সেদিন ঢাকার একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত ভারতে করোনায় মৃত এক ব্যক্তির মরদেহ কুকুরে খাওয়ার বীভৎস ছবি দেখে ভীষণ মর্মাহত হয়েছি। ছবিটি দিল্লির একটি শ্মশানে তোলা। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, মরদেহটি লাশ বহন করার একটি ব্যাগের ভেতর রাখা, একটি কুকুর ব্যাগের এক প্রান্তে মাথা ঢুকিয়ে মরদেহটি ছিঁড়ে খাচ্ছে। এ দৃশ্য দেখে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় বহুল প্রচারিত একটি ছবির কথা মনে পড়ে গেল। ওই ছবিটি ছিল আরও বীভৎস ও মর্মান্তিক। একটা নির্জন বধ্যভূমিতে পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর হাতে নিহত এক হতভাগ্য বাঙালির গলিত লাশ একটি কুকুর ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সেই পটভূমি ছিল ভিন্ন। বর্বর বাহিনী যখন বাঙালিদের হত্যা করে বধ্যভূমিতে ফেলে রেখে চলে যেত তখন লাশ সৎকারের জন্য কোনো মানুষ খুঁজে পাওয়া যেত না। কারণ অন্য কিছু নয়; পাকিস্তানি জান্তাদের ভয়ে কেউ লাশের কাছে যাওয়ার সাহসও পেত না। কুকুরের গলিত লাশ ছিঁড়ে খাওয়ার সেই দৃশ্যের ছবি তখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচারিত হলে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। দিল্লির শ্মশানে কুকুরের লাশ ছিঁড়ে খাওয়ার ছবিটিও সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এ দৃশ্য যেন করোনার থাবায় দিল্লির বিপর্যস্ত চেহারাকেই তুলে ধরেছে।
দিন যতই যাচ্ছে ভারতের করোনা পরিস্থিতি যেন ততই ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। দেশটিতে বর্তমানে দৈনিক মৃত্যুর গড় সংখ্যা সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি ছাড়িয়ে গেছে। দিনপ্রতি সংক্রমণের হারও পাল্লা দিয়ে ৪ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। শ্মশানেও জায়গা হচ্ছে না মৃতদেহ সৎকারের। দেখা গেছে, শহরের শ্মশানের বাইরে রাস্তায় টোকেন নিয়ে মরদেহের দীর্ঘ লাইন। এ কারণে দিল্লি প্রশাসন শহরের পার্ক ও গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গাতেও লাশ পোড়ানোর অনুমতি দিতে বাধ্য হয়েছে। এই লেখাটি লেখার সময় পর্যন্ত ভারতে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ২ কোটি ১৩ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। লেখাটি প্রকাশ হতে হতে এই সংখ্যা হয়তো আরও বেড়ে যাবে। দৈনিক সংক্রমণে বিশ্বের সব দেশের রেকর্ড ছাড়িয়ে গত ২ মে আক্রান্তের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১ হাজার ৯৯৩ জনে। এ বছর মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে ভারতে করোনার দ্বিতীয় থাবা শুরুর পর প্রথম ১ মাসে ৪০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। এই মৃত্যুর হার এতই দ্রুত বেড়েছ যে তারপরের মাত্র ২৩ দিনের মধ্যেই মারা গেছে আরও ৫১ হাজার। করোনাভাইরাসের এই থাবায় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ ভারত যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। চারদিকেই হাহাকার। হাসপাতালে ঠাঁই নেই। মরদেহের ঠাঁইও হচ্ছে না মর্গেও। অক্সিজেনের ভয়াবহ সংকট। লাশ বহনের স্ট্রেচারের অভাব, লাশ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স থেকে ছিটকে রাস্তায় পড়ছে মরদেহ। সব মিলিয়ে এক মহামানবিক বিপর্যয় মোকাবিলা করছে ভারত।
ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মতো পশ্চিমবঙ্গেও উদ্বেগ বেড়েছে। গত ২ মে এ রাজ্যে একদিনে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৫০১ জন, গত ৪ মে এ সংখ্যা বেড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ১০২ জনে। যা পশ্চিমবঙ্গে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড। বাংলাদেশি হিসেবে আমাদের আশঙ্কা সেখানেই। সীমান্ত লাগোয়া দেশ হিসেবে ভারতীয় ধরনের এই করোনাভাইরাস বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে শতভাগ। সরকার যদিও ১৪ দিনের জন্য ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। তবে এই ঘোষণাই যথেষ্ট নয়। কারণ সরকারের এই নির্দেশ কড়াকড়িভাবে প্রয়োগ করা না গেলে এর কোনো ফল পাওয়া যাবে না। পণ্য পরিবহন ছাড়া সাধারণ মানুষের সীমানা অতিক্রম নিষিদ্ধ হলেও বিশেষ ব্যবস্থায় আটকে পড়া নাগরিকদের দেশে ফিরে আসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কিন্তু খবরের কাগজে যে সংবাদ দেখি তাতে সরকার নির্দেশিত ব্যবস্থা যথাযথভাবে পালন হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। সেদিন একটি খবরের কাগজে দেখেছি, এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে, কলকাতার বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশন বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য মোট ১ হাজার ২৯৬ জন আটকেপড়া বাংলাদেশিকে ছাড়পত্র দিয়েছে। এর মধ্যে ১৬ জনই করোনা পজিটিভ ছিল। অথচ এই মানুষগুলো করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট নিয়েই ভারতে গিয়েছিল। এসব মানুষ যে ভারতীয় ‘ট্রিপল মিউট্যান্ট করোনা ভ্যারিয়েন্ট’ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে সে আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এটা ঠিক, করোনা আক্রান্ত এই ১৬ জন মানুষ বৈধভাবে স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলেই খবর হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, অবৈধভাবে কতজন যে প্রতিদিন সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে সে হিসাব রাখে কে? আরেক খবরে দেখলাম, হিলি স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২০০টি ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এভাবে প্রতিটি ট্রাকের চালক, সহকারীসহ সাড়ে তিন থেকে চার শতাধিক ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। কিন্তু দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রবেশকালে চেক পয়েন্টে এই লোকদের যথাযথভাবে স্বাস্থ্য নিয়মবিধি অনুযায়ী পরীক্ষা করা হলেও এসব ট্রাক যখন পণ্য আনলোড করার জন্য বন্দর এলাকায় প্রবেশ করে তখন ট্রাকের চালকসহ অন্যরা মাস্ক খুলে বন্দরে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এসব ভারতীয় গাড়ির চালক ও শ্রমিকদের মাধ্যমে বাংলাদেশিরা যে করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে না সে নিশ্চয়তা দেবে কে? এটি শুধু হিলি স্থলবন্দরের চিত্র নয়। আমার বিশ্বাস, বেনাপোল, ভোমড়া, বুড়িমারী ও সোনা মসজিদসহ বাংলাদেশের সব স্থলবন্দরের চিত্র একই।
ভারতে ডাবল মিউট্যান্টের ভয়াবহতা কেটে যেতে না যেতেই ট্রিপল ভ্যারিয়েন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এই ভ্যারিয়েন্ট দিল্লি, মহারাষ্ট্র, ছত্তিশগড় ও পশ্চিমবঙ্গে ইতিমধ্যেই শনাক্ত হয়েছে। কভিড-১৯ ভাইরাসের তিনটি আলাদা স্ট্রেইন মিলে এই নতুন ভ্যারিয়েন্ট তৈরি হয়েছে। এই ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ ক্ষমতা তিনগুণ বেশি। আক্রান্ত ব্যক্তি একাই ৪০৬ জনের শরীরে ভাইরাস ছড়াতে পারে। নতুন এই ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শারীরিক অবস্থারও খুব দ্রুত অবনতি ঘটে। ভারতের সীমান্তবর্তী দেশ হিসেবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় এই ট্রিপল মিউট্যান্ট ভ্যারিয়েন্ট দ্বারা বাংলাদেশের মানুষ আক্রান্ত হবেই। এই আশঙ্কা যে অমূলক নয় সেটা নিশ্চিত করেছে সরকারের স্বাস্থ্য দপ্তরই। আইইডিসিআর ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে, বাংলাদেশে করোনার ভারতীয় নতুন ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এ কথা সত্য, বাংলাদেশের মানুষ খুব বেশি স্বাস্থ্য সচেতন নয়। প্রথাগতভাবেই আমরা আঞ্চলিক কিছু বদ অভ্যাসে দুষ্ট। সমাজের একেবারে উচ্চস্তর থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত কিছু মানুষের ভেতর এই অভ্যাস দেখা যায়; তা হলো ‘নিয়ম ভাঙার বদ অভ্যাস’। সরকার সার্বিক বিবেচনায় যত কড়া নিয়মই বেঁধে দিক না কেন, সেই নিয়ম ভঙ্গ করাই যেন তাদের কাজ। রাস্তাঘাট, গণপরিবহন, দোকানপাট ও মার্কেটে মানুষের হুমড়ি খাওয়ার দৃশ্য দেখলেই তা বোঝা যায়। এ অবস্থায় একবার যদি ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের বিস্ফোরণ ঘটে, তাহলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে যে মারাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে তা কল্পনাও করা যায় না। প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কি সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত? ‘পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি আছে’ এবং ‘জরুরি প্রয়োজনের জন্য অক্সিজেনের পর্যাপ্ত মজুদ আছে’ বলে আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও তার কর্মকর্তারা যতই বলুন না কেন সাধারণ মানুষ তা সহজে গ্রহণ করছে না। কারণ, করোনা প্রাদুর্ভাবের পর থেকে স্বাস্থ্য খাতের সীমাহীন দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও নিবিড় স্বাস্থ্যসেবা দিতে যে ব্যর্থতা দেখা গেছে তাতে দেশের মানুষের বিশ্বাস নড়বড়ে হয়ে গেছে। এপ্রিলের গোড়াতেই করোনার দ্বিতীয় থাবায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকাসহ অন্যান্য জেলা হাসপাতালগুলোতে বেডের স্বল্পতার কারণে চিকিৎসা না পেয়ে করোনা আক্রান্ত রোগী ও তাদের আত্মীয় পরিজনদের যে আহাজারি জাতি দেখেছে তাতে, তাদের কথা ও কাজের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়। আমাদের এই দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আশ্বাসবাণীর ওপর মানুষ এখন আর ভরসা করতে পারছে না। একটি মাত্র উদাহরণ দিলেই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। গত বছর জুনে সারা দেশে ৭৯টি হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট বসানোর পরিকল্পনা নেয় সরকার। প্রথমে ২৬টি প্ল্যান্ট বসানোর কাজ একটি কোম্পানিকে দিলেও কর্র্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তহীনতায় বাকি ৫৩টি হাসপাতালের কার্যাদেশ ঝুলে থাকে। বারংবার তাগাদা দেওয়ার পর গত অক্টোবরে তড়িঘড়ি করে কার্যাদেশ দেয়, তবে হাসপাতালের তালিকা নির্ধারণ করতে না পারায় কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত গত নভেম্বরে ২৩টি এবং দীর্ঘ বিরতির পর করোনার দ্বিতীয় ঢেউ তীব্রভাবে আছড়ে পড়লে এ বছরের মার্চের ৩১ তারিখে বাকি ৩০টি হাসপাতালের তালিকা চূড়ান্ত করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অতঃপর এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ৭৯টির মধ্যে মাত্র ৩৮টি হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহ শুরু হয়।
পাশাপাশি করোনা টিকা নিয়ে সৃষ্ট সমস্যারও অবসান হওয়া উচিত। দুঃখজনক হলো, ভারতের প্রতিশ্রুত টিকা না পাওয়ায় বর্তমানে ১৪ লাখ মানুষকে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার মতো টিকা সরকারের কাছে মজুদ নেই। খুব শিগগিরই টিকা আমদানি করে এ সমস্যার সমাধান করা যাবে কি না তাও বলা যাচ্ছে না। সমাজের অনেকেই মনে করে, টিকা আমদানি নিয়ে একটি মহলের স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে এই জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। তবে সরকার টিকাপ্রাপ্তির সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এবার সবার প্রত্যাশা, আগামী দিনে টিকা আমদানি কিংবা দেশে টিকা উৎপাদনে বিশেষ কোনো মহলকে সুযোগ দিতে গিয়ে এদেশের গরিব মানুষকে যেন আর জিম্মি হতে না হয়, সেদিকে সরকার বিশেষভাবে লক্ষ রাখবে।