স্পিডবোটের হর্স বাড়িয়ে ২৫ মিনিটের নৌপথ ৯ মিনিটে পাড়ি!

যাত্রীদের লোভনীয় করতে স্পিডবোটের হর্স বাড়িয়ে ২৫ মিনেটের নৌপথ মাত্র ৮ থেকে ৯ মিনেটে পদ্মা পাড়ি দিচ্ছে। অনেক সময় জরুরি প্রয়োজনে যাত্রীরাই অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে দ্রুতগতির স্পিডবোটে পদ্মা পাড়ি দিতে চান। আর এই সুযোগে স্পিডবোটের মালিকরা ইঞ্জিনের হর্স বাড়িয়ে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কম সময়ে চেয়ে কম সময়ে পদ্মা পাড়ি দেয়।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এই স্পিডবোট অবৈধ হলেও কিছু অসাধু ব্যাক্তির কারণে বিআইডব্লিউটিএ প্রতি বছর স্পিডবোট ঘাট ইজারা দিয়ে থাকে আর সেই সুযোগে প্রতি বছরই দুই ঘাটে স্পিডবোটের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকে।

গত ১৫-২০ বছর আগে যখন স্পিডবোট নৌপথে চালু হয় তখন একটি স্পিডবোটের ইঞ্চিনের হর্স ছিল মাত্র ৪০ এরপর এলো ৭৫ হর্স পাওয়ার। বর্তমানে যে সকল স্পিডবোট চলছে তার বেশির ভাগ ১১৫ হর্স পাওয়ারের। আর কিছু সংখ্যক স্পিডবোটে রয়েছে ২০০ হর্স পাওয়ার যা ১ মিনিটে ১ কিলোমিটারে চেয়ে বেশি নৌপথ অতিক্রম করতে পারে।

যেহেতু পদ্মা নদীর মাত্র ৬.১৫ কিলোমিটার তাই খুব সহজে ২শত হর্স ইঞ্চিনের স্পিডবোটে ৮-৯ মিনিটে নৌপথ পাড়ি দিতে পারে।

তাছাড়া এই ২শত হর্স পাওয়ার ইঞ্চিন যে স্পিডবোট ব্যবহার করে তাদের স্পিডবোট অন্য বোট থেকে অনেক বড় এবং যাত্রীও তুলতে পারে ডাবল।

মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ও মাদারীপুরের বাংলাবাজার ও মাঝিকান্দি নৌরুটে পদ্মা নদীতে যাত্রী পারাপারে চলে প্রায় চার শতাধিক স্পিডবোট। এসব স্পিডবোটের কোনও নিবন্ধন নেই। চালকের নেই কোনও লাইসেন্স।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিটিএ) স্পিডবোট ঘাটের ইজারা প্রদান করলেও এখনও এসব স্পিডবোটের নিবন্ধন করেনি। এভাবে নিবন্ধিত না হয়েই বছরের পর বছর ধরে বিশাল পদ্মার বুক চিরে চলছে স্পিডবোট।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্পিডবোট চালক বলেন, আমি ২০১২ সাল থেকে স্পিডবোট চালাই। আমি প্রথম যখন স্পিডবোট চালাতাম তখন স্পিডবোটের হর্স পাওয়ার ছিল ৪০। তারপর এলো ৭৫ হর্স পাওয়ার। বর্তমানে যে সকল স্পিডবোট চলছে তার বেশির ভাগ ১১৫ হর্স পাওয়ারের। খুব কম সংখ্যক স্পিডবোটে রয়েছে ২০০ হর্স পাওয়ার। তবে এ ধরনের স্পিডবোট চালানোর জন্য খুব দক্ষ চালক প্রয়োজন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্পিডবোট চালক জানান, একটি ২০০ হর্স পাওয়ার গতি সম্পন্ন ইঞ্জিনচালিত। প্রতি ১ মিনিটে ১ কিলোমিটার এর থেকেও বেশি পথ অতিক্রম করে। ৮ থেকে ৯ মিনিটে ১৩ কি.মি পথ অতিক্রম করতে পারে। এ ধরনের দ্রুতগতি সম্পন্ন স্পিডবোট চালাতে যথেষ্ট প্রশিক্ষণ ও চালককে শারীরিক ও মানসিকভাবে ফিট থাকতে হবে। তাই মালিক পক্ষের উচিত দক্ষ চালক বাছাই করে তাদের দিয়ে এসব স্পিডবোট চালানো। তা না হলে যেকোন সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। আর এ রকম ঘটছে।

শিবচর উপজেলার নিয়ামতকান্দী গ্রামের বাসিন্দা শহিদুল মোল্লা বলেন, আমার ছোট ভাই শাহাদাত মোল্লা বাল্কহেড-স্পিডবোট দুর্ঘটনায় মারা গেছে। সে ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরছিল। আমি মনে করি; স্পিডবোট চালক অদক্ষ ও নেশাগ্রস্ত ছিল। আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই।

নৌ পুলিশের ওসি আব্দুর রাজ্জাক জানান, স্পিডবোট চালকরা যাত্রীদের আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য বলে ৮ মিনিটে পদ্মা পাড় করে দিবে বলে কিন্তু আসলেই সেটা না। পদ্মা পাড় হতে এখনো আগের মত সময় লাগে। তবে আমার জানা মতে বেশকিছু স্পিডবোট এখন ২০০ হর্স ইঞ্চিন ব্যবহার করে। স্পিড বোট কোনটাই বৈধ না। কিভাবে বিআইডব্লিউটিএ ইজারা দেয় সেটা আমার বোধগম্য না।

শিমুলিয়া বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী পরিচালক শাহাদাত হোসেন জানান, দুর্ঘটনার দিন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন অধিদপ্তর থেকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসেছিল তখন তারা জানিয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে প্রায় ২৫ ভাগ স্পিডবোটের নিবন্ধন করেছিল। তবে, আমাদের কাছে সেসবের কোনও নথি তথ্য নেই।

মাদারীপুর জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন জানান, প্রতিটি ঘাট ইজারা দিয়ে থাকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিটিএ) তবে আমরা চাচ্ছি আগামীতে ঘাটসহ স্পিডবোট নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে। তবে আমার জানামতে কোনো স্পিডবোটের কোনো অনুমোদন নেই নৌপথে চালানোর।

উল্লেখ্য, মুন্সিগঞ্জের শিমুলিয়া থেকে সোমবার সকাল পৌনে ৭টায় ৩১ জন যাত্রী নিয়ে স্পিডবোটটি ছেড়ে আসে।

এ সময় মাদারীপুর কাঁঠালবাড়ী বাংলাবাজার পুরোনো ঘাটে থেমে থাকা বালুবোঝাই একটি বাল্কহেডে ধাক্কা দিয়ে ডুবে যায় স্পিডবোটটি।

এতে তিন শিশু ও দুই নারীসহ ২৬ জনের মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় মাদারীপুর জেলা প্রশাসন স্থানীয় সরকার উপ-পরিচালকে মো. আজাহারুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে ৬ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে এবং আগামী ৩দিনের মধ্যে রিপোর্ট দেয়ার জন্য বলা হয়েছে।