কৃত্রিম সেতু প্রাণ রক্ষা করছে বন্যপ্রাণীদের: গবেষণা

বৈশ্বিক উন্নয়ন যেমন আমাদেরকে অনেক এগিয়ে নিয়ে গেছে, অন্যদিকে এই উন্নয়ন কিছু কিছু ক্ষেত্রে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের পরিবেশ এবং প্রতিবেশের জন্য। যোগাযোগ ও উন্নয়নের প্রয়োজনে অনেক বন ও উদ্যানের মধ্য দিয়েই সড়ক, রেলপথসহ বৈদ্যুতিক লাইনও টানা হয়েছে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা এবং বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া বন্যপ্রাণীদের জন্য প্রধান হুমকিগুলোর মধ্যে একটি।

এই একই চিত্র দেখা গেছে দেশের বিভিন্ন বনে। অসংখ্য বন্য প্রাণীর নির্মম মৃত্যু হচ্ছে সেখানে। এই দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করতে সম্প্রতি বনের মধ্যে কৃত্রিম সেতু নির্মাণ করেন একদল বন্যপ্রাণী গবেষক। তাদের দাবি, এতে করে বন্যপ্রাণীদের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানোর সংখ্যা কমাবে।

কৃত্রিম সেতু সম্পর্কে বন্যপ্রাণী গবেষক হাসান আল-রাজী বলেন, আমরা ২০১৫-২০১৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর সড়ক দুর্ঘটনা এবং বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাওয়ার তথ্য সংগ্রহ করি। নিজেদের সংগৃহীত তথ্য, সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন ও প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে আন্তর্জাতিক জার্নাল জুলজিয়াতে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করি।

তথ্যানুসারে, গত ২০১৫-২০১৭ সালে পর্যন্ত সাতছড়ি বনে বিভিন্ন প্রজাতির ১৪টি এবং লাউয়াছড়াতে ১৩টি বন্যপ্রাণী সড়ক দুর্ঘটনা এবং বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছে। এই মৃত্যুর তালিকায় লম্বালেজী হনুমানদের সংখ্যা সব থেকে এগিয়ে। আমাদের ধারণা, এই লম্বালেজ বিশিষ্ট হনুমানগুলো যখন তাদের চলাচলের জন্য বৈদ্যুতিক তার ব্যবহার করে তখন তাদের লেজ দুই তারের মাঝে পড়ে বৈদ্যুতিক সার্কিট পূরণ করে। যার ফলে তারা তড়িতাহত হয়ে মারা যায়।

এই সমস্যা কিছুটা সমাধানের লক্ষ্যে আমরা ‘Artificial Canopy Bridges For Conservation’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নেই। মূল গবেষক মার্জান মারিয়া ২০১৯ সালে এক্সপ্লোরার ক্লাব নামের আমেরিকান একটি সংস্থায় এই প্রকল্পের জন্য আবেদন করেন এবং কিছু আর্থিক সহযোগিতা পান। এছাড়াও যারা গবেষণা ও সংরক্ষণের কাজের জন্য ‘Plumplorise.V’ নামের একটি জার্মানভিত্তিক দাতা সংস্থাও সহযোগিতা প্রদান করে।

তিনি বলেন, এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো সাতছড়ি বনে রাস্তার পাশের গাছগুলোতে কৃত্রিম সেতু তৈরি করে সংযোগ করে দেয়া। যাতে তারা নিরাপদে রাস্তা পার হতে পারে। আমরা বন বিভাগের সহায়তায় সব থেকে ঝুঁকিপূর্ণ দুর্ঘটনা প্রবণ জায়গাগুলো চিহ্নিত করি ব্রিজ নির্মাণের জন্য। ২০২০ সালের ১ নভেম্বরে আমাদের ব্রিজগুলো স্থাপনের কাজ শেষ হয় এবং তিন মাস অপেক্ষা করি যাতে বন্যপ্রাণীরা ব্রিজটি ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়। প্রকল্পটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. সাবির বিন মুজাফফর এবং অক্সফোর্ড ব্রুক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আনা নেকারিস। এই কাজে সহযোগিতা করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ১৫তম আবর্তের ছাত্র আলী আকবর রাফি।

এ প্রসঙ্গে বন্যপ্রাণী গবেষক মার্জান মারিয়া বলেন, আমরা তিনমাস পরে আমাদের ব্রিজের একপাশে একটি করে ক্যামেরা ট্র্যাপ স্থাপন করি বন্যপ্রাণীর চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য। ইতিমধ্যেই আমরা আমাদের ক্যামেরা ট্র্যাপে বেশ কিছু বন্যপ্রাণীর চলাচলের ছবি পেয়েছি। যাদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির বানর, হনুমান এবং বিভিন্ন ইঁদুরগোত্রীয় প্রাণী।

আমাদের দেশে এমন আরও কিছু বন আছে যার ভেতর দিয়ে এমন মহাসড়ক এবং বৈদ্যুতিক তার গেছে। এই বনগুলোতেও যদি বনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন জায়গাগুলোতে এমন কৃত্রিম সেতু নির্মাণ করতে পারা যায় তবে হয়তো বা বন্যপ্রাণীর মৃত্যুর মিছিল কিছুটা হলেও কমাতে পারা যাবে, সাথে সাথে বাংলাদেশের জীববৈচিত্র রক্ষাও করতে পারব।