মানুষের নির্যাতনে খানজাহান মাজারের কুমির অসুস্থ

বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হযরত খানজাহান (রহ.) মাজারের দীঘির মিষ্টি পানির একটি পুরুষ কুমির অসুস্থ হয়ে পড়েছে। মাজারের দায়িত্বে থাকা খাদেমদের নির্যাতনে কুমিরটি অসুস্থ হয়ে পড়েছে বলে এক পক্ষ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে।

কুমিরটি যে মানুষের আঘাতে অসুস্থ হয়ে পড়েছে তা নিশ্চিত করেছেন চিকিৎসক সংশ্লিষ্টরা। প্রাণিসম্পদ ও বনবিভাগ অসুস্থ কুমিরটিকে দীঘি থেকে তুলে চিকিৎসা দেয়া শুরু করেছে।

হযরত খানজাহানের আমলে ছাড়া সব শেষ বংশধর ছিল ধলাপাহাড়। ২০১৩ সালে বয়সজনিত কারণে ধলাপাহাড়ের মৃত্যু হয়। মিঠা পানির কুমিরের বিলুপ্তি ঠেকাতে প্রায় সাড়ে ছয়শ বছরের পুরনো হযরত খানজাহান (রহ.) মাজারের দীঘির মিঠা পানি প্রজাতির কুমিরের বংশ রক্ষায় ২০০৪ সালে ভারতের মাদ্রাজের ক্রোকোডাইল ব্যাংক থেকে মোট পাঁচটি কুমির এনে এই দীঘিতে ছাড়া হয়। এর মধ্যে বর্তমানে একটি মেয়ে ও একটি পুরুষ কুমির রয়েছে।

মাজারের প্রধান খাদেম শের আলী ফকির অভিযোগ করেন, দেশ-বিদেশের খানজাহানের (অলি) যারা ভক্ত আছেন তারা এই মাজারের কুমির দেখতে আসেন। কুমিরের উপর যারা আঘাত করে তারা আমার বুকে আঘাত করছে। একটি পক্ষ কুমির একপাড়ে আটকে রাখে দর্শনার্থীদের দেখিয়ে ক্ষতি করছে। দীঘিতে কুমির থাকবে উন্মুক্ত পরিবেশে, দীঘিতে ঘুরে বেড়াবে খাদেমরা নাম ধরে ডাক দিলে ঘাটে আসবে মুরগি ও খাসির মাংস খাবে।

প্রতিপক্ষের নাম উল্লেখ না করে খাদেম আরও বলেন, এই দীঘির কুমির যেন আটকে না রাখে, কুমির দেখাবে মাজারের খাদেমরা, বাইরের কেউ সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দর্শনার্থীদের কুমির দেখাবে তা খাদেমরা মেনে নেবে না। এই কুমির যারা আটকে রাখে এবং কুমিরের উপর যারা আঘাত করে প্রশাসনের কাছে আমি তাদের বিচার দাবি করছি।

প্রতিপক্ষ বিনা বেগম অভিযোগ অস্বীকার করে খাদেমদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, এই খাজা খানজাহানের দীঘিতে প্রভাবশালী খাদেমরা অবৈধভাবে  জাল পেতে  মাছ শিকার করে থাকে। কোনো ঘাটে কুমির আটকে রেখে কেউ টাকা কামাই করে না। বরং মাজারের খাদেমরা এখানে আসা দর্শনার্থীদের কুমির দেখিয়ে দর্শনার্থীদের মানত করা মুরগি কুমিরকে খেতে না দিয়ে তা ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

তিনি বলেন, দীঘির সব এলাকায় এতো বেশি জাল পেতে রাখা হয় তাতে কুমির দীঘিতে ভাসতেই পারে না। কুমিরের উপর নির্যাতন করা হয়। সাইবোর্ড টাঙিয়ে কেউ কুমিরকে আটকে রাখে না। কুমির দীঘির যেসব ঘাটে অবস্থান করে এখানে আসা দর্শনার্থীরা সেসব ঘাটে দেখতে এসে খুশি হয়ে ৫/১০ টাকা করে দেয়। জোর করে কারও কাছ থেকে টাকা নেয়া হয় না।

এই দীঘিতে কুমির না থাকলে ঐতিহ্যই নষ্ট হয়ে যাবে। এই দীঘিতে অবৈধভাবে জাল পেতে মাছ শিকার বন্ধ করতে প্রশাসনের কাছে দাবি জানান বিনা বেগম।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের করমজল কুমির প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজাদ কবির বলেন, জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মাজারের কুমিরের অসুস্থতার খবর পেয়ে এখানে আসি। স্থানীয়দের সহযোগিতা নিয়ে কুমিরটি পানি থেকে উপরে তোলা হয়। কুমিরটির ডান চোখ বেশকিছু দিন আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। বাম চোখটিও মেলতে পারছে না। এই চোখটি ভালো আছে কিনা তা এখনই বলা সম্ভব হচ্ছে না। তবে তার চোখ যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা তার চলাফেরা আচরণে বোঝা যাচ্ছে।

ইতিমধ্যে তার চিকিৎসা শুরু করা হয়েছে। কুমিরটিকে উপরে রেখে কয়েকদিন পর্যবেক্ষণ করা হবে। কুমিরটির সুচিকিৎসার জন্য যা যা করা প্রয়োজন তা আমরা করব।

কুমিরটির অসুস্থতার কারণ কি জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, তার অসুস্থতা স্বাভাবিকভাবে হয়নি। কুমির যদি কাউকে আক্রমণ করে তাহলে চোখে আঙুল দিলে সে দুর্বল হয়ে পড়ে আক্রমণকারীকে ছেড়ে দেয়। এই ধরনের হস্তক্ষেপে কুমিরটি আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে থাকতে পারে। দীঘিতে পেতে রাখা জালে বেঁধে বা মানুষের আঘাতে কুমিরের চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে কুমির নিয়ে তার কাজ করার অভিজ্ঞতায় তিনি এমনটিই ধারণা করছেন।

বাগেরহাট প্রাণিসম্পদ বিভাগের জেলা কর্মকর্তা ডা. লুৎফর রহমান বলেন, খেতে না পারার কারণে কুমিরটি শারীরিকভাবে খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার শরীরিক দুর্বলতা দূর করতে ইতিমধ্যে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। বেশ আগে থেকেই কুমিরটির ডান চোখ নষ্ট আছে। বাম চোখটাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চোখটা না মেলার কারণে তা পরীক্ষা করা যায়নি। তার চিকিৎসার জন্য নিরাপদ স্থানে রেখে তাকে খাবার দেয়া হবে। তার বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরেই জানা যাবে কি কারণে কুমিরটি অসুস্থ হয়েছে।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বলেন, বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হযরত খানজাহান (রহ.) মাজারের দীঘিতে বর্তমানে দুটি কুমির রয়েছে। প্রায় ১৫ দিন আগে একটি পুরুষ কুমির অসুস্থ হয়ে পড়ে। কুমিরটি আগে সুস্থ হোক। কুমিরের অসুস্থতার প্রকৃত কারণ জানার পরে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।