ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিল্প দুর্ঘটনা সাভারের রানা প্লাজা ধসের ৮ বছর পূর্তিতে ঘটনার দ্রুত বিচার শুরুর দাবি জানিয়েছেন হতাহত শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যরা।
দিবসটি পালন উপলক্ষে শনিবার সকাল থেকেই ভবন ধসের স্থানে নির্মিত অস্থায়ী বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন পুলিশ, শ্রমিক ও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক পরিবারের সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার সাধারণ মানুষ।
এছাড়া এদিন সকাল থেকেই দিবসটি উপলক্ষে নানা কর্মসূচি পালন করেছে রানা প্লাজার আহত ও নিহত শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যরা। তাদের সঙ্গে কর্মসূচিতে যোগ দেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনও। নিজ নিজ সংগঠনের ব্যানার ছাড়াও শ্রমিক নেতারা সম্মিলিতভাবে একত্রে অস্থায়ী বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় ওই ঘটনায় নিহতদের রুহের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে এক মিনিট নীরবতা পালন ও দোয়া করা হয়।
বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১ এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আব্দুল আউয়ালের নেতৃত্বে পুলিশ সদস্যরা অস্থায়ী শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এর আগে সাভার মডেল থানা-পুলিশের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এএফএম সায়েদসহ পুলিশের সদস্যরা।
এ সময় সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আব্দুল আউয়াল বলেন, রানা প্লাজা ধসের ঘটনাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত দুঃখজনক এবং মর্মান্তিক ঘটনা। যদিও আমি সে সময় এখানে ছিলাম না তবুও টেলিভিশন এবং বিভিন্ন মিডিয়ার এর ভয়াবহতা দেখেছি। এ ঘটনার পর আমাদের গার্মেন্টস সেক্টরে অনেক বাধা এসেছে যা ইতিমধ্যে আমরা কাটিয়ে উঠেছি।
রানা প্লাজার ধসের সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবি করা শ্রমিক ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে একমত পোষণ করে তিনি শ্রমিক নেতৃবৃন্দকে বলেন, যারা রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত এবং ভুক্তভোগী আছেন আপনারা তাদেরকে খুঁজে বের করেন, ইনশা আল্লাহ তাদের উপযুক্ত পাওনা আদায়ে আমরা সহযোগিতা করব। এছাড়াও বিভিন্ন কলকারখানায় শ্রমিকদের দাবি আদায়ে আন্দোলনের ঘটনায়ও তিনি সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেয়ার কথা জানান।
শ্রদ্ধা জানাতে আসা ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা জানান, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর পোশাক শিল্পে আমুল পরিবর্তন আসলেও এখানে ভবন ধসে আহত, পঙ্গু, শ্রমিকদের জীবনে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগেনি। বিছানায় শুয়ে এখনো বিনা চিকিৎসায় ধুকে ধুকে মারা যাচ্ছে তারা। কিছুদিন আগেই আহত শ্রমিক খালেদা বেগম বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। এর আগে আহত শ্রমিক জুয়েল ও তার স্ত্রী মারা যায়। কিন্তু টাকার অভাবে তাদের লাশটি গ্রামের বাড়িতে নিতেও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।
আহত পঙ্গু শ্রমিক ইয়ানুর বেগম বলেন, আপনারা আমাকে বাঁচার মতো একটা ব্যবস্থা করে দেন যাতে কোন রকমে ডালভাত খেয়ে ভাই-বোন আর সন্তানকে নিয়ে চলতে পারি। বাবা হারা এই নারীর ৬ ভাইবোনের মধ্যে তিনিই সবার বড়। বিয়ে করেছেন একজন রাজমিস্ত্রিরা। নিজেরও রয়েছে একটি দুই বছরের ছেলে সন্তান। সবাইকে নিয়ে তিনি এখন অনাহারে অর্ধাহারে জীবন কাটাচ্ছেন। এ অবস্থায় যদি কেউ তাকে সহায়তা না করেন তাহলে আত্মহত্যা ছাড়া কোন পথ থাকবে না বলেও জানান তিনি।
রানা প্লাজা সারভাইভারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এর পক্ষ থেকে রানা প্লাজার সামনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলন থেকে বলা হয়, জাতীয় সংসদ ভবনে দাঁড়িয়ে তৎকালীন কৃষি মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেছিলেন রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রধান মন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ১২৭ কোটি টাকা জমা হয়েছে। সেখান থেকে পরবর্তীতে ২২ কোটি টাকা বিতরণ করা হলেও ১০৫ কোটি টাকা আমরা আজও পাইনি।
সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদুল হাসান হৃদয় ধসে পড়া রানা প্লাজার ৮ম তলার নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেড কারখানায় কোয়ালিটি ইন্সপেকশন হিসেবে কাজ করতেন। এ দুর্ঘটনায় তিনি মেরুদণ্ডে, পায়ে, বুকে ও মাথায় আঘাত পেয়ে পঙ্গু হয়ে যান। এখন নিয়মিত চিকিৎসা নিয়ে ওষুধ সেবনের পাশাপাশি থেরাপি দিতে হয় তাকে।
একই কারখানার শ্রমিক হালিমা বেগম কয়েকবার অপারেশন করার পরও অসুস্থ। পায়ে রড লাগানো অবস্থায়ও থেরাপি দিতে হয় তার। রেহেনা আক্তার নামে অপর শ্রমিকের একটি পা কেটে ফেলা হয় দুর্ঘটনার পর। ব্যথার যন্ত্রণায় নীরবে চোখের জল ফেললেও অভাব এবং কষ্টের কথা কাউকে বলতে পারেন না। ভবনটির ৬ষ্ঠ তলার শ্রমিক নিলুফা ইয়াসমিন, বাকি বিল্লাহ, রেখা বেগম, আফরোজা বেগম, রাশিদা বেগমসহ অনেক শ্রমিকেরই কোমরে, পায়ে ও মাথায়সহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্যাথা। হাড় ভেঙে গেছে কারও, কারও আবার অঙ্গহানিসহ বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। পায়ে ৩২টি সেলাই, ডান হাত কেটে ফেলার পাশাপাশি ডান পা ভাঙা অবস্থায় একটি চাকরির জন্য জীবনযুদ্ধ পরাজিত হয়ে বসে পড়েছেন সাদ্দাম হোসেন।
সংবাদ সম্মেলন থেকে ৬ দফা দাবি জানায় ভুক্তভোগী শ্রমিকরা। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- এক জীবনের আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ ৪৮ লাখ টাকা, আহত শ্রমিকদের পুনর্বাসন, শ্রমিক পরিবারের সদস্যদের আজীবন বিনা মূল্যে চিকিৎসা প্রদান, গার্মেন্টস মালিক ও ভবন মালিকসহ সকল অভিযুক্তদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা, ২৪ এপ্রিলকে শিল্প শ্রমিক হত্যাকাণ্ড দিবস ঘোষণা ও একটি স্থায়ী স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ, গার্মেন্টস মালিক ও ভবন মালিকসহ সকল অভিযুক্তদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও শ্রমিক পরিবারের লোকদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাংগঠনিক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, এখনো রানা প্লাজার মামলার বিচার কাজ শুরু হয়নি। আমাদের দাবি ছিল শ্রম আইনের ধারা সংশোধন করে গার্মেন্টসের যারা মালিক ছিল তাদেরকে বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। কিন্তু আমরা দেখলাম শ্রম আইন সংশোধন হলো ঠিকই কিন্তু শ্রমিকদের সেই দাবি উপেক্ষিত থেকে গেল। এছাড়া অনেক সময় আমরা দেখি বিভিন্ন মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে শেষ হয়, কিন্তু রানা প্লাজা ধসের আট বছর পার হলেও এর বিচার কার্যক্রম শুরু হয়নি। গার্মেন্টস মালিক ও ভবন মালিকের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এই শ্রমিক নেতা যাতে ভবিষ্যতে আর কোন মালিক এভাবে শ্রমিক হত্যা করতে সাহস না পায়। এ সময় শ্রমিক নেতা সৌমিত্র কুমার দাস, রফিকুল ইসলাম সুজন, ইমদাদ হোসেন সহ অনেকেই তার এ দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন।
এছাড়াও উপস্থিত শ্রমিকরা তাদের দাবি আদায়ে সেখানে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেন। এ সময় শ্রমিকরা ধসে পড়া রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানার ফাঁসির দাবি জানান সরকারের কাছে। রানা প্লাজার আট বছর পূর্তিতে যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন ছিল।