খালি চোখে একটু দূর থেকে দেখলে মনে হবে জমির সব ধান পুষ্ট। পাকা ধান কেটে ঘরে তোলার অপেক্ষা কেবল। কিন্তু তা না। বিষয়টি পুরোপুরিই ভিন্ন। জমিতে ধান আছে। পাকা রংও ধারণ করেছে। অথচ ধানে দানা নেই। আছে চিটা। পুড়ে পাকা বাদামি হয়ে আছে ধান। এভাবেই মেহেরপুরে হিটস্ট্রোকে মরে চিটে হয়ে গেছে বিস্তীর্ণ মাঠের বোরো ধান।
কৃষকদের অভিযোগ- তারা কৃষি বিভাগের পরামর্শ সাহায্য চেয়ে পাননি। অন্যদিকে কৃষি বিভাগ বলছে- হঠাৎ হিটস্ট্রোক দেখা দেওয়ায় কৃষি বিভাগ পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ পায়নি।
গতকাল সোমবার সরেজমিন দেখা গেছে- মেহেরপুর সদর উপজেলার রাজাপুর, শালিকা, বাজিতপুর, হরিরামপুর, মুজিবনগর উপজেলার শিবপুর, আনন্দবাস, বাগোয়ান, দারিয়াপুর এবং গাংনী উপজেলার চোখতোলা, ষোলটাকা, কসবা, সাহারবাটি, কাজীপুর, ধানখোলা গ্রামের বিস্তীর্ণ জমির ধান পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। গাছে প্রচুর শীষ ধরেছে। শীষের বোঝায় নুয়ে গেছে গাছ। সব শীষ বাদামি রং ধারণ করেছে। মনে হচ্ছে ধান পেকে এখন কাটার অপেক্ষায় আছে। কিন্তু শীষ থেকে ধান হাতে নিয়ে দেখা গেল ভেতরে অপুষ্ট চাল। পুড়ে চিটা হয়ে গেছে। এভাবেই জমিতে ধান আছে। অথচ ধানে চাল নেই। আছে চিটা। মাঠে মাঠে কৃষকদের হাহাকার আর অভিযোগ।
প্রান্তিক চাষিরা বললেন- এই ধানে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তারা পরবর্তী ফসল ফলানোর পুঁজি হারিয়েছেন। চাষিরা বলছেন- যে বোরো ধানে বিঘায় ২৫-৩০ মণ ধান উৎপাদন হতো। এবার সেখানে এক মণও হবে না।
রাজাপুর গ্রামের চাষি হেমায়েত উদ্দিন বলেন, প্রতিবারের মতো এবারও যথাযথ নিয়ম মেনেই ধান লাগাই। ফলনও ভালো হয়। গাছে শীষ দেখে মন ভরে গিয়েছিল। পানি, সেচ, সার কোনো কিছুরই কমতি করিনি।
আনন্দবাস গ্রামের চাষি সফিকুল খন্দকার জানান- ভাবলাম ধান পেকে গেছে। এবার কেটে ঘরে তুলব। কিন্তু ধান হাতে নিয়ে দেখি ভেতরে দানা অপুষ্ট। পুড়ে চিটা হয়ে গেছে। ধানখোলা গ্রামের চাষিদের অভিযোগÑ ধানের এই অবস্থা আমরা ১ মাস আগে বুঝতে পারি। তখন কৃষি অফিসকে বলি পরামর্শ দিতে। কিন্তু তারা মাঠ পরিদর্শন করেনি। পরামর্শও দেয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কৃষি বিভাগের একাধিক মাঠ পরিদর্শক বলেন, মেহেরপুরের গমের পর এবার ধানে ব্লাস্ট রোগ দেখা দিল। আমরা এটাকে হিটস্ট্রোক বলে চালিয়ে দিচ্ছি। কেননা, যে জমির ধানে ব্লাস্টরোগ দেখা দেবে সেই জমির ধান আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা ছাড়া প্রতিকার নেই। আমরা পূর্বাভাস পেলে প্রতিকারের ব্যবস্থা করা যেত। কিন্তু করোনা সেই সুযোগ দেয়নি।
মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক স্বপন কুমার খাঁ জানান- জেলায় এবার বোরো ধানের চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে। কিন্তু আরও ১৫০ হেক্টর বেশি জমিতে এবার ধান চাষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূল থাকায় ফলনও ছিল ভালো। কিন্তু বৈশাখী ঝড়, বজ্রপাত এবং অতি খরা ধানের এই বিপর্যয়ের কারণ। তিনি জানান- ক্ষতিগ্রস্ত কিছু জমির ধান ব্লাস্টরোগে আক্রান্ত হয়ে মরে গেছে। আবার অনেক জমির ধান আকস্মিক তাপমাত্রা বেড়ে হিটস্ট্রোকে মরে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে ব্লাস্ট বা হিটস্ট্রোকে ১০ ভাগ জমির ধান নষ্ট হয়েছে। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের তালিকা করে তাদের প্রণোদনা বা সহজ শর্তে কৃষিঋণের উদ্যোগ নেবেন বলে জানান।