চট্টগ্রামে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের অধিকাংশই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বলে ধারণা করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এ কারণেই অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে কভিড রোগীর সংখ্যা। গত কয়েক দিন শনাক্তের হার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ থাকলেও সর্বশেষ গত রবিবার তা ৩৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।
গতকাল সোমবার সকালে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের করোনাসংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৬৩৮টি নমুনা পরীক্ষা করে ৫৫৯ জনের পজিটিভ পাওয়া গেছে। নমুনা পরীক্ষা অনুযায়ী সংক্রমণের হার ৩৪ দশমিক ১২ শতাংশ। অথচ গত বছর এপ্রিলে সংক্রমণ শুরুর পর ১৫ মাসের মধ্যে এক দিনে এত আক্রান্তের রেকর্ড নেই। এর আগে গত ৩০ জুন ৫৫২ জন শনাক্তের রেকর্ড ছিল।
চট্টগ্রামে গত রবিবার শনাক্তদের মধ্যে নগরীর ৪১৪ ও বিভিন্ন উপজেলার ১৪৫ জন। মৃত্যু হয়েছে পাঁচজনের। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ৫৫৯ জন করোনা আক্রান্তসহ এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬০ হাজার ৯২৭ জনে। এর আগে গত ৩ জুলাই নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত হয় ৩৬৯ জন, মৃত্যু ৬ জনের। ২ জুলাই শনাক্ত ২৬২, মৃত্যু ১ জনের। ১ জুলাই শনাক্ত ৪২১, মৃত্যু ৪। ৩০ জুন ৫৫২, মৃত্যু ৫। ২৯ জুলাই ৩৯৯, মৃত্যু ১০। ২৮ জুলাই ৩৬৮ জন শনাক্ত ও মৃত্যু ন্তৃয়ছে ৩ জনের। গত সাত দিনে মোট আক্রান্ত হয় চট্টগ্রামে ২ হাজার ৯২৯, মৃত্যু হয় ৩৮ জনের। আর জুলাই মাসের গত চার দিনে করোনা পজিটিভ আসে ১ হাজার ৬১১ জন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকসাস ডিজিসেস (বিআইটিআইডি)-এর ল্যাবপ্রধান ও অধ্যাপক ডা. শাকিল আহমেদ বলেন, ‘আমাদের ধারণা গত মাস থেকে আক্রান্ত ৮০% রোগীই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের। তাদের জ্বর ও শ্বাসকষ্টের উপসর্গ রয়েছে। তবে আগের মতো তীব্র জ¦র কিংবা ঘ্রাণ না পাওয়ার এমন উপসর্গ কম। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের কারণে সংক্রমণের তীব্রতা বেশি। এটি ব্রিটেনের আলফা স্ট্রেনের চেয়েও অনেক বেশি সংক্রামক।’
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চট্টগ্রামে গত জুন মাসে শনাক্ত হয় ৫ হাজার ২৫৯ জন। এর আগে মে মাসে শনাক্ত হয় ৩ হাজার ২৮০ জন।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও কভিড ফোকাল পারসন ডা. মো. আবদুর রব বলেন, ‘দ্রুত হারে সংক্রমণ হচ্ছে। এক দিনেই একই পরিবারের সবাই পজিটিভ হচ্ছে আবার হাসপাতালে এমন রোগীও পেয়েছি; যারা বাসা থেকে বের হয়নি। এসব রোগী পরিবারের সদস্যদের দ্বারা সংক্রমিত হয়েছে। তাই আমরা পরামর্শ দিচ্ছি অপ্রয়োজনে যাতে বাসা থেকে বের না হয়।’
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, চট্টগ্রামে ২০২০ সালের ৩ এপ্রিল দামপাড়ায় প্রথম রোগী শনাক্ত হয়। এরপর প্রতি মাসেই করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে। মোট শনাক্ত ৬০ হাজার ৯২৭ জনের মধ্যে নগরীর ৪৭ হাজার ৩৮১ ও উপজেলার ১৩ হাজার ৫৪৬ জন।
সংক্রমণ বাড়ায় প্রভাব পড়েছে বন্দর নগরীর সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালে। বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে রোগীরা ভর্তি হচ্ছে হাসপাতালে। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট অন্য সব ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে অনেক বেশি সংক্রামক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা।
চট্টগ্রামের সাবেক সিভিল সার্জন মুক্তিযোদ্ধা ডা. সরফরাজ খান চৌধুরী বলেন, ‘ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি করে। এটি দ্রুত সংক্রমণ ছড়ায়। অযথা বাইরে ঘোরাফেরার কারণে যুবকরা বেশি আক্রান্ত হয়েছে, তাদের সংস্পর্শে এসে বয়স্করা সংক্রমিত হয়েছে।’
সার্বিক বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘সংক্রমণের হার ব্যাপকভাবে বাড়ছে। বিভিন্ন গবেষণায় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের কারণে কমিউনিটি সংক্রমণ শুরু হয়েছে জানিয়েছেন গবেষকরা। চট্টগ্রামের বর্তমান সংক্রমণ পরিস্থিতিও এমন বার্তা দিচ্ছে।’