সেঞ্চুরিতে সব চাপ উড়িয়ে দিলেন লিটন

অভিজ্ঞদের বাইরে বাংলাদেশের ক্রিকেটে তরুণদের এগিয়ে আসার দাবি অনেক দিনের। এদের মধ্যে যে কজন আছেন, ৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে খেলা লিটন দাশ তাদের একজন। কিন্তু সেই লিটন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ঘরের মাঠে সর্বশেষ ওয়ানডে সিরিজের শেষ ম্যাচে দলে জায়গা হারান। ২০২০-এ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিলেটে ক্যারিয়ারসেরা ১৭৬, এরপর ৮ ইনিংসে ২৫-এর বেশি রান নেই তার ব্যাটে। শূন্য মেরেছেন তিনটি। এমন বাজে অবস্থায় পড়া লিটন সেই জিম্বাবুয়েকে পেয়েই রানে ফিরলেন। প্রবল চাপ ঝেড়ে ফেললেন সেঞ্চুরি দিয়ে। ক্যারিয়ারের চতুর্থ সেঞ্চুরিতে হারারেতে কঠিন এক দিনে বাংলাদেশ দলকে উদ্ধার করলেন দারুণভাবে। তার সেঞ্চুরির সুবাদেই ১৯তম ওভারে ৭৪ রানে ৪ উইকেট হারানো বাংলাদেশ ইনিংস শেষ করে ৯ উইকেটে ২৭৬ রানে। যা হারারেতে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ।

লিটন দাশের এটি চতুর্থ ওয়ানডে সেঞ্চুরি। তিনটিই জিম্বাবুয়ের সঙ্গে। ২০২০-এর সিরিজেই তিন ম্যাচে দুটি সেঞ্চুরি করেছিলেন। এরপর গতকাল হারারেতে। ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি করেছিলেন ভারতের সঙ্গে ২০১৮ এশিয়া কাপে দুবাইয়ে। প্রতিপক্ষ হিসেবে জিম্বাবুয়েকেই সবচেয়ে পছন্দ লিটনের। ক্যারিয়ারজুড়ে সবচেয়ে বেশি রান করেছেন এই প্রতিপক্ষের সঙ্গেই। ৪৫ ম্যাচে ১২৮২ রানের প্রায় অর্ধেক। সবচেয়ে বেশি ১০ ম্যাচ খেলে জিম্বাবুয়ানদের বিপক্ষে ৫২৬ রান করেছেন ৫৮ গড়ে। দ্বিতীয় সেরা ভারতের সঙ্গে ৬ ম্যাচে ২২৮, ৩৮ গড়ে। আর উইন্ডিজের সঙ্গে ৭ ম্যাচে ২০২ করেছেন ৩৪ গড়ে।

লিটনের দিনের শুরুটা কিন্তু ‘লিটন’স্বরূপ ছিল না। ক্যারিয়ারে কখনই এত ধীর শুরু করেননি এই ওপেনার। রান পাচ্ছিলেন না বলেই হয়ত রয়ে-সয়ে খেলছিলেন। তার সবচেয়ে বেশি বলের হাফসেঞ্চুরি এলো এদিন, ৭৮ বলে। অবশ্য পরের ৩৬ বলে চেনা লিটন ফিরেছিলেন। এর আগে মাত্র একবারই ফিফটি করতে পঞ্চাশের বেশি বল খেলেছিলেন। সেটাও জিম্বাবুয়ের সঙ্গে, ৫৪ বল। অবশ্য ইনিংস এগিয়ে নেওয়ার সঙ্গে রান-বলের সমীকরণটা কমিয়ে আনেন নিজের স্বভাবসুলভ ইনিংস দিয়েই। তার সেঞ্চুরিতেই জয়ের সংগ্রহ পেয়ে যায় বাংলাদেশ।

কিন্তু দিনের শুরুতে হারারের উইকেট বেশ কঠিন ছিল। রান তোলা সহজ তো ছিলই না জিম্বাবুয়ে পেসাররাও সুইং ও বাউন্স পাচ্ছিলেন উইকেট থেকে। তাই প্রথম ২ ওভারে কোনো রানই পায়নি সফরকারীরা। আগের দিন তামিম বলেছিলেন ব্যাটিং প্রথম ঘণ্টা দেখে খেলার কথা। কিন্তু সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশ টপঅর্ডার ব্যর্থ। তামিম নিজেই ফিরলেন ০-তে। তৃতীয় ওভারের প্রথম বলে ব্লেসিং মুজারাবানির এক্সট্রা বাউন্সি বল কাট করতে গিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন। ক্রিজে আসা সাকিব শুরুটা করেছিলেন প্রথম বলেই স্ট্রেট ড্রাইভে চার দিয়ে। এরপর আরও দুটি চার পেয়েছেন আত্মবিশ্বাসী শটেই। সেই আত্মবিশ্বাস থেকেই কিনা বাড়তি অভিলাষে শট খেলতে থাকেন বেশি। তাই কভারে মাত্র ১৯ করেই ক্যাচ আউট হন। মুশফিকুর রহিমের জায়গা চারে খেলতে নেমে মোহাম্মদ মিঠুনও ভালো শুরু পান। জিম্বাবুয়ান পেসারদের অফস্টাম্পের বাইরের বলগুলোয় দারুণ সব স্কয়ার শটে চারটি চার তুলে নেন। কিন্তু ওই বাইরের বল তাড়া করতে গিয়েই ১৯ বলে ১৯ করে কিপারের কাছে ক্যাচ দেন। ঠিক একইভাবে অফস্টাম্পের অনেক বাইরের বল তাড়া করতে গিয়ে কটবিহাইন্ড হয়ে ফেরেন ৫ রান করা মোসাদ্দেক।

দলের ৪ উইকেটে ৭৪ রান থেকে ফিরে আসা শুরু করেন লিটন-মাহমুদউল্লাহ। যেন কদিন আগের হারারে টেস্টের প্রথম ইনিংসের পুনরাবৃত্তি। দুজনে পঞ্চম উইকেট জুটিতে ১০৩ বলে যোগ করেন ৯৩ রান। জুটির শুরুটা ধীরে হলেও সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রান তুলছিলেন দুই ব্যাটসম্যান। ৩৬তম ওভারে মাহমুদউল্লাহ জঙ্গুইয়ের স্লো বাউন্সি বল তাড়া করে মারতে গিয়ে ৫২ বলে ৩৩ করে কট বিহাইন্ড হয়ে ফেরেন। তার আগে ৫ ওভারে ৪০ রান তোলেন দুজনে। আফিফকে সঙ্গে নিয়ে রান তোলার গতিটা ধরে রাখেন লিটন। পরের ৫ ওভারে তোলেন ৩৪ রানের মতো। এর মধ্যে সেঞ্চুরিও পূর্ণ করেন। কিন্তু সেঞ্চুরির পরপরই বাঁহাতি পেসার এনগারাভাকে তুলে মারতে গিয়ে মিস টাইম হওয়ায় ক্যাচ আউট হন ১০২ রান। লিটন ফিরলেও আফিফ কাজের কাজ করে দেন। মেহেদী হাসান মিরাজকে নিয়ে ৫৮ রানের জুটি গড়েন মাত্র ৭ ওভারে। ৩৫ বলে ২ ছক্কা ও ১ চারে ৪৫ করেন আফিফ, মিরাজ ১টি করে ছক্কা ও চারে করেন ২৫ বলে ২৬। তাতেই জয়ের সংগ্রহ পায় বাংলাদেশ।

শূন্যে শীর্ষে তামিম ইকবাল

বাংলাদেশ ক্রিকেটে রানের হিসাবটা তামিম ইকবালকে দিয়েই শুরু। টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি সব ফরম্যাটেই তার রান সর্বোচ্চ। সব মিলিয়ে ১৪০২৩ রান এই ওপেনারের। রানের শীর্ষস্থানটা তামিমকে অবশ্যই গৌরব এনে দেয়। কিন্তু রেকর্ডের খেলায় লজ্জার রেকর্ডও যে আছে তামিমের। গৌরবের রেকর্ডের সঙ্গে তামিমকে এখনো লজ্জার রেকর্ডেও শীর্ষে থাকতে হবে। বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশিবার শূন্য রানে আউটের শিকার এখন তামিম। হারারেতে সিরিজের প্রথম ম্যাচে শূন্য রানে ফিরে এই রেকর্ডে হাবিবুল বাশারকে পেছনে ফেলেছেন তিনি। সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের ১৮টি শূন্য ছিল ওয়ানডেতে। তামিমের এখন ১৯টি। মোট ১৫টি করে শূন্য নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা ও মোহাম্মদ রফিক। তিন সংস্করণ মিলিয়ে শূন্য’র দিক থেকেও শীর্ষে এখন তামিম। ৩৩ বার শূন্যতে আউট হওয়া মাশরাফীকে পেছনে ফেলেছেন তামিম (৩৪টি)।