বাংলাদেশ থেকে ‘অনুপ্রবেশ’ প্রসঙ্গে অমিত শাহর যে যুক্তি

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বাংলাদেশকে বারবার বিষয় করে তুলেছে বিজেপি। তাদের প্রচারে বেশ নেতিবাচকভাবে স্থান পেয়েছে প্রতিবেশী দেশ।

বিশেষ করে কয়েক বছর ধরে সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে ‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে দেশটির কেন্দ্রের শাসক দল। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রচারণামূলক গানে সম্প্রতি বাংলাদেশকে এনে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। এবার আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে কথা বললেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।

তার মতে, বাংলাদেশে উন্নয়ন হলেও এর সুফল পাচ্ছে না সীমান্তবর্তী দরিদ্র মানুষেরা। তাই তারা ভারতে ‘অনুপ্রবেশ’ করছে।

গত ১০-১৫ বছরে বাংলাদেশের তো আর্থিক উন্নয়ন হয়েছে। তা-ও কেন লোকে পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ করছে? আগের কথার সূত্র ধরে তোলা এমন প্রশ্নের জবাবে শাহ বলেন, “এর দুটো কারণ আছে। এক, বাংলাদেশের উন্নয়ন সীমান্ত এলাকায় নিচুতলায় পৌঁছায়নি। যে কোনো পিছিয়ে-পড়া দেশে উন্নয়ন হতে শুরু করলে সেটা প্রথম কেন্দ্রে হয়। আর তার সুফল প্রথমে বড়লোকদের কাছে পৌঁছায়। গরিবদের কাছে নয়। এখন বাংলাদেশে সেই প্রক্রিয়া চলছে। ফলে গরিব মানুষ এখনো খেতে পাচ্ছে না। সে কারণেই অনুপ্রবেশ চলছে।”

এ ‘অনুপ্রবেশ’কে দেশের অন্যান্য রাজ্যের সমস্যা হিসেবে দেখিয়ে বলেন, “যারা অনুপ্রবেশকারী, তারা যে শুধু বাংলাতেই থাকছে, তা নয়। তারা তো ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। জম্মু-কাশ্মীর পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। দ্বিতীয়, আমি মনে করি এটা প্রশাসনিক সমস্যা। প্রশাসনিকভাবেই এর মোকাবিলা করতে হবে। সেটা পশ্চিমবঙ্গের সরকার করেনি।”

আলাপচারিতার একপর্যায়ে তিনি বলেন, “আমার মতে, বাংলার সবচেয়ে বড় সমস্যা অনুপ্রবেশ। বাংলা ভারতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তবর্তী রাজ্য। উত্তর-পূর্বের সঙ্গে সংযোগকারী রাজ্য। আবার উত্তর-পূর্বাঞ্চল সাতটি দেশের সঙ্গে আমাদের দেশের সংযোগকারী এলাকা। বাংলায় যেভাবে রাজনৈতিক কায়েমি স্বার্থের কারণে প্রথমে কমিউনিস্ট এবং তার পরে তৃণমূল অনুপ্রবেশকে মদত দিয়েছে, তাকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে রুখতে হবে।”

তার মতে, কলকাতার নাগরিকও ‘অনুপ্রবেশ’ থেকে বাঁচতে পারবে না। অমিত শাহ বলেন, “বাংলার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা শুধু বাংলা নয়, গোটা দেশের জন্য চিন্তার। আগামী ১০ বছর পর কলকাতার নাগরিকও অনুপ্রবেশ থেকে বাঁচতে পারবে না। একটা কথা বলা হয় যে, বিএসএফ ভারত সরকারের সংস্থা। কিন্তু এত বড় একটা সীমান্ত, যেখানে নদী-নালা, জঙ্গল-পাহাড় এবং সমতলভূমি রয়েছে, সেখানে যতক্ষণ না আপনি একটা বাস্তুতন্ত্র তৈরি করছেন, ততক্ষণ অনুপ্রবেশ বন্ধ করা যাবে না।”

তিনি জানান, যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ায় আসামে ‘অনুপ্রবেশ’ কমে ১০ শতাংশ হয়েছে।

‍“বাস্তুতন্ত্র বলতে সীমান্তে বেড়া দিতে হবে, থানাগুলো এবং জেলাশাসককে সতর্ক থাকতে হবে। কেউ সীমান্ত পেরিয়ে এলে কোথায় থাকে? কারা তাদের আশ্রয় দেয়? বিএসএফ সীমান্তে নজরদারি করে। কিন্তু যদি কেউ ভিতরে ঢুকে পড়ে, তা হলে কে দেখবে? গরুপাচার কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না? আমরা আসামে এই বাস্তুতন্ত্রটা হাতেকলমে করেছি। বেড়ার উপর ক্যামেরা লাগিয়েছি। তার সংযোগ পুলিশ থানায় দিয়েছি। জেলাশাসক, বিএসএফ এবং থানা— তিন পক্ষের উপরেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ক্যামেরার ফুটেজ দেখার জন্য। সেই কারণেই অনুপ্রবেশ কমে ১০ শতাংশ হয়ে গিয়েছে। এটা প্রমাণিত তথ্য। পশ্চিমবঙ্গেও এটা করতে হবে। এটা কমিউনিস্ট, কংগ্রেস বা তৃণমূল— কেউই করতে পারবে না। কারণ, তিনটি দলই অনুপ্রবেশকারীদের নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক বানিয়েছে। শুধু বিজেপি করতে পারবে।”

‘শরণার্থী’ প্রসঙ্গে অমিত শাহর ভাষ্য, “এখানে অনেক মানুষ শরণার্থী হয়ে এসে বেআইনিভাবে বসবাস করছেন। আমরা এখানে ক্ষমতায় এসে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের মাধ্যমে তাদের সম্মানজনকভাবে বাঁচার অধিকার দেব। এর ফলে বাংলার জীবনযাত্রারও অনেক পরিবর্তন হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভালো হবে বলে আমি মনে করি। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন চালাব। সবচেয়ে বড় কথা, অনুপ্রবেশকে এত কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করব যে, পরিষ্কার বার্তা যাবে, বাংলায় এখন অনুপ্রবেশ করা সহজ নয়।”

একই পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আগের দিন ভারত সরকারের প্রভাবশালী এই ব্যক্তি জানান, পশ্চিমবঙ্গ থেকে সব গরু বাংলাদেশে পাচার হওয়ায় সেখানে ‘আমূল’-এর মতো ডেইরি ফার্ম হচ্ছে না। একইসঙ্গে জানান, বাংলাদেশের সঙ্গে ছিটমহল বিনিময়ের পর যে রাস্তা খুলবে, সেটা উত্তর-পূর্বের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ এবং সংক্ষিপ্ত করে দেবে।