বাজেটে শিক্ষা খাত : কিছু পর্যবেক্ষণ ও প্রস্তাবনা

প্রায় সব খাতের লোকজনের মজবুত আকাক্সক্ষা হচ্ছে, বাজেটে তাদের চাওয়া-চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হোক এবং রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হোক। এ-চাওয়াটা অন্যায় নয় কিন্তু সময় ও পরিস্থিতির চাহিদাকে হিসেবে নিয়ে সামগ্রিক বিবেচনায় কোনটা অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত কিংবা কোনটাকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে বাজেট প্রণয়ন করা উচিত সেটা অনেকগুলো মাপকাঠির ওপর ভর করে। এ-মাপকাঠিরও আবার নানান আপেক্ষিকতার সূত্র আছে। এভাবে নানান কিসিমের বিচার-বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রীকে যেমন একদিকে অনেক কিছু কাটছাঁট করতে হয়, তেমনি অন্যদিকে সব খাতের মধ্যে একটা জুতসই সমন্বয় করে বাজেট প্রণয়ন করতে হয়। কিন্তু বাজেট পেশ করার পরপরই দেখা যায়, প্রায় সব ক্ষেত্র থেকেই এক ধরনের হা-হুতাশ উৎপাদিত হয়। সব খাতের লোকজনের মধ্যে প্রত্যাশা অনুযায়ী বাজেট না-পাওয়ার বেদনা উচ্চারিত হয় এবং চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানানো হয়। যেহেতু বাজেট পেশ এবং পাসের মধ্যে খানিকটা পিরিয়ডিক-দূরত্ব থাকে, আর এ সময়ের মধ্যে বাজেট নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার সুযোগ আছে, খাতওয়ারি বাজেটের বরাদ্দ বাড়ানো-কমানোর সুযোগ আছে, সেহেতু সব খাতের লোকজনই এ-সুযোগটাকে কাজে লাগাতে চায় এবং চাইবে, সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, সব খাতেই বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জোরদার হয় বটে কিন্তু কোনো খাতেই বরাদ্দ কমানোর কোনো দাবি কোনো সময় আসে না। আমাদের মনে রাখা জরুরি যে, বাজেট কেবলই কিছু সংখ্যার যোগ-বিয়োগ কিংবা গুণ-ভাগ নয়, বাজেট দেশের ১৭/১৮ কোটি মানুষের এক বছরের জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তা এবং জীবন-যাপনের পরিকল্পনা, বাস্তবায়নের রূপরেখা প্রণয়ন এবং রূপরেখা অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচলানার একটা গাইডলাইন। ফলে, বাজেটের গঠনমূলক আলোচনা প্রকারান্তরে মানুষের জীবন-জীবিকার অধিকতর নিশ্চয়তা ও জীবন-যাপনকে অধিকতর উন্নততর করার জন্য রাষ্ট্র পরিচালনায় ইতিবাচক অংশ নেওয়ার শামিল। সেই জায়গা থেকেই বাজেট নিয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ এবং কিছু প্রস্তাবনা এ-নিবন্ধে আলোকপাত করা হয়েছে। যেহেতু শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট খাতের সঙ্গে আমার পেশা সম্পৃক্ত, সেহেতু বাজেটে শিক্ষা খাতকে কীভাবে এবং কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটা নিয়ে বর্তমান বাস্তবতার আলোকে আমার নিজস্ব কিছু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এখানে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি। লেখা বাহুল্য, ‘বাজেটে শিক্ষা খাতকে একেবারেই গুরুত্ব দেওয়া হয়নি এবং একেবারেই অপর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে’ জাতীয় হোলসেল ন্যারেটিভ দিয়ে আমি কখনই বাজেট এবং শিক্ষা খাতকে দেখি না। কেননা, সবকিছুরই ভালোমন্দ দুটোই আছে। বরঞ্চ কীভাবে এ বরাদ্দকে যথাযথ পরিকল্পনা, এবং সে পরিকল্পনা অনুযায়ী যথাযথ বাস্তবায়ন করা যায়, সেটাও সমান মনোযোগের দাবিদার।

২০২১-২০২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত মোট বাজেট হচ্ছে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। যার মধ্যে শিক্ষা খাতের জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ৭১ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা। তার অর্থ হচ্ছে যে, এবারের বাজেটের ১১ দশমিক ৯১ শতাংশ বরাদ্দ করা হয়েছে শিক্ষা খাতে যা জিডিপি ২ দশমিক ০৮ ভাগ। আপাত দৃষ্টিতে টাকার অঙ্ক শিক্ষা খাতে বাজেটের পরিমাণ বেড়েছে কেননা গত অর্থবছরের (২০২০-২০২১) সংশোধিত বাজেটে শিক্ষা খাতের জন্য বরাদ্দ ছিল ৬৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। সে তুলনায় এবার প্রস্তাবিত বাজেটে টাকা অঙ্কে প্রায় ৫ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা বেড়েছে। কিন্তু বাজেটের আকার বিবেচনায় গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে শিক্ষা খাতের জন্য বরাদ্দ ছিল ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ যা ছিল জিডিপির ২ দশমিক ০৯ শতাংশ। অর্থাৎ বাজেটের আকার বিবেচনায় টাকার অঙ্কের পাশাপাশি শতাংশ বিবেচনায়ও এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে শূন্য দশমিক ২২ শতাংশ কিন্তু জিডিপিতে কমেছে শূন্য দশমিক ০১ শতাংশ। যেহেতু বাজেটের আকার বেড়েছে অর্থাৎ গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা সেখানে এবার প্রস্তাবিত বাজেটের পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা অর্থাৎ প্রায় প্রায় ৩৫ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা যেখানে বেড়েছে সেখানে শিক্ষা খাতের জিডিপি অংশ কমেছে। ফলে, স্বাভাবিক কারণেই শিক্ষা খাতের লোকজনরা খানিকটা আশাহত হয়েছেন এবং সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে, যেখানে গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট থেকে এ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটের টাকা অঙ্ক বেড়েছে মাত্র ৩৫ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা আর সেখান থেকে শিক্ষা খাতে গত বছরের চেয়ে বাড়তি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা। সুতরাং জিডিপির হিসাবে খানিকটা আশাহত হওয়ার বেদনা থাকলেও টাকার হিসাবে এবং শতাংশের বিবেচনায় একেবারে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। তবে, একথা অনস্বীকার্য যে, শিক্ষাকে যে মাত্রায় গুরুত্ব দেওয়া জরুরি আমরা কখনই সেভাবে শিক্ষাকে গুরুত্ব দিই না। পৃথিবীর কোনো দেশে জিডিপির ৪ শতাংশের নিচে শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ হয় না। ইউনেস্কোর বিবেচনায় কোনো দেশের শিক্ষার সুন্দর এবং সুষ্ঠু বিকাশের জন্য অর্থবছরের মোট বাজেটের কমপক্ষে ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ  দেওয়া উচিত। ইউনেস্কোর পরামর্শ হচ্ছে জিডিপির কমপক্ষে ৪ থেকে ৬ শতাংশ শিক্ষার ক্ষেত্রে বরাদ্দ হওয়া উচিত। কিন্তু গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে সেটা প্রায় ৩ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও এবারে শূন্য দশমিক ২২ শতাংশ কমে সেটা ২ দশমিক ০৮ শতাংশ। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, জিডিপি, মাথাপিছু মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, গড়আয়ু, সামাজিক নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ, এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির বিবেচনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নেপাল এবং ভুটানেরও পরে। বাংলাদেশের বাজেটের আকার যে প্রতি বছর বাড়ছে, সেটা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির সূচক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে বরাদ্দ বৃদ্ধির রেখাটা সমাজের অন্যান্য খাতের তুলনায় খুব একটা ঊর্ধ্বমুখী নয়। শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে আমাদের মনোনিবেশ করতে হবে। পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ না থাকলে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা যথাযথভাবে না-হলে আমরা হয়তো অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে বিস্তর নগরায়ণ এবং শিল্পায়ন করতে পারব কিন্তু বিশ্ব জ্ঞানসূচকে ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ব। আর যে উন্নয়নের পেছনে জ্ঞানের ভিত্তি থাকে না, সে উন্নয়ন কখনই টেকসই ও মজবুত উন্নয়ন হয় না। মানবসম্পদের যথাযথ উন্নয়ন ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন কখনই টেকসই হয় না। তাই, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণের দিকেই শেষ পর্যন্ত মনোনিবেশ করতে হবে এবং জ্ঞানসূচকে বাংলাদেশের অবস্থানকে সম্মানজনক জায়গা নিতে হলে বাজেটে শিক্ষা খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ২০২০ সালের গ্লোবাল জ্ঞানসূচকে ১৩৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১২তম। এবং আরও দুঃখজনক হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে (সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার, ১২/১২/২০২০)। তাই, একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণে শিক্ষার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা খাতের বাজেট আরও বাড়ানো জরুরি।  

এখানে করোনাকালের শিক্ষা খাতের দুরবস্থার কথা না-বললেই নয়। ২০২০ সালের মার্চের ১৭ তারিখ থেকে বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। প্রায় ১৫ মাস ধরে বন্ধ থাকার কারণে সনাতন পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রমের বিকল্প হিসেবে অনলাইনের শিক্ষা কার্যক্রম জারি রাখার আপ্রাণ চেষ্টা থাকলেও সেটা যে শেষ পর্যন্ত তেমন কোনো মৌলিক, গুণগত এবং ইতিবাচক ভূমিকা রাখেনি সেটা সবাই জানেন, কেননা শিক্ষা খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষ ছাড়াও এদেশের প্রায় প্রতিটি ঘরে কোনো না কোনো শ্রেণির শিক্ষার্থী আছে। ফলে, অভিভাবক হিসেবেও ইতিমধ্যে সবাই উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে, শিক্ষা ক্ষেত্রে কী অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে। তাই, এ ক্ষতি পুষিয়ে শিক্ষা খাতে সত্যিকার প্রাণ সঞ্চার করতে হলে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ ছাড়া গতি নেই। বাজেটে স্বাস্থ্য খাততে যে মাত্রার গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটা প্রশংসনীয় কিন্তু শিক্ষা খাতকে যে মাত্রার গুরুত্ব দেওয়া জরুরি সে মাত্রায় যে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি সেটা হতাশার।  

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি শিক্ষা খাতকে অন্যান্য খাতের মতো বিবেচনা করে আর দশটা বারোয়ারি ‘বাজেটিক-আইটেম’ ধরে চিন্তা-ভাবনা এবং বরাদ্দ-বিবেচনা করলে, আমরা একটা বড় ধরনের গলদ করব। কেননা শিক্ষা একটি জাতির মেরুদন্ড। মেরুদ- সোজা এবং শক্ত না-হলে, কোনো কিছু শেষ বিচারে দাঁড়াবে না। তাই, শিক্ষাকে সবসময়েই একটি বিশেষ বিবেচনায় এবং সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রীয় সব পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে এবং শিক্ষার যথাযথ উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।  কেননা, মেরুদ- সোজা করে দাঁড়ানোটা জরুরি।

লেখক নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়