এনআইডি সেবা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গেলে ‘জনগণের ভোগান্তি বাড়বে’

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন সেবা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে গেলে জনগণের ভোগান্তি বাড়বে বলে আশংকা প্রকাশ করে দেশের বিশিষ্টজনরা এ সেবা নির্বচন কমিশনের (ইসি) কাছে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।

রবিবার সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন আয়োজিত ‘সরকারকর্তৃক জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন কার্যক্রম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করার উদ্যোগ ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা’ শীর্ষক এক নাগরিক সংলাপে বিশিষ্টজনরা এমন আশংকা করেন।

ভার্চ্যুয়ালি নাগরিক সংলাপে অংশ নিয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘২০০৬ সালে যে রাজনৈতিক মুভমেন্ট ছিল। তখনকার সময়ে অনেকগুলো চাহিদার মধ্যে একটি ছিল নির্ভুল ভোটার তালিকা করা। সেই সময় এ কাজ শুরু করার জন্য অনেক লজিস্টিকের প্রয়োজন ছিল। তখন কিন্তু কাউকে পাওয়া যায়নি। প্রথম দিকে ইউএনডিপি আর্মিকে দিয়ে এ কাজ করানোর বিপক্ষে থাকলেও আমরা তাদের বুঝাই যে, এই কাজ আর্মিদের ছাড়া করা সম্ভব নয়। তারপর তারা রাজি হয়।’

সাবেক এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘কোনো মন্ত্রণালয় থেকে একজন প্রজেক্ট ডিরেক্টর খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে আমরা অর্গানোগ্রাম তৈরি করলাম। তখন কোনো সরকার এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় একবার আলোচনা হয়েছিল। অনেক দেশে আইডি কার্ড একটি সংস্থা নয়, বিভিন্নি সংস্থার মাধ্যমে দেওয়া হয়। যেমন আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আধার কার্ড, রেশন কার্ড দেওয়া হয়। আধার কার্ড কিন্তু সব নয়। আধার কার্ড থাকলে ভোটাধিকারসহ অন্যান্য কিছু সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু এ আধার কার্ড সবকিছু নয়।’

নির্বাচন কমিশনের অধীনে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন সেবা থাকার পক্ষে মত দিয়ে তিনি বলেন, সরকার এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যদি করতে চায়, তাহলে আলাদা অর্গানোগ্রাম তৈরি করে এটি করতে পারে। নির্বাচন কমিশনকে না জানিয়ে এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সম্মান খর্ব করা হয়েছে।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেন, ‘আমরা গণতন্ত্র বলি, আইনের শাসন বলি, এই সরকার কোনোকিছুর তোয়াক্কা করে না। সরকার নির্বাচন কমিশনকে তার অধিনস্থ একটি অনুবিভাগ মনে করে। ২০১৪ সালে দেখলাম, ১৫৩ জন এমপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী, ২০১৮ সালে দেখলাম আগের রাতে ভোট হয়ে গেছে। আগামী নির্বাচন নতুন তরিকার নির্বাচন হবে।

সরকার আমাদের ‘প্রজা ভাবে’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সরকার কোনো কিছুর ধার ধারে না। আগামী নির্বাচনের জন্য নতুন কোনো তরিকার কথা ভাবছে। আগের নির্বাচনগুলোতে সরকার খুব বেশি সময় পায়নি। এবার অনেক সময় পাবে। ’

এনআইডি সেবা ইসির অধীনে থাকার পক্ষে মত দিয়ে তিনি বলেন, ‘ইসির কাছে থাকলে কী অসুবিধা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গেলে কী সুবিধা, সরকার এসব বিষয়ে জানাতে পারতো। ’

সংলাপে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা  রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এই সেবা গেলে জনগণের ভোগান্তি আরও বাড়বে। কারণ আমরা দেখেছি পুলিশি ভেরিফিকেশনের কারণে সব ধরনের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পান না’।  

সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, ‘গত সাড়ে তিন থেকে চার বছরে এই নির্বাচন কমিশন কী করেছে। তার জন্য তাদের আগে জবাবদিহিতায় আনা প্রয়োজন। ’

ড. আসিফ নজরুল বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের বুঝা উচিত যাদের তারা ক্ষমতায় এনেছেন তাদের কাছে এই ইসির মর্যাদা কতটুকু। এ নির্বাচন কমিশনের ওপর আমাদের আস্থা নেই। তবে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন সেবা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে গেলে এটা আরো ভয়ংকর হবে। কারণ ইসির লোকেরা কাউকে ভয় দেখায় না, ভিন্ন মতের কাউকে গ্রেপ্তার করে না ও হয়রানি করে না। ’

সুজন এর নির্বাহী কমিটির সদস্য বিচারপতি এম এ মতিন-এর সভাপতিত্বে সভায় সঞ্চলনা করেন সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার।