প্রস্তুত হচ্ছেন লাল মাটির রাজা

রাফায়েল নাদাল বরাবরই লাল দুর্গের রাজা। কিন্তু গত সপ্তাহে তার সেই আধিপত্য নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছিল। মন্টে কার্লোতে আন্দ্রে রুবলেভের কাছে তিন সেটের লড়াইয়ে হেরে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নিয়েছিলেন তিনি। ১১ বারের ট্রফি জয়ী নাদালকে বেরিয়ে যেতে দেখে অনেকেই বলেছিলেন সম্রাটের দিন ফুরিয়ে আসছে। না হলে রুবলেভ, ডমিনিক তিম কিংবা আলেকজান্ডার জেরেভদের কাছে তিনি লাল দুর্গে হারবেন কেন? নাদাল নিজে অবশ্য ম্যাচের পর শান্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা এটা। এখানে হেরে যাওয়া বরাবরই দুঃখের। লাল কোর্টে মৌসুমটা ভালোভাবে শুরু করার সুযোগ হারালাম। দেখা যাক বার্সেলোনায় কী হয়!’

না, ঘরের মাঠে ঠিকই শিরোপা জিতেছেন ম্যাটাডোর। মন্টে কার্লোতে যিনি ফোরহ্যান্ডে একের পর এক উইনার মারা রুবলেভের কাছে দিশেহারা ছিলেন সেই তিনিই ৬-৪, ৬-৭ (৬-৮), ৭-৫ গেমে হারিয়েছেন গ্রিসের স্টেফানোস সিতসিপাসকে। অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের কোয়ার্টারে এই গ্রিকের কাছে হারার পর প্রথম দেখায় নাদালের প্রতিশোধ সম্পন্ন হলো। এ নিয়ে ১২ বার বার্সেলোনা ওপেনে চ্যাম্পিয়ন হয়ে রেকর্ড গড়লেন।

টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই খেলা দেখে মনে হচ্ছিল বার্সেলোনায় রেকর্ড গড়ার দিকেই এগোচ্ছেন নাদাল। ফাইনালে সেটাই সত্যি হয়েছে। ক্লে-কোর্টের রাজা প্রথম সেট সহজে জিতলেও দ্বিতীয় সেটে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ান সিতসিপাস। এরপর তৃতীয় সেট-সহ হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পরে শিরোপা জেতেন নাদাল।

সেমিফাইনালে স্পেন জাতীয় দলের সতীর্থ পাবলো বুস্তার বিপক্ষে খেলেন নাদাল। সেই ম্যাচে চেনা প্রতিপক্ষকে দাঁড়াতে দেননি। বুস্তাকে কার্যত উড়িয়ে দিয়ে রাফা জেতেন ৬-৩, ৬-২ সেটে। তখনই ফাইনালে প্রতিপক্ষ সিতসিপাসকে নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ওকে এবার হারানো সত্যিই কঠিন। আমার বিরুদ্ধে নামবে মন্টে কার্লো আর এখানে এখন পর্যন্ত একটা সেটও না হারিয়ে। বুঝতেই পারছেন, কাজটা কতটা কঠিন।’ রবিবার সেই কঠিন কাজটা সেরে ফেলেছেন নাদাল। এবার সামনে ফেঞ্চ ওপেনের চেনা মঞ্চ। জিতলেই কিংবদন্তি রজার ফেদেরারকে পেছনে ফেলবেন তিনি। দুই জনের গ্র্যান্ডসø্যামের সংখ্যা ২০। বার্সেলোনায় নাদালকে যে ছন্দে দেখা গেল তাতে লোকে তাকে নিয়ে নিশ্চিন্তে বাজি ধরতে পারে।

ক্লে-কোর্টের দ্বিতীয় টুর্নামেন্টে নাদাল স্বদেশি পাবলো কারোনা বুস্তাকে হারানোর আগে ক্যামেরন নোরিকে উড়িয়ে দেন। সেই ম্যাচের পরেও তিনি খুশি ছিলেন না। বিশ্বের তিন নম্বর তারকা বলেছিলেন, ‘দ্বিতীয় সেটে আমি এলোমেলো টেনিস খেলেছি। সেমিফাইনালে তার পুনরাবৃত্তি হবে না।’ পুনরাবৃত্তি হয়ওনি। নাদালের সার্ভিস আর অনবদ্য সব রিটার্নের সামনে বুস্তা দাঁড়াতে পারেননি। বোঝা যাচ্ছিল ফাইনালে সিতসিপাসও দাঁড়াতে পারবেন না। কারণ সেমিফাইনালের লড়াই জিতেই  কোচ কার্লোস মোয়াকে নিয়ে অনুশীলনে নেমে পড়েছিলেন। আসলে মন্টে কার্লোতে আন্দ্রে রুবলভের কাছে হার তাড়া করে ফিরছিল তাকে। বার্সেলোনা ওপেনে শিরোপা না নিয়ে তিনি ফিরতে চাননি। শেষ পর্যন্ত নাদালের অদম্য আগ্রহের জয় হয়েছে। নিজের দেশের চেনা দর্শকের সামনে ট্রফি হাতে নিয়ে বলেছেন, ‘আমার গ্রাউন্ড স্ট্রোক নিয়ে একটু সমস্যা হচ্ছিল। তাই কোচের সঙ্গে অনুশীলন কোর্টে নেমে পড়েছিলাম ম্যাচ শেষ করেই। আসলে বার্সায় খুব ভালো কিছু করাটাই আমার একমাত্র লক্ষ্য ছিল। অন্য কিছু মাথায় রাখিনি।’ তিন ঘণ্টা ৩৮ মিনিটের লড়াই শেষে তিনি আরও বলেন, ‘ইনজুরির কারণে গত কয়েক মাসে আমি বেশি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলতে পারিনি। আজকের লড়াই আমাকে নিজের ফিটনেস সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেবে। লম্বা ম্যাচ খেলার শক্তি জোগাবে। আমার মনে হয় এই টুর্নামেন্টের সপ্তাহ জুড়ে ক্রমশ আমি ভালো খেলেছি। আগের ম্যাচের চেয়ে আজ ভালো খেলেছি। এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। আর দশজনের মতো আমিও নিখুঁত নই। তবে আমার বিশ্বাস ক্লে-কোর্টে আমি এর চেয়েও ভালো খেলতে পারি।’ আগামী সপ্তাহে মাদ্রিদ ওপেন খেলবেন নাদাল। তারপর ফেঞ্চ ওপেন। এ কথা শোনার পর এখন থেকেই সাবধানতা অবলম্বন করুন প্রতিপক্ষরা।

ভয় না পেলে সিতসিপাসের কথা মনে রাখবেন। ‘ক্লে-কোর্টে রাফার সঙ্গে পেরে ওঠা কঠিন। সেটা ভালো করেই জানি। তবু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার চেষ্টা করেছি।’ ইদানীং ক্লে-কোর্টে বেশ ভালো খেলেন সিতসিপাস। মন্টে কার্লোতে তিনি চ্যাম্পিয়ন হয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন। নাদালের বিরুদ্ধে নামার আগে টানা নয়টি ম্যাচ জিতেছিলেন। এর চেয়েও বড় কথা, এবারের অস্ট্রেলিয়া ওপেনে তার কাছে হেরেই বিদায় নিয়েছিলেন রাফা। ক্লে-কোর্টে তাকে হারিয়ে এবার প্রতিশোধের সঙ্গে একটা বার্তাও দিলেন তিনিÑ লাল দুর্গের রাজা নাদালই।