নেত্রকোনায় আখলাকুল হোসাইন আহমেদ স্মৃতি গ্রন্থাগারের যাত্রা শুরু

নেত্রকোনায় ভার্চুয়াল আলোচনা সভা ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করল গণপরিষদ সদস্য, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ডা. আখলাকুল হোসাইন আহমেদ স্মৃতিগ্রন্থাগার।

রবিবার সকাল থেকে দুপুর অবধি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম জুমে চলে এই উদ্বোধনী আয়োজন। এতে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বক্তারা যুক্ত হন। এ ছাড়া অনলাইনে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার অন্তত দেড় শতাধিক মানুষ যুক্ত ছিলেন।

গ্রন্থাগারের উদ্বোধন করের কবি নির্মলেন্দু গুণ। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, বর্তমানে ইন্টারনেটের সঙ্গে অনেকেই যুক্ত। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ইন্টারনেটের মাধ্যমে আরও বেশি কাজ করছেন। আমি নিজেও ইন্টারনেটের সুবিধাভোগী। ইন্টারনেটের অবাধ বিস্তার আছে বলে যে লাইব্রেরির আবেদন শেষ হয়ে যাবে তা নয়। পশ্চিমা দেশগুলোতেও কিন্তু প্রতিনিয়ত বই প্রকাশ হচ্ছে, বিপণন হচ্ছে এবং সংরক্ষণ হচ্ছে। ইন্টারনেটের ব্যবহার কিছুটা কমিয়ে লাইব্রেরি মুখী হতে হবে। ইন্টারনেটকে চ্যালেঞ্জ করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

নির্মলেন্দু গুণ বলেন, মানুষের কাছে বই পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষকদেরও লাইব্রেরিমুখী হওয়া দরকার। শিক্ষকরা লাইব্রেরিতে গেলে শিক্ষার্থীরা উৎসাহী হয়।

তিনি বলেন, আজকাল দেখি শিক্ষকদের পড়ার অভ্যাস নেই। অনেকে মনে করেন বই পড়ে চাকরি পেয়ে গেলে আর বুঝি পড়তে হয় না। ব্যাপারটা তা নয়। নিজে সমৃদ্ধ না হলে সুন্দর পাঠদান সম্ভব হয় না। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করব শিক্ষকদের পাঠাভ্যাসের বিষয়টি লক্ষ্য করার জন্য। শিক্ষকদের পাঠদান ও পাঠাভ্যাস মনিটরিং করার ব্যবস্থা থাকলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে।

আখলাকুল হোসাইন আহমেদ সম্পর্কে তিনি বলেন, আখলাকুল হোসাইন আহমেদ হাওর অঞ্চলের একজন গুণী মানুষ ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। মহেশখালী পার হয়ে ভারতের দুর্গম এলাকা লেঙ্গুরা, রংড়া অঞ্চলে শরণার্থী হয়ে আমি গিয়েছিলাম। দেখেছি, তিনি কীভাবে মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করার জন্য কাজ করেছেন। যদিও আমি তখন তরুণ। আমি কোনো দলের নেতা ছিলাম না বলে সেভাবে পরিচয় হয়নি।

নির্মলেন্দু গুণ বলেন, লাইব্রেরিটির প্রতিষ্ঠাতা আখলাকুল হোসাইন আহমেদের সুযোগ্য সন্তান বিমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান সাজ্জাদুল হাসান। তার শিক্ষানুরাগী বাবার স্বপ্ন বাস্তবায়নে শহীদ স্মৃতি কলেজ ও কলেজ অভ্যন্তরে সুসজ্জিত লাইব্রেরিটি করেছেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. লুৎফর হাসান বলেন, বই পড়া একটা অভ্যাসের ব্যাপার। এটা দিনকে দিন কমে যাচ্ছে। কেন কমে যাচ্ছে তা চিহ্নিত করে কাজ করতে হবে। এই দৃষ্টি নন্দন গ্রন্থাগারটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এ সময় তিনি আখলাকুল হোসাইন আহমেদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন এবং পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরন্তর শিক্ষা, সংস্কৃতি ও এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করার জন্য সাজ্জাদুল হাসানকে ধন্যবাদ জানান।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, স্থানীয়ভাবে কাজ করে বৈশ্বিকভাবে চিন্তা করা সহজ ব্যাপার নয়। সাজ্জাদুল হাসান পিতার মতোই কাজটি করে যাচ্ছেন। এই কাজ আরও প্রসারিত হোক।

গ্রন্থাগারের প্রতিষ্ঠাতা সাজ্জাদুল হাসান বলেন, বাবার স্বপ্ন ছিল এলাকায় একটি কলেজ করা। তিনি তা করে যেতে পারেননি। তাই আমি এলাকার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে মোহনগঞ্জ উপজেলার আদর্শনগরে সরকারি সহায়তায় শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয় স্থাপন করেছি। সেই মহাবিদ্যালয়েই লাইব্রেরিটি করা হয়েছে। যার নাম দিয়েছি আখলাকুল হোসাইন আহমেদ স্মৃতি গ্রন্থাগার। তিনি জানান, লাইব্রেরিটিতে ৫ হাজার বই রাখার ব্যবস্থা আছে। ইতিমধ্যে বিষয় ভিত্তিক ১২ শত বই আছে। একজন লাইব্রেরিয়ান একটি সফটওয়্যার দিয়ে লাইব্রেরির পুরো কার্যক্রম যেন চালাতে পারেন সে ব্যবস্থা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু কর্নারসহ বিষয় ভিত্তিক কর্নার থেকে বই সংগ্রহ করে সুন্দর পরিবেশে বই পড়ার সুযোগ আছে। এ সময় তিনি সারা দেশ তথা ময়মনসিংহ অঞ্চলের লাইব্রেরির ইতিহাস ও এর প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে বক্তব্য দেন।

শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়ের গভর্নিং বডির সভাপতি ও নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক কাজী মো. আবদুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন চিন্ময় চক্রবর্তী ও নাজনীন সুলতানা।