প্রশ্ন : বয়স মাত্র ১৭। এরমধ্যেই বিশ্বের সেরা সেরা দলকে পেছনে ফেলে বিশ্বকাপে রুপা জিতেছেন। কেমন লাগছে?
দিয়া সিদ্দিকী : ফাইনালে হেরে যাওয়ার কষ্টটা আছেই। তবে নতুন হিসেবে বিশ্বমঞ্চে রুপা জিততে পেরে অনেক ভালো লাগছে। অথচ জানেন একটা সময় মনে হয়েছিল আমাকে দিয়ে কিছুই হবে না।
প্রশ্ন : আপনার সেই গল্পটাই শুনতে চাই। মানে আরচার হয়ে বেড়ে ওঠার গল্প।
দিয়া : ২০১৭ সালের কথা। নীলফামারী গভ. গার্লস স্কুলে সেভেনে পড়ি। ভালো রানিং করতাম। হাইটও ভালো ছিল। তখন আরচারির ট্যালেন্ট হান্ট হয়েছিল। ফিজিক্যাল স্যার (খাইরুল ইসলাম) ট্রায়ালে অংশ নিতে বললেন। তখন আমি আরচারি খেলাই বুঝি না। ট্রায়াল নিচ্ছিলেন শরীফ স্যার। কিন্তু আমাকে কেন যেন তিনি বাদ দিলেন। মনটা খারাপ হলো। শরীফ স্যারের কাছে গিয়ে বললাম, আপনি তো আমাকে না দেখেই বাদ দিয়ে দিলেন! স্যার আমাকে একটা সুযোগ দিলেন। আমি টিকে গেলাম। আমরা তিনজন মেয়ে ভালো করেছিলাম। এরপর আমাদের টঙ্গীতে নিয়ে আসা হয়। ২০১৭ সালের শেষ দিকে জাতীয় দলের কোচ জিয়া স্যার (জিয়াউর রহমান) আমাকে বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার জন্য বলেন। ৭ দিনের ক্যাম্প করে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তির সুযোগ পাই কম্পাউন্ডে। ২০১৮তে ৯ম জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে বিকেএসপির হয়ে খেলে কম্পাউন্ড ইভেন্টে ব্রোঞ্জ পাই। এরপর যুব গেমসে জেলার হয়ে খেলার সুযোগ পেয়ে রিকার্ভে নাম লেখাই। কারণ রিকার্ভই আমার প্রিয়। গেমসে দলগত ইভেন্টে রুপা জয়ের পর জিয়া স্যার, বিকেএসপির নূর-ই-আলম স্যার আমাকে রিকার্ভ করতে বললেন। সেই থেকে এখন পর্যন্ত রিকার্ভ করছি।
প্রশ্ন : ২০১৯ সালে আইএসএসএফ আন্তর্জাতিক সলিডারিটি আরচারিতে আপনি তো সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন?
দিয়া : ওই আসরে আমি মেয়েদের এককের ফাইনালে ইরানের প্রতিযোগীকে (সোজামের সিভা) হারিয়ে দিই। এছাড়া মিক্সড টিম ইভেন্টে রোমান ভাইয়ার সঙ্গে ব্রোঞ্জ জিতেছিলাম। সেই সাফল্য আমাকে বড় আরচার হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু এরপরই কী যেন হয়ে গেল। পারফরম্যান্স খুব খারাপ হতে লাগল।
প্রশ্ন : এসএ গেমসে ইতিহাসের সেরা পারফরম্যান্স করেছে বাংলাদেশের আরচাররা। অথচ সেই দলে আপনি ছিলেন নাৃ
দিয়া : সেটা অনেক বড় কষ্ট। আইএসএসএফ সলিডারিটি চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জয়ের পর সবাই খুব বাহবা দিয়েছিল। অনেক আলোচনাও হয়েছিল আমাকে নিয়ে। এরপর থাইল্যান্ডে এশিয়া কাপে খেলতে যাই। সেখানে রোমান ভাইয়ার সঙ্গে মিক্সড টিম ইভেন্টে চতুর্থ হই। তখন পর্যন্ত ভালোই ছিল। কিন্তু এরপরই ছন্দপতন ঘটে। জাতীয় দলের ক্যাম্পে ট্রায়ালগুলোতে টার্গেট পূরণ করতে ব্যর্থ হই। যে কারণে এসএ গেমসের দল থেকে বাদ পড়ি। ওই সময় অনেকেই অনেক কথা বলত আমি নাকি অনেক বেশি অহংকারী হয়ে গেছি, চিন্তা-ভাবনা অন্য দিকে চলে গেছে। অথচ আমি কখনই এমন নই। খুব ভেঙে পড়েছিলাম এসব কথা শুনে। মনে হচ্ছিল আমাকে দিয়ে আর কিছু হবে না। আত্মবিশ্বাস তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। তবে আমার কোচ মার্টিন (ফ্রেডরিখ), জিয়া স্যার, রোমান ভাই, মিলন ভাই (ইমদাদুল হক মিলন), আমাকে অনেক সাহস দিতেন। আমিও নিজেকে বোঝাতে শুরু করলাম। আমি কখনই অহংকার করিনি, সবসময় মাটির সঙ্গে মিশে থাকতে চেয়েছি। কারণ আমি মাটির মানুষ। এসএ গেমসের দলে সুযোগ না পাওয়ার পর খুব জেদ চেপে গিয়েছিল। ট্রায়ালে পাঁচ নম্বর হয়েছিলাম। আসলে একটা ধাক্কার পর বলে না মানুষের অনেক পরিবর্তন ঘটে। আমার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।
প্রশ্ন : আত্মবিশ্বাসটা ফিরে পেলেন কীভাবে?
দিয়া : ২০১৯ সালে যুব বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে গিয়েছিলাম স্পেনে। ওখানে খুবই খারাপ পারফরম্যান্স হয়েছিল। তীর নিয়মিত বাইরে মারতে শুরু করি। খুব আপসেট হয়ে পড়েছিলাম। ওখান থেকেই আমার খারাপ করার শুরু। ফল স্বরূপ এসএ গেমসের দল থেকে বাদ পড়ি। এসএ গেমসের আগেই অবশ্য ক্যাম্প থেকে ছুটি নিই এসএসসি পরীক্ষার জন্য। এসএসসিতে অল্পের জন্য জিপিএ ফাইভ পাইনি (৪.৮৯)। লকডাউনের কারণে চারমাসের বিরতির পর গত বছর জুলাইয়ে আবার ক্যাম্প শুরু হলে সব কিছু নতুনভাবে শুরু করি। কোচ মার্টিন আমাকে কখনই হাল ছাড়তে দেননি। জিয়া স্যারও খুব সাহস দিতেন। তিনিই কোচকে বলে ফিঙ্গার ট্যাপ চেঞ্জ করে দেন। তখন থেকেই ধীরে ধীরে ভয়টা কাটতে থাকে। চাপমুক্ত হয়ে খেলতে শুরু করি।
প্রশ্ন : সুইজারল্যান্ডে একক ও দলগত ইভেন্টে সেভাবে ভালো হয়নি। কিন্তু মিক্সড টিমে সেমিফাইনাল পর্যন্ত বড় বড় দলকে হারিয়ে দিলেন।
দিয়া : ইরানকে হারিয়ে শুরু করি। দ্বিতীয় ম্যাচ ছিল শীর্ষ র্যাংকিং জার্মানির সঙ্গে। ওদেরও যখন হারিয়ে দিলাম তখন আত্মবিশ্বাস চলে এসেছিল। পরের ম্যাচে অবশ্য স্পেনের সঙ্গে ম্যাচে অনেক লড়াই হয়েছিল। আর সেমিফাইনালে কানাডাকে সহজেই হারাই।
প্রশ্ন : ফাইনালে পারলেন না কেন?
দিয়া : আগের দু’দিন অনুশীলন করেছিলাম কম বাতাসে। কিন্তু সেদিন অনেক বাতাস ছিল। সঙ্গে ছিল প্রচ- শীত। প্রতিকূল আবহাওয়া, যে রকম পরিবেশে খেলে আমরা অভ্যস্থ না। তার ওপর আমার তো এমনিতেই অভিজ্ঞতা কম। তারপরও চেষ্টা করেছি। যা হয়েছে তাতে আল্লাহর কাছে লাখো-কোটি শুকরিয়া।
প্রশ্ন : জুনে স্টেজ-৩ এ অলিম্পিকের কোটা পাওয়ার সুযোগ আছে। নিশ্চয় নিজেকে অলিম্পিকে দেখতে চান?
দিয়া : প্যারিসে মিক্সড টিম ইভেন্টে কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে পারলেই আশা করি সরাসরি অলিম্পিকে খেলতে পারব। এছাড়া অন্য ইভেন্টগুলোতেও সমান সুযোগ থাকবে। প্রত্যেকেরই স্বপ্ন থাকে অলিম্পিকে যাওয়ার। আমারও আছে। তবে এর জন্য আরও অনেক পরিশ্রম করতে হবে।
প্রশ্ন : বাবা-মা তো অনেক খুশি আপনার পারফরম্যান্সে?
দিয়া : সেটা তো অবশ্যই। তবে দেশে আসার পর এখনো তাদের সঙ্গে কথা হয়নি। তারা নীলফামারীতে আছেন। এখন তো কোয়ারেন্টাইনে আছি। দেখা করাও সম্ভব না। আসলে তাদের উৎসাহেই আরচার হিসেবে গড়ে উঠতে পারছি। স্বপ্ন দেখছি আরও বড় মঞ্চে সফল হওয়ার।