা। ও যেতে পারছে না ফ্লাইট রেস্ট্রিকশন থাকায়। এটা নিশ্চয় আন্তর্জাতিক ভারোত্তোলন ফেডারেশন বিবেচনা করবে। আমরা বিষয়টি তাদের অবগতও করেছি। আমরা আশাবাদী ওর ওয়াইল্ড কার্ড পাওয়ার ব্যাপারে।’ সীমান্তর যাওয়া বাতিল হলেও অপর দুই ভারোত্তোলক জিয়ারুল ইসলাম ও মনিরা কাজীর যাওয়ার সম্ভাবনা এখনও আছে। তাদের ২১ এপ্রিল (লকডাউনের শেষ দিনে) যাওয়ার কথা রয়েছে। তবে লকডাউনের মেয়াদ বাড়লে তাদেরও যাওয়া বাতিল হয়ে যাবে।
আর্চারির ক্যাম্প নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা
সামনের মাসে সুইজারল্যান্ডের লুজানে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপ স্টেজ-২। এই আসরটি অলিম্পিকের দলগত ইভেন্টে কোটা প্লেস পাওয়ার শেষ সুযোগ আর্চারদের জন্য। সুযোগটি নিতে জোর প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশের আর্চাররা। টঙ্গীর শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়ামে জার্মান কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখের অধীনে চলছে আবাসিক ক্যাম্প। তবে কঠোর লকডাউনে এই ক্যাম্প চলবে কি না এ নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় আছেন বাংলাদেশ আর্চারি ফেডারেশনের কর্তারা। সাধারণ সম্পাদক কাজী রাজিবউদ্দিন আহমেদ চপল বলেন, ‘আমরা ক্যাম্প নিয়ে সিদ্ধান্ত নেব আগামীকাল (আজ)। কারণ অলিম্পিকের আগে সুইজারল্যান্ড ও জার্মানিতে বিশ্বকাপ স্টেজ-২ ও স্টেজ-৩ আছে। কোটা প্লেস পেতে এই দু’টি আসর আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এখন যদি ক্যাম্প বন্ধ করতে হয়, তাতে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। তারপরও সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে আমরা কোনো কিছু করব না।’