রাজধানীর মগবাজার ওয়ারলেস গেট এলাকায় রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ভয়াবহ বিস্ফোরণে কমপক্ষে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে দুই শতাধিক মানুষের বেশি। এদের মধ্যে কমপক্ষে ১৭ জনের আশঙ্কাজনক। বিস্ফোরণে আশপাশের ৭টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া এ সময় ফ্লাইওভারের উপরে ও নিচের সড়কে চলাচলরত অন্তত ১৫টি বাসসহ কয়েকটি যানবাহনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দুর্ঘটনার পর থেকে আশপাশের ভবনের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। আহত-নিহতদের অনেকেই রাস্তার বাস যাত্রী ও পথচারীরাও। খবর পেয়ে ফায়ার ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। তবে বিস্ফোরণের কারণ সম্পর্কে তারা গতকাল রাত ১০ পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারেনি। বিস্ফোরণটি নাশকতাজনিত ছিল কিনা তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ৭৯ বড় মগবাজার ওয়্যারলেস গেট সংলগ্নে এলাকায় আড়ংয়ের শো-রুমের উল্টোপাশে একটি তিন তলা ভবনের নিচ তলায় বিস্ফোরণ হয়। ওই ভবনটিতে ‘শর্মা হাউস’, বেঙ্গল মিট, গ্র্যান্ড সুইটসসহ কয়েকটি দোকান ছিল। দোতলায় ছিল সিঙ্গার ইলেকট্রনিকস পণ্যের গোডাউন। তিন তলায় থাকতেন বাড়ির মালিক ও কয়েকজন ভাড়াটিয়া। ভবনের নিচতলায় হওয়া বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে এর থেকে অন্তত ৩০-৪০ গজ দূরের ভবনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাস্তার উল্টো পাশে আড়ংয়ের শোরুমের ৬ তলা পর্যন্ত জানালার কাঁচ, কার্নিস ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিশাল সেন্টার, রাশমনো হাসপাতালসহ কয়েকটি ভবন। বিস্ফোরণের সময় রাস্তা চলাচলরত ১৫-১৬টি বাস ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই সময় পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ৯টি ইউনিট ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। ঘটনাস্থলে রাস্তায় ভাঙা কাঁচ, ইটের টুকরাসহ বিভিন্ন সামগ্রী পড়ে থাকতে দেখা যায়।
পাশের ভবনের বাসিন্দা তৌহিদুর রহমান জানান, হঠাৎ বিস্ফোরণে সবকিছু কেঁপে ওঠে। মনে হলো যে, কান দিয়ে ধোঁয়া ছুটছে। মানুষ আল্লাগো বাঁচাও বলে চিৎকার করতে থাকে। বিস্ফোরণে রাস্তায় কেয়ামতের মতো ভয়াবহ নেমে আসে। মানুষ প্রাণ নিয়ে যে যে দিকে পারে দৌড়ে নিরাপদে যেতে থাকে। বিস্ফোরণের সময় মগবাজার ওয়ারলেসের মূল সড়কটিতে ছিল তীব্র যানজট।
ঘটনার প্রত্যক্ষ দর্শী সোলায়মান কবির জানান, যেখানে বিস্ফোরণ ঘটেছে, তার অল্প কিছু দূরে একটি বাসে ছিলেন। বিকট শব্দে বিস্ফোরণের কথা শুনে বাস থেকে নেমে দৌড়ে আসেন ঘটনাস্থলে।
জানান, ঘটনাটি ঘটে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার মতো হবে। বাসের ভেতরে আছিলাম। নাইম্যা দৌড়াইছি, ফ্রেন্ডরে আমার শার্টটা দিয়া এই জায়গায় আসছি। ‘আইসা দেখি এইখানে দুইটা বাস, আর ওই পাশে একটা বাস। এইহানে মানুষ এইখান সেইখানে রাস্তায় পইরা ছিল। আমরা মানুষ ধরাধরি কইরা মেডিকেলে নিছি। তার পরে এই বাস থেইক্যা নেয়া হইছে তিনজন, আর এই বিল্ডিং থাইক্যা নেয়া হইছে চাইরজনকে। এর মধ্যে দুই জন মৃত। একটা প্রায় ৯-১০ মাসের বাচ্চা, আরেকটা আট-১০ বছরের বাচ্চা, আরেকটা মহিলা। মহিলাডারে নেয়া হইছে আদদীন মেডিকেলে। মহিলার কোলে ছিল ছোট বাচ্চাডা।’ সোলায়মান বলেন, এত বিকট আওয়াজ হয়েছে সে সবকিছু কাইপা গেছে।
আবদুর রহমান নামে এক চা বিক্রেতা বলেন, ‘৭৯ আউটার সার্কুলার রোডস্থ শর্মা হাউস ভবনের নিচ তলায় হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে। এত জুড়ে বিস্ফোরণ হয়েছে তাতে মনে হয়ে হয়েছে জঙ্গিরা হামলা করেছে। ভবনটির নিচ তলাটি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে।’
পুলিশ জানিয়েছে, বিস্ফোরণে বাস, প্রাইভেটকার, সিএনজি অটোরিকশা, রিকশার যাত্রী ও পথচারীরা বেশি আহত হয়েছেন। আহতদের উদ্ধার করে প্রথমে মগবাজার কমিউনিটি হাসপাতাল ও ঢামেকে নিয়ে যায় পথচারী, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের লোকজন। পরে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটেও ভর্তি করা হয়েছে। শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন এস এম আইয়ুব হোসেন বলেন, ‘বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত ৩৬ জনকে এখানে আনা হয়েছে। তার মধ্যে দেড় বছরের শিশুসহ ৪ জন মারা গেছেন। তবে ঘটনাস্থল থেকেই তাদের মৃত অবস্থায় আনা হয়েছে। ’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বার্ণ ইউনিটে অন্তত ৫০ জনকে ভর্তি করা হয়। কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিসাবরক্ষক বিপুল জ্যোতি কুণ্ড জানান, হাসপাতালে ৬০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন শিশুসহ দুইজন মারা গেছে। তাদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া আদদ্বীন হাসপাতাল, রাশমনো হাসপাতাল, কাকরাইলের ইসলাম ব্যাংক হাসপাতাল ও সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও অনেকে চিকিৎসা নিয়েছেন।
কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তিনতলা একটি ভবনের নিচতলার শর্মা হাউস নামের রেস্টুরেন্টে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভবনের বিদ্যুতের জেনারেটরেও বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পরে। এ সময় রাস্তায় যানজটে আটকে থাকা বাসসহ কয়েকটি যানবাহনে প্রায় আগুন ধরে যায়। বাসগুলোর দরজা-জানালা পুড়ে গেছে। জানালার গ্লাসগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
বলাকা পরিবহনের চালক মো. মিঠু মিয়া বলেন, ‘বিস্ফোরণটি বিকট শব্দের ছিল। আগুনের ঝলকানিও দেখছি। অনেকে আহত হয়েছেন। রক্তাক্ত অবস্থায় তাদের হাসপাতালে নিতে দেখেছি। ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নেভায়।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদর দপ্তরের কন্ট্রোল রুমের ডিউটি অফিসার এরশাদ হোসেন বলেন, ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের একটি অ্যাম্বুলেন্সসহ ১৩টি ইউনিট কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, প্রথমে আমরা ওই ভবনে এসি বিস্ফোরণ হওয়ার খবর পাই। পরে আবার অনেকে ফোন করে জানিয়েছেন, গাড়ির সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক দেবাশীষ বর্ধন বলেন, সেখানে একটি ভবন প্রায় ধসে পড়েছে- এমন খবর পাওয়ার পর আমাদের সদস্যরা সেখানে গেছে। সেখানে কয়েকজন আটকা পড়ার খবরও পেয়েছি। আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
শেখ হাসিনা বার্ণ ইউনিটিতে চিকিৎসাধীন রায়হানুল গাফফার নয়ন জানান, ঘটনার সময় তিনি যাত্রীবাহী বাসে ছিলেন। বিকট বিস্ফোরণের বাসের কাচ ভেঙে তিনি আহত হন। আহত এক পথচারী পইমল ইসলাম জামাল বলেন, তিনি মতিঝিলে একটি হোটেলে চাকরি করেন। সন্ধ্যায় সেখান থেকে বাসে করে মগবাজারের বাসায় ফিরছিলেন। রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম থাকায় তিনি সিদ্ধেশ্বরীতে বাস থেকে নেমে যান। এরপর রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় বিকট বিস্ফোরণ হয়। এতে উপর থেকে কিছু তার মাথায় ও শরীরে এসে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি রাস্তায় পড়ে যান।
শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক ডাঃ সামন্ত লাল সেন জানান, রাত ১০ পর্যন্ত বার্ন ইনস্টিটিউটে ১৭জন রোগী ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে ২জনকে মৃত অবস্থাতেই নেওয়া হয়। ৩ জন দগ্ধ রোগী। এদের ২জনকে আইসিইউতে ও একজনকে এইচডিইউতে রাখা হয়েছে। দগ্ধ ৩ জনেরই শরীরের ৯০ শতাংশ বার্ন। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বাকিরা সবাই আহত। তাদের শরীরে ভাঙা ও কাটা ছেঁড়া জখম রয়েছে। তাদেরকে অবজারভেশনে রাখা হয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের পরিদর্শক মো. বাচ্চু মিয়া জানান, ঢাকা মেডিকেলে ৩৮জনকে নিয়ে আসা হয়েছে। তাদের মধ্যে শিশু ও নারী রয়েছে। তাদের সবার শরীরেই কাটা ছেড়া গুরুতর আঘাত রয়েছে।
ঢাকা মেডিকেলে মগবাজারে বিস্ফোরণের ঘটনায় জান্নাত (৩০) নামে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। তার আগে ঘটনাস্থলেই মারা যায় জান্নাতের ৯ মাস বয়সী মেয়ে সুবহানা। নিহতর নারীর স্বামীর নাম সুজন তারা মগবাজার এলাকায় থাকতো।
সুজনের বন্ধু আলমগীর জানান, ঘটনার সময় তারা মগবাজার ওয়ারলেস শর্মা হাউসে রাতে খেতে যান। বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলে জান্নাতের ৯ মাসের শিশু সন্তান মারা। আর জান্নাত মারা যায় ঢামেকে। এই ঘটনায় জান্নাতের ছোট ভাই রাব্বি ও গুরুতর আহত।