দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একমাত্র মেডিকেল বর্জ্য ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট রয়েছে খুলনার শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে। কিন্তু ৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত এই প্ল্যান্টটি প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে তিন বছরেও চালু করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি দিলেও আজ পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে জীবাণুমুক্ত না করেই যত্রতত্রভাবে ফেলা হচ্ছে হাসপাতালটির মেডিকেল বর্জ্য। ফলে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে উল্টো নতুন নতুন জীবাণু সংক্রমণের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৫ সালের ২৩ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর খুলনার শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের জন্য নিউটি সিড লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কানাডিয়ান কোম্পানি হাইড্রোসেলফ সিস্টেম করপোরেশন থেকে মেডিকেল বর্জ্য পরিশোধনের যন্ত্রপাতি আনে। এজন্য ব্যয় হয় ৮৮ কোটি ২ লাখ ৯৩ হাজার ২০০ টাকা। যন্ত্রপাতি ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। বর্জ্য পরিশোধনের প্ল্যান্টটি বন্ধ থাকায় একদিকে যেমন পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ বিভিন্ন প্রতিকূলতার শিকার হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের বর্জ্য অপসারণকারী এক কর্মচারী বলেন, ‘আমাদের এখানে কিছু ডাস্টবিন রাখা আছে। নার্সরা এসব ডাস্টবিনে ময়লা ফেলে দেয়। আমরা ডাস্টবিন থেকে নিয়ে বাইরে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলে দিই।’
হাসপাতালের উপপ্রকৌশলী মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘মেশিন স্থাপনসহ সব কাজ পরিপূর্ণ করে আমরা বসে আছি। এখন শুধুমাত্র ৫ জন কর্মচারী পেলেই প্ল্যান্টটি পরিপূর্ণভাবে চালু করা সম্ভব। তবে আমরা অন্তত মেশিন ঠিক রাখার জন্য নিজেরা কিছু কিছু সময় চালু ও বন্ধ করি। কিন্তু পরিপূর্ণভাবে কাজ শুরু করতে পারছি না। যেখানে প্রয়োজন ১০ জন টেকনিশিয়ান, সেখানে আমি পুরো হাসপাতালে একমাত্র ইঞ্জিনিয়ার। মেশিনটি একবার রিসাইকেল করতে সময় লাগে ৫ ঘণ্টা। তবে দক্ষ জনবল ছাড়া প্ল্যান্টটির বয়লার চালাতে গেলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। প্ল্যান্ট চালু না থাকায় হাসপাতালের মেডিকেল বর্জ্য একটি এনজিওর কর্মীরা পিকআপে করে রাজবন্ধ এলাকায় খুলনা সিটি করপোরেশনের ডাম্পিং গ্রাউন্ডে নিয়ে ফেলে আসেন।’
এ প্রসঙ্গে খুলনা করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালের সমন্বয়ক ও খুলনা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ ডা. মেহেদী নেওয়াজ বলেন, ‘বর্জ্যরে মধ্যে মেডিকেল বর্জ্য সবচেয়ে বিপজ্জনক। আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল ছাড়া খুলনা বিভাগের অন্য কোনো হাসপাতালে এ বর্জ্য ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নেই। প্ল্যান্ট থাকার পরও পরিশোধন না করেই এই হাসপাতালের মেডিকেল বর্জ্য বাইরে অপসারণ করতে হচ্ছে। গত বছর আবু নাসের হাসপাতালের পরিচালকের কাছে করোনা হাসপাতালের মেডিকেল বর্জ্য ওই প্ল্যান্টে পরিশোধনের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছিল, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি।’
প্ল্যান্ট থাকলেও ব্যবহার না করার কারণ জানতে চাইলে আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের উপ-পরিচালক এস এম মোর্শেদ বলেন, ‘দেশের দক্ষিণ অঞ্চলে শুধুমাত্র আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে এই মেশিনটি রয়েছে। অন্তত একজন দক্ষ টেকনিশিয়ানের অভাবে মেশিনটি দীর্ঘদিন পড়ে আছে। এ বিষয়ে আমরা একাধিকবার চিঠি দিলেও কোনো সুরাহা হয়নি।’
এ প্রসঙ্গে আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের পরিচালক ডা. মুন্সী মো. রেজা সেকেন্দার বলেন, ‘নতুন জনবল নিয়োগ অথবা হাসপাতালে থাকা কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্ল্যান্টটি সচল করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েছি। কিন্তু এখনো কোনো অগ্রগতি হয়নি। বাধ্য হয়ে জীবাণুমুক্ত না করেই হাসপাতালের বর্জ্য বাইরে ফেলতে হচ্ছে।’