অস্ত্র বিচার ভারি কড়া!

ছোরা নাকি ছুরি! তর্ক চলে আদালতে। ফলা আর বাঁট মাপে ইঞ্চিতে। ছুরি হলে বেকসুর খালাস। ছোরা হলেই সর্বনাশ! সাত বছরের কারাবাস। এর চেয়ে আর কম নেই আমাদের অস্ত্র আইনে (ধারা-১৯)। ঊর্ধ্বে তো যাবজ্জীবন। অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী দূরে থাক, ফৌজদারি বিচারে বসার আগে কাছ থেকে অস্ত্র দেখাও হয়নি বাপজন্মে। বাবা যে ডাক্তার ছিলেন, তিনি না হাতুড়ে না অস্ত্রোপচারী; নিতান্তই জেনারেল প্র্যাকটিশনার। তর্কযুদ্ধের মাঝে অস্ত্র বিচারে পড়তে হয় ধন্দে! জীবন-জীবিকার নানান কাজের সহায়কগুলো ‘অস্ত্র’, ‘হাতিয়ার’ জানি। সংস্কৃত আদি অর্থে ‘অস্ত্র’ হলো যা থেকে কিছু নিক্ষেপ করে হতাহত করা যায় যেমন কামান, বন্দুকাদি, আর আদ্যিকালের তীর-ধনুকাদি। হাতে নিয়ে যেটা দিয়েই হতাহত করা যায় সেটা ‘শস্ত্র’, যেমন ছোরা, তলোয়ারাদি। বাংলায় এসে সব একাকার হয়ে চলে ‘অস্ত্র’। হিন্দি থেকে আসা ‘হাতিয়ার’ শব্দে ‘অস্ত্র’ ও ‘শস্ত্র’ দুটোকেই বোঝালেও চলে না বাংলার আদালতে। 

হতাহত করার অস্ত্রশস্ত্র সম্পর্কে তখনকার ব্রিটিশ-ভারতে যেসব আইন ছিল সেগুলো গুছিয়ে গাছিয়ে ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে হয় ‘আর্মস অ্যাক্ট’। আমাদের বাংলায় সেটাই চলে ‘অস্ত্র আইন’ বলে। এই আর্মস অ্যাক্ট করার একশ ঊননব্বই বছর আগে ১৬৮৯ খ্রিস্টাব্দে ‘ডিক্ল্যারেশন অব রাইটস’-এ ব্রিটিশ তার নিজ দেশের লোকদের আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র রাখার লাই দিয়েছিল লাইসেন্স বাদেই। কেবলই সেটা প্রোটেস্ট্যান্টদের। প্রোটেস্ট্যান্ট গোষ্ঠী সে-বছর ‘গ্লোরিয়াস রেভ্যুলেশন’-এ ক্যাথলিকদের হটিয়ে ক্ষমতা দখল করে। সেই ডিক্ল্যারেশনের অনুপ্রেরণায় একশ দুই বছর পরে ১৭৯১-এ সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উদার হয়ে সবাইকে আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র রাখার লাই দেয় লাইসেন্স বাদে।

সেই ব্রিটিশই আমাদের ‘আর্মস অ্যাক্ট’ বানিয়েছে ‘টাইট’ করে। আগ্নেয়াস্ত্র কামান, বন্দুক, সেকালের সমরাস্ত্র তলোয়ার, বেয়োনেটের সঙ্গে আদ্যিকালের ছোরা, বর্শা, বল্লম, তীর-ধনুককেও ‘আর্মস’-এর মধ্যে ঢুকিয়ে লাইসেন্সের প্যাঁচ কষে গেছে। লাইসেন্স ছাড়া রাখার লাই  নেই কোনোটাতে। বাংলায় ১৭৬০-১৮১২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মজনু শাহের (মৃত্যু ১৭৮৮) ফকির-সন্ন্যাসী আর ১৮২৭-১৮৩১ পর্যন্ত তিতুমীরের (মৃত্যু ১৮৩১) কৃষক-প্রজাদের হাতে আদ্যিকালের ছোরা, বর্শা, বল্লম, তীর-ধনুকেই বন্দুকবাজ ব্রিটিশ যে দাবড়ানি খেয়েছিল সেই ভয়ংকর স্মৃতিতে প্রজাদের হাতে হাতে আত্মরক্ষার ভার ছাড়েনি কিছুতে। ভাগ্যিস, কম্যুনিস্টরা তখনো আসেনি ভারতে! নইলে গাঁইতি-শাবল, কাস্তে-হাতুড়িও ঢুকত আর্মস অ্যাক্টে! আত্মরক্ষা শিকেয় তুলে বাঙালির জীবন গেল উপনিবেশ আর রাষ্ট্র রক্ষা করতে করতে। সাধে কি আর সেকালের দাদাঠাকুর (শরৎ চন্দ্র পণ্ডিত, ১৮৮১-১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দ) গান বেঁধেছিলেন   

“বিনা পাসে এনো না মা অত হাতিয়ার

জানিস তো মা মোদের দেশে আর্মস অ্যাক্ট ভারি কড়া

পাস না নিয়ে এলে মাগো পড়বে হাতে হাতকড়া

সাবধান হয়ে আসিস মা তারা।”

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশের পক্ষে ভারতীয়দের নামাতে ১৯১৮-তে নাকি এক লিফলেটে মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, ‘ভারতে ব্রিটিশ শাসনের খারাপিগুলোর মধ্যে গোটা জাতিকে অস্ত্রবঞ্চিত রাখাটাই নিকৃষ্টতম বলে ইতিহাসে ঠাঁই পাবে। তবে, এই অস্ত্র আইন বাতিল চাইলে, অস্ত্রচালনা শিখতে চাইলে এখনই সুবর্ণ সুযোগ! ভারতে ব্রিটিশ সরকারকে এই ঘোর দুর্দিনে যদি মধ্যবিত্তরা (উচ্চবিত্তরা যুদ্ধে যায় না, যুদ্ধ লাগায়!) স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করে তাহলে ভারতীয়দের প্রতি ব্রিটিশের অবিশ্বাসও ঘুুচবে, অস্ত্র রাখার বাধাও কাটবে।’ ভারতীয়দের (বাঙালিরও) অস্ত্রচালনা শেখা হলো ঠিকই; তবে, অবিশ্বাসও যায়নি, বাধাও যায়নি গান্ধীজির জীবৎকালে। স্বাধীন ভারতে আততায়ীর (নাথুরাম গডসে) সেমি-অটোমেটিক পিস্তলের গুলি তার জীবনের নিঃশ্বাসের সঙ্গে সবার বিশ্বাসও নেয় কেড়ে (৩০ জানুয়ারি, ১৯৪৮)।

ভারত ১৯৫৯-এ নতুনভাবে আর্মস অ্যাক্ট সাজিয়েছে; ছোরারও লাইসেন্সের প্যাঁচ তো ছুটেইনি, উল্টো শাস্তিই বাড়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে। ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোও আত্মরক্ষাধিকারীদের ট্রিগার-বিলাসের খেসারত দিতে দিতে আর বিশ্বাস রাখতে পারছে না। অস্ত্র রাখার অবাধ অধিকারে তারাও বাদ সাধছে। চালাক ব্রিটিশ সে-কাজটাও করেছে এদের সবার আগে। আত্মকলহবাজ বাঙালির হাতে হাতে অস্ত্র না ছেড়ে তো তবে ব্রিটিশ নিজেরই অজান্তে সেকালেই সুদূরপ্রসারী মহৎ কাজ করে গেছে! দু-চারটা দুষ্টের দমন বড়ই সহজ হয়ে যায় শিষ্ট-অশিষ্ট সবাইকেই শাসনে বাঁধলে! সরকার-বিশ্বাসী আমার আত্মরক্ষার ভরসা বরাবরই সরকারের ওপর! ছোরাও চাই না, ছুরিও চাই না।

আমাদের অস্ত্র আইনে ব্রিটিশ ছোরা (ড্যাগার) বসালেও ছুরি (নাইফ) ঢোকায়নি স্পষ্ট করে। কালের গতিকে ভারত, পাকিস্তানের হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্ট খোলাসা করতে লাগে কোন ছুরিটা ঢুকবে। আমাদেরও হাইকোর্টের স্পষ্ট কথা ছোরা-ছুরির নাম দিয়ে কাম নাই, কৃষি ও গৃহস্থালি কাজেরগুলো বাদে হতাহত করার আক্রমণাত্মক সব ধারালো জিনিসও অস্ত্র (৫০ ডিএলআর ৫২৯, ৫২ ডিএলআর ৫৪৪, ৫৩ ডিএলআর ৫২৭)। বিনা লাইসেন্সে এসব বানানো, বিক্রি করা এবং বিক্রির মতলবে রাখা দণ্ডনীয় সুনির্দিষ্ট বিধানে [Sections 5 & 19(a)]। বিক্রির মতলব ছাড়া দু-একখানা ঘরে রাখতে ব্রিটিশই লাই দিয়ে গেছে, নিষেধের বা দণ্ডের বিধান বাদ রেখে। প্রজার নিজের ঘরে নিজের আত্মরক্ষার এইটুকু ফাঁক হয়তো রেখেছিল কায়দা করে। ছোরার কারখানা-দোকান বন্ধ করেনি একেবারে, লাইসেন্সটা লাগবে। আবার, একখানাও কিনে আনার ফাঁক দিয়েছে মেরে। বিনা লাইসেন্সে একটা টুকরাও সঙ্গে নিয়ে চললে যেতে হবে জেলে [Sections 13 & 19(e]। অস্ত্রের টুকরা-টাকরাও অস্ত্র বটে (ধারা ৪)।

সচল না অচল, সেটা অস্ত্র না খেলনা তার এক্সপার্ট রিপোর্টও লাগে না মামলা করতে (১৯৮০-তে ঢোকানো (section 30A)। ঘরের ভেতরে, বাইরে ছোরার একখানা টুকরা, গুলির একখানা খোসাতেও হয় মামলা। ঊর্ধ্বে যাবজ্জীবন, নিচে ৭ বছরের কারাদণ্ড; যাবে কোথায় বাছাধন! আগ্নেয়াস্ত্রের টুকরা হলে ১০ বছরের কারাদণ্ডের নিচে কথাই নেই। যার তার হাতে অস্ত্র রাখা বিপদ বলেই বাছবিচারহীন এমন কঠোর সাজা! এমন বেহুদা কঠোর কাণ্ড নির্দয় ব্রিটিশের নয়। তাদের করা ছিল বড়জোর তিন বছর জেল কিংবা, শুধুই কিছু জরিমানা কিংবা, জেল-জরিমানা একসঙ্গেই (১৯ ধারার নয়টা দফার সবগুলোতেই)। অপরাধের ওজন বুঝে যে-কোনোটা দেওয়ার ছিল। রেখেছিল জামিনযোগ্য। সিআরপিসির তফসিলে এখনো তাই আছে। অস্ত্র আইনের বিচার ১৯৭৪-এ বিশেষ ক্ষমতা আইনের তফসিলে ঢুকে হয় অ-জামিনযোগ্য। পিস্তল, রিভলবার, রাইফেল ও শটগানে ১৯৩২-এ ব্রিটিশ আলাদা ১৯ অ ধারা ঢুকিয়ে সাজা বানায় যাবজ্জীবন পর্যন্ত দ্বীপান্তর কিংবা, ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, কিংবা শুধুই জরিমানা। শটগানের পরে ‘or other fire-arm’ ’ ঢুকিয়ে ফায়ারের দেশীয়গুলোকেও বাঁধা হয় এই ধারায় ১৯৮০-তে। ছোরা, গুলি এসবে সর্বনিম্ন ৭ বছর আর আগ্নেয়াস্ত্রে সর্বনিম্ন ১০ বছর কারাদণ্ডের কঠোর বিধান হয় ১৯৯০-এর ১৩ ডিসেম্বর। তখন সদ্য ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপতি এরশাদের ঘরে কিছু আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধার হয়েছিল। কঠোর করার আবছা একটা যোগসূত্র দেখা যাচ্ছে! স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে সাজা হলেও উচ্চ আদালতে আটকানো যায়নি তাকে। বেহুদা কঠোর সেই বিধানে এখন আটকায় সাধারণ লোকে।

বাছবিচারহীন কঠোর করে সাজা বাঁধলে করজোড়ে ডকে দাঁড়ানো নিরীহ গোছের আসামির সঙ্গে বিবেকে বাঁধা বিচারকও পড়ে বিপদে। একখানা জংধরা ছোরা বা গুলির জন্য ৭ বছর আর পিস্তলমতো জংধরা একখানা কিছুর জন্য ১০ বছর কারাদণ্ড দিতে বললে চাপটা লাগে এসে বুকে। আদালতে আসামি দুষে পুলিশের কারসাজি বলে, জব্দ তালিকার সাক্ষী নিজেরাই থাকে জব্দ হয়ে সবার কাছে। তাইতে কিছুটা রক্ষে!

কঠিন বিপদে পড়েছিলাম যশোরে। অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ হয়ে সবে গেছি। দেখি একখানা অস্ত্র মামলা সাক্ষীতে উঠে ঘুরছে বছর ধরে, আসামি আসে তো সাক্ষী আসেনি করে। সেদিন আসামি হাজির, সাক্ষী আসেনি। পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) সাহেবের টাইম পিটিশনে আসামির উকিল সাহেবের ঘোর আপত্তি। আসামি দূরের জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী, আদালতে এতদিন বেকার হাজির হয়ে হয়ে হয়রান। এবার হুজুর খালাস দেন। সর্বনাশ! দেখি, চার্জ ১৯ অ  ধারায়। আসন্ন নির্বাচনের কারণে লাইসেন্সধারীদের আগ্নেয়াস্ত্র জমা দেওয়ার জরুরি সরকারি আদেশ হলো। প্রকৌশলী সাহেব সরকারি কাজে ডুবে থেকে তারও যে একখানা লাইসেন্স করা বন্দুক জমা দেওয়ার আছে সে-কথা যান ভুলে। লাইসেন্স করা বন্দুক নিয়ে শেষ তারিখের দুদিন পর থানায় গিয়ে খেয়েছেন ধরা। এইটুকু পাপে ১০ বছর জেলের খাঁড়া! বললাম, সাক্ষী জেরা করে কী করবেন! জব্দ তালিকার সাক্ষীর ফাঁক তো নেই যে পার পাবেন! কবে শেষ তারিখ ছিল আর কবে গেছেন, সবই তো কাগজে লেখা। ‘ডক্যুমেন্টস ক্যান নট টেল এ লাই’, কাগজ মিথ্যে বলে না। তার চেয়ে দোষ স্বীকার করুন, কিছু জরিমানা করে ছেড়ে দিই। শুনে বিস্মিত কৌঁসুলি, প্রীত প্রকৌশলী! ন্যূনতম ১০ বছর জেলের জায়গায় শুধু জরিমানা! হুজুর সবই পারেন! পার তো পাই, আপিল হলে দেখা যাবে! প্রকৌশলী রাজি। দোষ স্বীকার লিখে নিয়ে ২১ ধারায় পাঁচশ টাকা জরিমানা করে বন্দুকটা তার কাছে ফিরিয়ে দিতে বলে বিচার শেষ করি। তৎক্ষণাৎ আদায় দিয়ে মুক্ত প্রকৌশলী।

বিচার করে দেখেছিলাম, তার লাইসেন্স করা বন্দুকের অপরাধটা ১৯ অ ধারায় তো নয়ই ১৯ ধারার শেষ দফাটাতেও পড়ে না। লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ বা বাতিলকৃত নয়, অবৈধ বন্দুকধারী নন তিনি। নির্ধারিত তারিখের মধ্যে জমা না দিয়ে দুদিন পরে যাওয়াটায় বদ মতলবও নেই। এটা বড়জোর লাইসেন্সের শর্তভঙ্গ, পড়ে ২১ ধারায়। সাজা, ছয় মাস পর্যন্ত জেল কিংবা, পাঁচশ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা, জেল-জরিমানা দুটোই। ভাগ্যিস, এভাবে ধারাটা করে গিয়েছিল ব্রিটিশ এবং অক্ষত ছিল তখনো (এখনো আছে)। নাহলে এতটুকু দোষে ১০ বছর জেলে দিলে তার অভিসন্তাপের সঙ্গে আমাকে পড়তে হতো অভিসম্পাতে। অপরাধের ওজনের মাপে সাজা দেওয়ার বিধান হলে বিচারও বাঁচে, বিচারকও বাঁচে। বিচারের বাণী শুধু নয়, বিচারকের প্রাণও কাঁদে।

লেখক প্রবন্ধকার ও আইনগ্রন্থকার, অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক
moyeedislam@yahoo.com