বইয়ের পার্সেলে আসছে নতুন মাদক ডিএমটি, গ্রেপ্তার ৪

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে ভয়ংকর মাদক ডিএমটি ও এলএসডি। লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইথ্যালামাইডের (এলএসডি) পর এবার দেশে প্রথমবারের মতো উদ্ধার হয়েছে ডায়েমেথিল ট্রাইপ্টেমিন (ডিএমটি) নামক ভয়ংকর এক মাদকদ্রব্য।

চোরাকারবারিরা কানাডা ও থাইল্যান্ড থেকে আকাশ পথে পার্সেলে করে বইয়ের মধ্যে দিয়ে নিয়ে আসছে এসব মাদক। অত্যন্ত পাতলা ও সূক্ষ্ম মাদক হওয়ার কারণে এটি বইয়ের পাতার মধ্যে রাখায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়ানোর ছাড়াও স্ক্যানিং মেশিনে সহজে ধরা পড়ে না।

যারা ডিএমটি ও এলএসডিতে আসক্ত হচ্ছে তারা অধিকাংশই শিক্ষার্থী। অনেকেই বিদেশে পড়াশোনা করতে গিয়ে এ ভয়ংকর মাদকে জড়িয়ে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ব্যবসা ও মাদক পাচারে জড়িয়ে পড়ছে।

এই মাদকে আসক্ত পাচার কাজে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকা থেকে ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। রবিবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানানো হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম বিভাগের সহকারী পরিচালক মেজর রইসুল আজম মনি ও সহকারী পরিচালক এএসপি ইমরান হোসেন ইমন প্রমুখ। 

গ্রেপ্তারকৃতরা হচ্ছেন- সৈয়দ মঈন উদ্দিন আহমেদ ওরফে শাদাব (২৯), মো. আব্রাহাম জোনায়েদ তাহের (২৫), স্বপ্নিল হোসেন (২২) ও সিমিয়ন খন্দকার (২৩)। এ সময় তাদের কাছ থেকে এলএসডি, নতুন মাদক ডিএমটি ৬০০ মিলিগ্রাম, আমেরিকান ক্যানাবিজ ৬২ গ্রাম এবং মাদক সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জামাদি জব্দ করা হয়।

র‌্যাব-২ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম সাঈফ জানান, বিদেশে পড়ালেখা করার জন্য অবস্থানকালেই সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তানেরা জড়িয়ে পড়ছে ভয়ংকর সব নতুন মাদকে। কেউ থাইল্যান্ডে গিয়ে নতুন মাদক ডিএমটিতে আসক্ত হচ্ছে, কেউ আবার লন্ডনে গিয়ে এলএসডি সেবনে আসক্ত হচ্ছে। পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরলেও আসক্তি থেকে পোস্টাল সার্ভিসের মাধ্যমে দেশে আমদানি করছে এলএসডি ও ডিএমটি।

তিনি আরও জানান, সম্প্রতি মাদক চোরাকারবারি ও মাদকসেবীরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পন্থা অবলম্বন করছে। বিশেষ করে সম্প্রতি বাংলাদেশে প্রচলিত নয় কিন্তু, বিভিন্ন উন্নত দেশে প্রচলিত এমন কিছু মাদকের ব্যবহার বাংলাদেশে পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে আমাদের যুবসমাজ এতে আসক্ত হচ্ছে। গ্রেপ্তারকৃতরা সবাই এই দুই ধরনের মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এলএসডি সম্পর্কে ইতিমধ্যে আমরা জেনেছি। এটি মূলত বিদেশ থেকে পোস্টাল সার্ভিসের মাধ্যমে বাংলাদেশে আনা হয় এবং উচ্চমূল্য হওয়ায় মূলত এর ব্যবহারকারী উচ্চবিত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

নতুন মাদক ডিএমটি, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যার নাম Dimethyl Tryptamine । এটি একটি হ্যালুসিনোজেনিক ট্রিপটামাইন ড্রাগ। মূলত এটি মুখ দিয়ে ধোঁয়ার মাধ্যমে শ্বাস নিয়ে বা ইনজেকশনের সঙ্গে নেয়া যায়। এটি সেবনের পর ৩০ থেকে ৪০ মিনিট গভীর হ্যালুসিনেশন তৈরি করে। এটি সেবনের পর দ্রুত হ্যালুসিনেশন হয় এবং তারা কল্পনার জগতে প্রবেশ করে। এ থেকে মারাত্মক দুর্ঘটনা হতে পারে, এমনকি জীবননাশও হতে পারে।

গ্রেপ্তার শাদাব রাজধানীর উত্তরায় স্থানীয় এক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হতে এ লেভেল শেষ করার পর ভারতের দার্জিলিংয়ে ২০১৩ সালে ও লেভেল পড়াশোনা করে। এরপর সে ২০১৫ সালে বিবিএ পড়ার জন্য থাইল্যান্ডে যায়। এক বছর সে থাইল্যান্ডে বিবিএ পড়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সঙ্গে এলএসডি ও ডিএমটি মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে। পরে বাংলাদেশে এসেও ওই মাদক গ্রহণ ও সংগ্রহ অব্যাহত রাখে। শাদাব মূলত এই ড্রাগ বিদেশ থেকে বিভিন্ন পোস্টাল সার্ভিসের মাধ্যমে নিয়ে আসে এবং বাংলাদেশে নিজে গ্রহণ ও বিক্রি করে।

আব্রাহাম জোনায়েদ তাহের রাজধানীর এক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে এ লেভেল শেষ করে মালয়েশিয়ায় যায়। ২০১৫-১৬ সাল পর্যন্ত পড়ালেখার জন্য দেশটিতে অবস্থান করে। পরে সে উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে যায়। সেখানে সে নিয়মিত এলএসডি ও ডিএমটি গ্রহণ করত। এমবিএ শেষ করে ২০২০ সালে বাংলাদেশে ফেরত আসে এবং বাংলাদেশে নিয়মিত এলএসডি ও ডিএমটি গ্রহণ ও বিক্রি করে। এছাড়া স্বপ্নিল হোসেন এবং সিমিয়ন খন্দকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। 

এক প্রশ্নের জবাবে খন্দকার সাইফুল আলম সাঈফ জানান, ব্যবহারকারীরা সমুদ্র সৈকত, পাহাড়ি রিসোর্ট বা কোন বিনোদন কেন্দ্রে প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই মাদকের ব্যবহার করে থাকে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন গ্রেপ্তারকৃতরা।

তিনি জানান, বাংলাদেশে এর আগে এলএসডি মাদক জব্দ হয়েছে। সেবনকারী ও ব্যবহারকারী গ্রেপ্তার হয়েছে। তবে ডিএমটি নামক এই মাদক এর আগে আগে কখনো জব্দ হয়েছে বলে জানা যায়নি। প্রকৌশল বা রাসায়নিক গবেষণাগারেও এই মাদক তৈরি করা সম্ভব। এখন পর্যন্ত এই দুই ধরনের মাদক বিশেষ শ্রেণির হাতেই রয়েছে। তারা নিজেরা পরিচিতদের মাধ্যমে ডিএমটি ও এলএসডি আমদানি করে। কখনো নিজেরা গিয়েও নিয়ে আসে। কুরিয়ার বা  পোস্টাল সার্ভিসের মাধ্যমে চিঠি বা বইয়ের মাধ্যমে এগুলো সহজে নিয়ে আসা সম্ভব।

তিনি জানান, গ্রেপ্তারকৃতরা নিজেরাই মাদক সেবন করে, বিক্রি করে এবং নতুন নতুন মাদক গ্রহীতা তৈরি করে, যা সমাজের জন্য খুবই আশঙ্কাজনক।