আলোকচিত্রী প্লাটন অ্যান্টোনিও সাদা-কালো পোর্ট্রটে তুলতে ভালোবাসেন। তার তোলা ছবিতে টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ করা হয়েছে বিশবারেরও বেশি। ফটোগ্রাফি নিয়ে লিখেছেন প্লাটন’স রিপাবলিক, পাওয়ার, সার্ভিসসহ বিখ্যাত সব বই, তৈরি করেছেন অলাভজনক সংস্থা পিপলস পোর্টফোলিও। তাকে নিয়ে লিখেছেন মুমিতুল মিম্মা
চোখ ভালোবাসে, চোখ ঘৃণা করে
বারাক ওবামা, ভ্লাদিমির পুতিন, সেরেনা উইলিয়ামস, এলন মাস্ক, হ্যারি স্টাইলস সব নামকরা মানুষজন একই মানুষের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছেন। পোর্ট্রটে ছবি তোলায় তার জুড়ি মেলা ভার। রঙিন দুনিয়ায় থাকার পরেও সাদা-কালো ছবির প্রতি অমোঘ আকর্ষণ তাকে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করতে বাধ্য করে। তিনি টাইম ম্যাগাজিনের নিয়মিত ফটোগ্রাফারদের একজন, নিউ ইয়র্কারের প্রাক্তন কর্মী আলোকচিত্রী প্লাটন অ্যান্টোনিও। পোর্ট্রেেটর ফর্ম ভেঙে এবারে আনলেন নতুন চমক। সংগ্রহে থাকা প্রিয় তারকা, শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতা ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্বদের পোর্ট্রটে থেকে কেবল চোখের আইরিশের ছবি নিয়ে অনলাইনে আয়োজন করলেন অভিনব একটি প্রদর্শনীর। নাম না উল্লেখ থাকা প্রতিটি আইরিশের ছবি কিনতে পারবেন যে কেউ। কেনার পর ছবির সঙ্গে থাকা কোড মিলিয়ে নিয়ে জানতে পারবেন তিনি কার আইরিশের ছবি কিনেছেন। বাকি কেউ জানতেই পারবেন না প্রদর্শনীতে উপস্থিত ৩৬টি আইরিশের ভেতরে কোনটি বিখ্যাত, কোনটি কুখ্যাত ব্যক্তির। সেই আইরিশ হতে পারে পুতিনের কিংবা গাদ্দাফির। যাদের পোর্ট্রটে করা হয়েছে সেই মানুষদের ভেতরে যেমন ভালো মানুষ আছেন, তেমনি আছেন বিতর্কিত মানুষও। এই চমকের ওপর ভিত্তি করে প্রদর্শনীর নামকরণ করা হয়েছে ‘চোখ ভালোবাসে, চোখ ঘৃণা করে’।
এ বছর ৬ জুন প্রথম দফায় ১২টি আইরিশের ছবি প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে থাকছে বারাক ও মিশেল ওবামা, পুতিন, মার্ক জাকারবার্গ, মুয়াম্মার গাদ্দাফি, অ্যাডেলে ও প্রিন্স। এলজিএনডি ডট আর্ট নামক এক অনলাইন মার্কেটপ্লেসে এই প্রদর্শনী উন্মুক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি আইরিশের ছবির দাম ১১১ ডলার। মূল ছবি থেকে সর্বোচ্চ রেজ্যুলেশনে স্ক্যান করে আইরিশের কাছাকাছি অংশ ক্রপ করে ছবি তৈরি করা হয়েছে। এ বিষয়ে স্বয়ং প্লাটন বলেছেন, ‘আমি সবসময় সবার ক্লোজআপ শট নিই। প্রতিটি মানুষের সঙ্গে প্রতি সেশনে শুরুতেই আমি এ কাজ করে থাকি। এই শটগুলো তাদের বুঝতে সাহায্য করে। এরপরে আমাদের সাধারণ কথাবার্তা শুরু হয়।’
নিজের অনুমান শক্তি দিয়ে একজন ক্রেতা বা সংগ্রাহক এই ছবি সংগ্রহ করবে। বিবেক-বিবেচনার বাইরে গিয়ে এই প্রদর্শনী তারকাদের সাধারণ মানুষ হিসেবে ভাবার অনুশীলন করার উদ্দেশ্যেই এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে বলে তিনি জানান। সবসময় জাজমেন্টাল থাকার বদলে মানুষ এখানে একজন বিখ্যাত বা কুখ্যাত মানুষকে সাধারণ মানুষ হিসেবে দেখবে। প্রদর্শনীতে ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু বিতর্কিত মানুষকে রাখা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্লাটন হার্ভে ওয়েনস্টেইনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। হার্ভে হলিউডে কুখ্যাত প্রযোজক হিসেবে পরিচিত। ২০২০ সালের মার্চ মাসে যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের দায়ে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এমনকি আদালতে প্রমাণিত অপরাধী হিসেবে ২৩ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন তিনি। এ বিষয়ে প্লাটনের বক্তব্য, ‘‘কিছু লোক ইতিহাসের বিচারে সঠিক দিকে রয়েছেন, এবং কিছু লোক ভুল দিকে রয়েছেন। কিন্তু আপনি জানেন না কার মুখোশের ভেতরে কে রয়েছে। এই প্রদর্শনী নিজের সক্ষমতার বাইরে গিয়ে ছবিকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করবে ‘তুমি আসলে কে?’ আমি তাদের সেই দ্বন্দ্বে ফেলে দিতে চাইছি।”
তবে এই পোর্ট্রটে তুলতে গিয়ে অনেক প্রিয় স্মৃতি আছে তার। যেমন ২০১২ সালে সন্তান জন্মের পরে অ্যাডেলে সন্তানসহ তার স্টুডিওতে এ এসেছিলেন। ছবি তোলার সময় অ্যাডেলের বাচ্চা অপ্রত্যাশিতভাবে মাকে স্পর্শ করতে যায়। প্লাটন দেখলেন মুহূর্তের মধ্যে অ্যাডেলের চোখের দৃষ্টি বদলে গেল। ছবি তুলতে ভোলেননি তিনি। তিনি অ্যাডেলের আইরিশের ক্লোজ শটে পেয়ে গেলেন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী জিনিস মাতৃত্বের ছবি। একজন অল্পবয়সী মা তার ছেলেকে স্পর্শ করার কোমলতম মুহূর্ত নিজের ক্যামেরার লেন্সে এনে ফেললেন। নিজের তোলা প্রিয় ছবির দেখা পেয়ে গেলেন তিনি। নিজের মতো করে পৃথিবীকে দেখা এই শিল্পীর প্রাথমিক জীবনের শুরুতে ছিল উদ্বাস্তু হওয়ার জীবন সংঘাত। খুব সম্ভবত এ কারণেই জাজমেন্টের বাইরে গিয়ে পৃথিবীর রূপ দেখতে উন্মুখ তিনি।
অভিজ্ঞতার ঝুলি
১৯৬৮ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করা প্লাটন গ্রিক দ্বীপপুঞ্জে বেড়ে ওঠেন। ১৯৭০ সালের পরে তারা ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। সেন্ট মার্টিন স্কুল অব আর্টে পড়াশোনা করেন তিনি। গ্রাফিক্স ডিজাইনে ব্যাচেলর শেষ করার পরে রয়্যাল কলেজ অব আর্ট ফটোগ্রাফি ও ফাইন আর্ট নিয়ে মাস্টার্স শেষ করেন। মাস্টার্স চলাকালীন তিনি খণ্ডকালীন কাজ করা শুরু করেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। বেশ কয়েক বছর ব্রিটিশ ভোগ ম্যাগাজিনের হয়ে কাজ করেন। এরপর প্রয়াত জন কেনেডি জুনিয়র ও তার রাজনৈতিক ম্যাগাজিন ‘জর্জ’-এর হয়ে কাজ করার জন্য নিউ ইয়র্কে আমন্ত্রিত হন। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই বড় বড় প্রতিষ্ঠানে কাজ করা প্লাটন এরপরে পোর্ট্রটে শ্যুট করার জন্য ডাক পান রোলিং স্টোন, নিউ ইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিন, ভ্যানিটি ফেয়ার, এস্কোয়ার, জিকিউ ও সানডে টাইমসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রকাশনা থেকে। টাইম ম্যাগাজিনের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একটি বিশেষ অন্তরঙ্গতা গড়ে ওঠে তার। এখনো পর্যন্ত টাইম ম্যাগাজিনের ২০টির বেশি প্রচ্ছদ করা হয়েছে তার ছবি দিয়ে।
২০০৭ সালে প্লাটন টাইম ম্যাগাজিনের পার্সন অফ দ্য ইয়ার কভারের জন্য রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিনের ছবি তুলেছিলেন। এই ছবির জন্য ফটোগ্রাফারদের জন্য অত্যন্ত সম্মানজনক ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো’ থেকে প্রথম পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন তিনি। ২০০৮ সালে নিউ ইয়র্কারের সঙ্গে কয়েক বছরের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেন প্লাটন। স্টাফ ফটোগ্রাফার হিসেবে তিনি বড় আকারের ছবি নিয়ে সিরিজ তৈরি করেছেন। এর মধ্যে দুটি ২০০৯ ও ২০১০ সালে এএসএমই পুরস্কার জিতেছে। প্লাটনের নিউ ইয়র্কের পোর্টফোলিও প্রেসিডেন্ট ওবামার উদ্বোধন, মার্কিন সামরিক বাহিনী, বিশ্ব নেতাদের প্রতিকৃতি ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনসহ অনেক বিষয়ের ওপরে ছবি তুলেছেন। ছবি তোলাকে একেবারে বহুমাত্রিক শিল্পে পরিণত করেছেন তিনি।
পরের বছর প্লাটন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সঙ্গে একত্রিত হয়ে কাজ করেন একটি বিশেষ বিষয়ের ওপরে। স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তির নিষ্পেষণের শিকার দেশগুলোতে যারা সমতা ও ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করে চলেছে তাদের নিয়ে ছবি তোলার প্রজেক্ট। যাতে ছবির মাধ্যমে তাদের চাওয়া-পাওয়াগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরা যায়। এই প্রকল্পগুলো বার্মার মানবাধিকার রক্ষাকারীদের পাশাপাশি মিসরীয় বিপ্লবের নেতাদেরও তুলে ধরেছে। বার্মার কভারেজের পর প্লাটন টাইমের প্রচ্ছদের জন্য গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার কয়েক দিন পর অং সান সু চির ছবি তুলেছেন।
২০১১ সালে, নিউ ইয়র্কার ম্যাগাজিন ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সঙ্গে রাশিয়ার সিভিল সোসাইটির বিষয়ে সহযোগিতার জন্য প্লাটনকে একটি মর্যাদাপূর্ণ পিবডি পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। প্লাটনের প্রথম মনোগ্রাফ ‘প্লাটনস রিপাবলিক’ ২০০৪ সালে ফাইডন প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। এর প্রকাশনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রদর্শিত হয়েছিল। লন্ডনে সাবেক-সাচি গ্যালারির পাশাপাশি নিউ ইয়র্কের মিল্ক গ্যালারিতে এই বইয়ের প্রকাশনা উৎসব চলে। তার দ্বিতীয় বই ‘পাওয়ার’ ১০০ জনেরও বেশি বিশ্ব নেতার পোর্ট্রেেটর সংগ্রহ। ২০১১ সালে ক্রনিকল থেকে এই বইটি প্রকাশিত হয়। এই বইয়ের সাফল্যের হাত ধরে বিখ্যাত টেক জায়ান্ট অ্যাপল তাদের স্টোরে একটি অ্যাপ হিসেবে বইটিকে প্রকাশ করার জন্য নির্বাচন করে। বইটিতে বারাক ওবামা, মাহমুদ আহমেদিনেজাদ, দিমিত্রি মেদভেদেভ, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, হুগো শাভেজ, মাহমুদ আব্বাস, টনি ব্লেয়ার, রবার্ট মুগাবে, সিলভিও বার্লুসকোনি ও মুয়াম্মার গাদ্দাফির প্রতিকৃতি রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্লাটন পাবলিক স্পিকার হিসেবে উত্তরোত্তর দক্ষতা অর্জন করেছেন। গল্প বলা প্লাটনের কর্মজীবনে একটি প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। তাকে ইয়েলের ডাভোসে অবস্থিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম, লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স, লন্ডনের ন্যাশনাল পোর্ট্রটে গ্যালারি ও নিউ ইয়র্কে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার অফ ফটোগ্রাফিতে প্রধান বক্তা হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তিনি চার্লি রোজ (পিবিএস), মর্নিং জো (এমএসএনবিসি), ফরিদ জাকারিয়ার জিপিএস (সিএনএন) এবং বিবিসি ওয়ার্ল্ড নিউজসহ বিভিন্ন টেলিভিশন মিডিয়াতেও উপস্থিত হয়েছেন।
২০১১-২০১৩ সালের মধ্যে প্লাটনের কাজ দেশ ও বিদেশে অসংখ্য গ্যালারিতে প্রদর্শিত হয়েছে। তিনি নিউ ইয়র্কে ম্যাথু মার্কস গ্যালারি ও হাওয়ার্ড গ্রিনবার্গ গ্যালারিতে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে ফ্রান্সের প্যারিসের কোলেট গ্যালারিতে প্রদর্শনী করেছেন। নিউ ইয়র্ক হিস্টোরিকাল সোসাইটি প্লাটনের নাগরিক অধিকারের ছবিগুলো নিয়ে একটি একক অনুষ্ঠানও প্রদর্শন করে। পরে সে ছবিগুলো জাদুঘরের স্থায়ী সংগ্রহের অংশ হিসেবে রয়ে গেছে। প্লাটনের ফটোগ্রাফি স্থান পেয়েছে ফ্লোরিডার টাম্পার ফ্লোরিডা মিউজিয়াম অফ ফটোগ্রাফিক আর্টস ও অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় ফটোগ্রাফির জন্য ওয়েস্টলিচ্ট মিউজিয়ামে।
বিশেষ কাজ
প্রেসটেল পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত ‘সার্ভিস’ বইটিতে ক্ষমতাধরদের ছবি তোলা প্লাটন তার ছবির বিষয়বস্তু বদল করে লেন্স ঘুরিয়ে দেন মার্কিন সামরিক কর্মী ও তাদের পরিবার-পরিজনদের ওপরে। ব্যক্তি প্লাটন কখনো কোনো দলের অধীনে থাকতে চাননি বলে ক্ষমতাধরদের ছবি তোলার পরেও জনগণের সঙ্গে অনেক সময় কাটিয়েছেন। তাদের ছবিতে তাদের ব্যক্তিগত জীবনের টানাপড়েন তুলে ধরার সঙ্গে সঙ্গে ওপরতলার মানুষের তকমা ফেলে দিয়ে প্লাটন হয়ে ওঠেন জনসাধারণের। গড়ে তোলেন অলাভজনক সংস্থা পিপলস পোর্টফোলিও। বিশ্বজুড়ে কম গুরুত্ব পাওয়া মানুষদের গল্প তুলে ধরছেন এখানে।
মোজাভে মরুভূমির ফোর্ট আরউইনে সেনাবাহিনীর জাতীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় তিনি সৈন্যদের সঙ্গে সময় কাটান। যে ক্যাম্পে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল সেটি ছিল ইরাকের আদলে নির্মিত একটি কৃত্রিম ক্যাম্প ছিল। ইরাকে যাওয়ার আগে সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল সেই ক্যাম্পে। দুঃসহ পরিবেশ ছিল সেই ক্যাম্পের। ১০৫ ডিগ্রি তাপমাত্রার ভেতরে লোকেরা চিৎকার করছে, সন্ত্রাসীরা ঘিরে ফেলেছে আপনাকে। এই সমস্ত উপকরণ দিয়ে কৃত্রিমভাবে নির্মিত যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যরা তাদের দিন কাটাচ্ছিল। প্লাটনকে আগে থেকেই ছবি তোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ক্যাম্পে একটি রাস্তার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ট্রমা লেন’। প্লাটন দেখলেন এই রাস্তায় ট্রমা ছাড়াও আরও অনেক কিছু আছে। আছে কোমল ভালোবাসা, সহানুভূতি– সব। প্লাটন দেখলেন তিনি যে ক্যামেরা দিয়ে কাজ করেন সেই ক্যামেরার একপাশে থাকা চামড়া ধাতুর ওপরে গলে আটকে আছে। ৪-৫ দিন সময় টানা ১৫ ঘণ্টা করে সেই ক্যাম্পের ছবি তুলেছেন তিনি। বিস্ফোরণের শব্দের ভেতরেও যে কেউ ঘুমিয়ে পড়তে পারে সে জিনিস জানা ছিল না প্লাটনের। সেই কৃত্রিম ক্যাম্প তাকে সে অভিজ্ঞতা এনে দেয়। একরাতে তিনি ঘুম থেকে জেগে দেখেন তার বুকের ওপর বুট চাপিয়ে এক সৈন্য দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু সাধারণ একজন ফটোগ্রাফার হিসেবে প্লাটনের হার্ট অ্যাটাক হওয়ার জোগাড় হয় সেদিন। তিনি পরিচয় দিলেন নিউ ইয়র্কারের ফটোগ্রাফার হিসেবে। সে পরিচয়ে ছাড় মিলল। সৈন্য তাকে সন্দেহ করে তল্লাশি করে। কিছু না পেয়ে চলেও যায়। প্লাটন হয়তো ভাবছিলেন কৃত্রিম যুদ্ধক্ষেত্রে যদি এই অবস্থা হয় বাস্তবে যুদ্ধক্ষেত্রের স্বরূপ কেমন? কিন্তু জাত ফটোগ্রাফার হিসেবে পরদিন সেই সৈন্যকে খুঁজে বের করলেন প্লাটন। পোর্ট্রেট না নিয়ে ফিরলেন না। এরপরে সৈন্যদের যে যার মতোন যুদ্ধে চলে গেলে তিনি অপেক্ষা করেন তারা ফিরে আসবেন। তিনি সেই ফিরে আসা সৈন্যদের ছবি তুলবেন। তিনি সেই সৈন্যদের জিজ্ঞেস করেছিলেন কেন তারা যুদ্ধে যাচ্ছেন? যুদ্ধ তো বিপজ্জনক, তাদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে হবে এই যুদ্ধে গিয়ে। তারা সবাই একবাক্যে জানিয়েছিলেন তারা দেশের সেবা করতে যাচ্ছেন।
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরা সৈন্যদের সবাই বদলে যাওয়া মানুষ। কেউ হাত-পা হারিয়েছেন, কেউ মারা গেছেন। তিনি দেখলেন হুইল চেয়ারে আসীন এক সৈন্যকে তার স্ত্রী নিয়ে যাচ্ছেন। যাওয়ার সময় বলে গেল, ‘আমি ওকে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি। এখানে কেউ তাকে মারার জন্য খুঁজবে না।’ তিনি দেখলেন যুদ্ধক্ষেত্রের সমস্ত অস্থিরতা আর অমানবিকতাকে পেছনে ফেলে একজন সৈন্য বাড়ি ফিরবেন।
এলশেবা খান একজন শহীদ জননী। তার ছেলে করিম রাশেদ সুলতান খান ২০ বছর বয়সে যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যান। ইরাক যুদ্ধে তিনি আমেরিকার হয়ে লড়াই করেছেন। সেই মা তার ছেলের কবর দেখতে যাওয়ার সময় কবরকে বাচ্চার মতো করে জড়িয়ে ধরেন। সেই দৃশ্য মিস করেননি প্লাটন। আবার আছে ২৬ বছর বয়সী শহীদ জায়া জেসিকা গ্রের জীবনের গল্প। ৫ মাস বয়সী বাচ্চা রেখে তার স্বামী স্টাফ সার্জেন্ট ইয়ান্স গ্রে বাগদাদে কর্মরত অবস্থায় মারা যান। আমেরিকার পতাকাই হয়ে ওঠে জেসিকার কাছে মৃত স্বামীর প্রতিচ্ছবি। জেসিকাকে তার স্বামীর ব্যবহৃত সমস্ত পোশাক দেওয়া হয়েছিল। বহুদিন হয়ে গেলেও সেই পোশাকের বাক্স খোলার সাহস পাননি জেসিকা। প্লাটন যেদিন ছবি তুলতে তার বাসায় গেলেন। জেসিকা সন্তর্পণে বাক্সটি খুলে পোশাকের গন্ধ নিতে চাইলেন। কান্নায় ভেঙে পড়ে জানালেন, ‘তুমি কী জানো আমি কেন কাঁদছি? এই জামাকাপড়গুলো ধুয়ে ফেলা হয়েছে। আর্মি ক্যাম্প থেকে আমাকে ধোয়া জামাকাপড় পাঠানো হয়েছে। আমি কোনোদিন তার গায়ের গন্ধ খুঁজে পাব না এখান থেকে।’ প্লাটন জেসিকাকে আঘাত করতে চাননি। কিন্তু কী হতে কী হয়ে গেল! প্লাটন এই সমস্ত গল্প বাক্সবন্দি করলেন ‘সার্ভিস’-এ। অসংখ্য সৈন্যের আর্তি আর প্রিয়জনের গন্ধহীন জামাকাপড়ের উপাখ্যান এই বই।