কোনো পলিটিক্যাল স্টেটমেন্ট দেওয়ার জন্য সিনেমাটি বানাইনি: সাদ

কান উৎসবের ‘আঁ সাতের্ঁ রিগা’ বিভাগে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’এর অফিসিয়াল সিলেকশনের তথ্য প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই গণমাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছিল না পরিচালক আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদকে। অবশেষে আড়াল ভেঙে সামনে এলেন এই নির্মাতা । ৭ জুলাই কান উৎসবে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ এর উদ্বোধনী প্রদর্শনীর দিনে আড়াল ভেঙে সামনে আসেন তিনি। পরবর্তীতে ফ্রান্সের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে সিনেমাটি নিয়ে কথা বলেন সাদ। শুক্রবার এই নির্মাতাকে ডয়েচে বাংলার ভিডিও সাক্ষাৎকারেও কথা বলতে দেখা যায়। সেই সাক্ষাৎকারে নানা প্রশ্নের জবাব দেন সাদ।

শুরুতেই তাকে প্রশ্ন করা হয় ‘আপনি কেন গণমাধ্যমের সামনে কথা বলেন না?’ জবাবে সাদ বলেন, ‘এমনিতে আমার জন্য অ্যাটেনশন হ্যান্ডেল করা একটু ডিফিকাল্ট, কারণ আমি অস্বস্তি বোধ করি। আমার কাছে মনে হয় অ্যাটেনশন পাওয়া উচিত আমাদের ছবিটার, যেখানে আমাদের পুরা টিম কাজ করেছে, এতটা কষ্ট করেছে। সো, অ্যাটেনশন ছবিটা পাইলে আমার বেশি ভালো লাগে কারণ আমার একটু ইনভিজিবল থাকতেই ভালো লাগে।’

কানে যাওয়ার অনুভূতি জানিয়ে সাদ বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই উদ্বিগ্ন ছিলাম। স্পেশালি সিনেমাটির স্ত্রিনিং পর্যন্ত। শুধু আমি না, আমরা পুরো টিমই উদ্বিগ্ন ছিলাম, স্ট্রেসফুল ছিলাম মানুষ কীভাবে রেসপন্স করবে সেটা ভেবে। সো, এরপর যেটা ঘটলো সেটা তো আসলে ইনক্রেডিবল। মানে এটা যে চাওয়া যাইতে পারে বা এমন রেসপন্স পেতে পারে সেটাই আমি কখনো চিন্তা করিনি। আমার কাছে ছবিটির ডিসেন্ট একটা স্ত্রিনিং হলেই খুশি হয়ে বাড়ি ফিরে যেতাম। যেটা হইসে সেটা ওভার ওয়েলমিং ছিল যে আমি সেটা এখনো বোঝার চেষ্টা করসি। সবাইতো বাঁধনকে দেখেছেনই, সো আমার মনে হয় ওর জন্য ক্যাথারটিক ছিল ফুল জার্নিটা।’

গল্প লেখার সময় দর্শকের প্রতিক্রিয়া ভেবেছেন কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে সাদ বলেন, ‘আমি যেভাবে দেখেছি আমি সেভাবেই ওকে পোট্রে করেছি। সে ক্ষেত্রে আসলে কীভাবে পোর্ট্রে করলে এটা অডিয়েন্সের কাছে কি ইমপ্যাক্ট ক্রিয়েট করবে সেই ক্যালকুলেশন করে আসলে লেখা হয়নি। ওভাবে আমি কখনো এপ্রোচও করিনা আমার কোন গল্প কিংবা ক্যারেক্টারকে। ছোটবেলা থেকেই অনেককে দেখসি স্কার্ফ পরতে এমনকি আজান দিলে আপুদেরকে মাথা কাপড় কিংবা স্কার্ফ দিতে সো এসব ছোট খাটো ডিটেইল আসলে লাইফ থেকেই নেওয়া।’

এদিকে ছবিটিতে রেহানা ব্যতিত অন্য চরিত্রগুলোকে কম গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যেহেতু ছবিটির কাহিনি সিঙ্গেল একটি ক্যারেক্টারকে কেন্দ্র করে এবং রেহানার চোখ থেকেই দেখা সে ক্ষেত্রে আমার চেষ্টা ছিল ওর পয়েন্ট অব ভিউ থেকেই পুরো কাহিনিকে তুলে ধরা। আমি সে চেষ্টাই করেছি। অনেকের কাছে সেটা সফল মনে হতে পারে আবার অনেকের কাছে নাও মনে হতে পারে।’

সিনেমাটির গল্প কোন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে সাদ বলেন, ‘আমি যেহেতু কোন পলিটিক্যাল ফিল্ম মেইক করিনা সে ক্ষেত্রে আমি ডেফিনেটলি আমি কোন পলিটিক্যাল স্টেটমেন্ট দেওয়ার জন্য এই সিনেমাটি বানাইনি। আমি খুবই ক্যারেক্টার রিভেইন। আমি রেহানাকে ফলো করতেছিলাম সো ওকে পুশ করতে যেয়ে, ওকে বিভিন্ন সিচুয়েশনে প্লেস করতে যেয়ে আমার যেই কোশ্চেনগুলো এড্রেস করা উচিত আমার মনে হয় আমি সেগুলোই করেছি। আমার মনে ফিল্মটি তখনই সাক্সেসফুল হবে যখন এটা থেকে মানুষ ভাবতে শুরু করবে। ফাইনালি আমার মনে হয় এই ফিল্ম কোশ্চেনগুলোই এর আউট কাম হবে র‍্যাদার দেন এর অ্যান্সার।

পুরো সিনেমায় নীল রংয়ের ছোঁয়া থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন ফার্স্ট টাইম কালার স্ক্রিন নিয়ে কথা বলতেছিলাম তখন আমার অবজেক্টিভ ছিল কী ধরনের কালার স্ক্রিন কিংবা কী কালার প্যালেট করলে আমরা রিয়েলি রেহানার ইনার টার্মালটা ক্যাপচার করতে পারবো। ওর ভেতরকার অ্যাঙ্গার, ওর ভেতরকার কনফ্লিক্টগুলো, ওর ক্যারেক্টারের পুরোটা কীভাবে অনেক ফ্ল্যাশব্যাক না দিয়ে কিংবা অনেক ইনফরমেশন না দিয়েও অডিয়েন্সের কাছে ওই ফিলিংটা পর্দায় তুলে ধরতে পারবো। একটা পর্যায়ে আমরা ফিল করি এই কালারটি দ্বারাই আমরা ছবিটির আসল এটমসফিয়ার পর্দায় তুলে ধরতে পারবো।

 

ছবিটা কেন দেখা উচিত? জানতে চাইলে সাদ বলেন, ‘কেন দেখতে হবে কিংবা কেন দেখা উচিত সেটা আমরা বলতে পারবো না। ওটা আমাদের কাজও না। আমাদের কাজ ছিল আমাদের বেস্ট এফোর্ড দিয়ে ছবিটা তৈরী করার, আমরা সেটাই করেছি। এরপর বাকিটা আশা করতে পারি, আমি আশা করি আমাদের অডিয়েন্সরা আসবে, ট্রাই করবে, ছবিটাকে চান্স দিবে, এটাই আশা করি।’

সবশেষে সিনেমাটি নিয়ে সাদের প্রত্যাশার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেটা পেয়েছি সেটা অনেক বেশি হয়ে গেছে আমার জন্য। আমার ধারণা, ওটা ডিল করতেও টাইম লাগবে আমার। অনেস্টলি যদি বলি, আমি এখন চিটাগাং ব্যাক করতে চাই। আমার জন্য এটা অলরেডি ঠু মাচ। কিন্তু, মানুষ তো পাইলে আরো পাইতে চায়। সে ক্ষেত্রে অ্যাওয়ার্ড পেলে ডেফিনেটলি আমার ভালো লাগবে।’

উল্লেখ্য, কানের ডবসি থিয়েটারে বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ১৫ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় ৩টা ১৫ মিনিট) ছবিটির প্রদর্শনী শুরু হয়। প্রায় পৌনে ২ঘন্টা ব্যাপ্তির এই সিনেমাটির শুরু থেকে শেষ অবধি হল ভর্তি দর্শক দেখেছেন পিনপতন নীরবতায়। ছবিটি শেষ হওয়ার পর দর্শক দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করেন এবং হাত তালিতে মুখরিত করেন ডবসি থিয়েটার। এ সময় সেখানে উপস্থিত ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ এর টিম আবেগে ভাসেন।

একটি বেসরকারি কলেজের ৩৭ বছর বয়সী শিক্ষক রেহানা মরিয়ম নূরকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশি চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্য তৈরি হয়েছে। যেখানে রেহানা একজন মা, মেয়ে, বোন ও শিক্ষক হিসেবে কঠিন জীবনযাপনে অভ্যস্ত। তিনি এক সন্ধ্যায় কলেজ থেকে বেরোনোর সময় অপ্রত্যাশিত ঘটনার সাক্ষী হন।

এরপর থেকে সে তার মেডিকেল কলেজের ছাত্রীর পক্ষ হয়ে সহকর্মী অপর শিক্ষকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ঘটনার প্রতিবাদ জানান। আর এ প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে তিনি ক্রমেই একরোখা হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে একই সময়ে রেহানা ৬ বছর বয়সী কন্যার সঙ্গে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রূঢ় আচরণ করেন। এমন অবস্থায় অনড় রেহানা বিদ্যালয়ের তথাকথিত নিয়মের বাইরে থেকে নিজ সন্তান ও ওই ছাত্রীর জন্য ন্যায়বিচারের খোঁজ করতে থাকেন।

‘রেহানা মরিয়ম নূর’-এর নাম ভূমিকায় আছেন আজমেরী হক বাঁধন। আরও অভিনয় করেছেন আফিয়া জাহিন জাইমা, কাজী সামি হাসান, আফিয়া তাবাসসুম বর্ণ, ইয়াছির আল হক ও সাবেরী আলম।