পাবনার বেড়া উপজেলায় অনিয়মে রাজি না হওয়ায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের নাটক সাজানোর অভিযোগ উঠেছে একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক হয়েও চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে বিভিন্ন গণমাধ্যমের পরিচয় দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের ঠিকাদারি কাজ প্রভাব খাটিয়ে বাগিয়ে নেয়া, কাজ না করেই বিল উত্তোলনসহ নানা অভিযোগ ওই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।
অপরদিকে, বেড়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগ তুলে সম্প্রতি কয়েকটি পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয়েছে।
শিক্ষা কর্মকর্তার অভিযোগ, অনৈতিক সুবিধা না পেয়ে নিজেদের প্রভাব দেখাতেই চক্রটি অসত্য সংবাদ প্রকাশ করেছে।
বেড়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুস সালাম জানান, চলতি অর্থ বছরে বেড়া উপজেলার ১১২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা উপকরণ ক্রয় বাবদ ৭০ লাখ টাকা, রুটিন রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারে ৩০ লাখ টাকা এবং শ্রেণিকক্ষ সজ্জিতকরণে ২০ লাখ টাকাসহ মোট এক কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সরেজমিন কাজের গুণগত মান ও শতভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে কিনা তা দেখেই চূড়ান্ত বিল প্রদান করে। কিন্তু বিধিবহির্ভূতভাবে বেশ কিছু প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কাজের মান যাচাইয়ের আগেই চূড়ান্ত বিলের জন্য চাপ সৃষ্টি করে।
আব্দুস সালাম আরো জানান, সাঁথিয়া উপজেলার ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জহুরুল ইসলাম তাকে উপকরণ সরবরাহের কাজ দেওয়ার জন্য দাবি করেন। জহুরুল ইসলামের ভাই আমিনুল ইসলাম সাঁথিয়ার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিনি জুয়েল আমিন, আমিন ইসলাম, আমিন জুয়েলসহ বিভিন্ন নামে পরিচয় লুকিয়ে চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। তাদের মামা আকতারুজ্জামান আখতার একটি দৈনিকের জেলা প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে, ভাগনে জহুরুলকে কাজ দিতে চাপ দেন। কিন্তু বিধিবহির্ভূত হওয়ায় তাদের কাজ দেওয়া সম্ভব হয়নি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে, তারা কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আমার বিরুদ্ধে উন্নয়ন প্রকল্পের ৩০ ভাগ ঘুষ দাবির অসত্য অভিযোগ করান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের একটি সূত্র জানায়, ইউনিয়ন পর্যায়ে বেশির ভাগ কাজ মাত্র ৩০ থেকে ৪০ ভাগ শেষ করা হয়েছে। কিন্তু তারা চূড়ান্ত বিলের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। তা না দেওয়ায় প্রধান শিক্ষকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। কাজ না পেয়ে তাদের সঙ্গে যোগ দেন সাংবাদিক পরিচয়ে কাজ নিয়ন্ত্রণ করা সিন্ডিকেটটি। গত বছর তারা নিম্নমানের সামগ্রী সরবরাহ করায় ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। সাংবাদিক আকতারুজ্জামান তার ভাগনে জহুরুলকে ৭০ লাখ টাকার উপকরণ সরবরাহের কাজ দিতে শিক্ষা কর্মকর্তাকে অন্তত চারবার ফোন করেন। কথামতো কাজ না দেওয়ায় পত্রিকায় ঘুষ চাওয়ার মনগড়া সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে।
সূত্রটি আরো জানায়, জহুরুল ইসলামের ভাই আমিনুল ইসলাম জুয়েল সাঁথিয়ার কুমারগাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হয়েও চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। তিনি প্রভাব কাজে লাগিয়ে নিয়মিত স্কুলে আসেন না ও বিজ্ঞাপন বাণিজ্য করে বেড়ান। পাশাপাশি তারা একই পরিবারের কয়েকজন প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগে চাকরি করায় এই দপ্তরে বিভিন্ন কাজ প্রভাব খাটিয়ে বাগিয়ে নেন।
শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুস সালাম আরো জানান, তিনি এর আগে বেড়ায় কর্মরত থাকাকালীন দুর্গম চরাঞ্চলের শিক্ষকদের ক্লাস ফাঁকি বন্ধ করায় অনেক শিক্ষকের বিরাগভাজন হন। কয়েক মাস আগে পুনরায় বেড়ায় যোগদানের পর স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষকদের স্কুলে উপস্থিত হয়ে অনলাইনে ক্লাস নেয়ার নির্দেশ দেন। গত দেড় বছরে একদিনের জন্যও স্কুলে আসেননি এমন কয়েক শিক্ষককে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়ায় তারাও এক জোট হয়ে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছেন।
এ বিষয়ে উপকরণ সরবরাহের কাজ চাওয়া ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জহুরুল ইসলাম বলেন, আমি বড় কোনো ঠিকাদার নই। কিছু কিছু স্কুলে সামান্য উপকরণ সরবরাহ করি। কাজ দেওয়ার জন্য শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে গিয়েছিলাম তিনি আমাকে পাত্তাই দেননি। ওনার আচরণ খুবই খারাপ, শিক্ষকদের সঙ্গে অকথ্য ভাষায় কথা বলেন। ঘুষ দাবির বিষয়টি ভুক্তভোগী প্রধান শিক্ষকরাই ভালো বলতে পারবেন। সাংবাদিক মামা নিউজের প্রয়োজনে তাকে ফোন করেছিলেন, আমার কাজের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। আমার কাজ না পাওয়ার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
জহুরুলের ভাই কুমারগাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম জুয়েল বলেন, উপকরণ সরবরাহের ব্যবসা আমার ভাই করে, আমি এতে জড়িত নই।
সরকারি চাকরি করে কীভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি শখের বসে সাংবাদিকতা করি, সে পরিচয়ে প্রভাব খাটানো কিংবা স্কুল ফাঁকির অভিযোগ সত্য নয়।
পাবনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা খন্দকার মনসুর রহমান বলেন, সরকারি চাকরিরত অবস্থায় উপকরণ সরবরাহ কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ নেই। জহুরুল ইসলাম ও আমিনুল ইসলামের ব্যবসা কিংবা চাকরির বিষয়ে জানা নেই। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ ব্যাপারে বেড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সবুর আলী জানিয়েছেন, শিক্ষকরা ঘুষের দাবির মৌখিক অভিযোগ করেছেন। শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্যও শুনেছি। তবে সব কাজ শতভাগ কাজ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত বিল না দেওয়ার জন্য নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে। তদন্ত করে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।