করোনা মহামারীর মাঝেও দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর রাজস্ব আহরণে তাদের প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। সদ্য সমাপ্তকৃত ২০২০-২১ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার অধিক ৮৬ কোটি ৯৭ লাখ ৩২ হাজার টাকা বাড়তি রাজস্ব আহরণ করেছে।
এ সময়ে বন্দর থেকে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল ৩১২ কোটি ২৯ লাখ টাকা। আর বছর শেষে আহরণ হয়েছে ৩৯৯ কোটি ২৬ লাখ ৩২ হাজার টাকা।
তবে বন্দরের অবকাঠামোসহ বিদ্যমান কিছু জটিলতা নিরসন করা হলে আরও বাড়তি রাজস্ব আহরণ সম্ভব বলে জানিয়েছেন বন্দরের ব্যবসায়ীরা।
হিলি স্থল শুল্ক স্টেশন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে হিলি স্থলবন্দর থেকে ৩১২ কোটি ২৯ লাখ টকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
সে হিসাব মোতাবেক অর্থবছরের প্রথম জুলাই মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এর বিপরীতে মাস শেষে আহরণ হয়েছে ৪৩ কোটি ২৮ লাখ ৫২ হাজার টাকা।
আগস্ট মাসে ১৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাস শেষে আহরণ হয়েছে ২০ কোটি ৮৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
সেপ্টেম্বর মাসে ৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাস শেষে আহরণ হয়েছে ২০ কোটি ৬৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা।
অক্টোবর মাসে ১৮ কোটি ১০ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাস শেষে আহরণ হয়েছে ১৮ কোটি ৬৮ লাখ ২২ হাজার টাকা।
নভেম্বর মাসে ৩১ কোটি ৯ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাস শেষে আহরণ হয়েছে ২৬ কোটি ৬০ লাখ ৪৩ হাজার টাকা।
ডিসেম্বর মাসে ৫১ কোটি ১৬ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাস শেষে আহরণ হয়েছে ২২ কোটি ২১ লাখ এক হাজার টাকা।
জানুয়ারি মাসে ২৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাস শেষে আহরণ হয়েছে ২০ কোটি ৮১ লাখ ৩৯ হাজার টাকা।
ফেব্রুয়ারি মাসে ২৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাস শেষে আহরণ হয়েছে ৪৭ কোটি ১৯ লাখ ৩৭ হাজার টাকা।
মার্চ মাসে ২৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাস শেষে আহরণ হয়েছে ৬১ কোটি ৩৪ লাখ ২১ হাজার টাকা। এপ্রিল মাসে ৩১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাস শেষে আহরণ হয়েছে ৬৮ কোটি ৬২ লাখ ৯ হাজার টাকা।
মে মাসে ৩২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাস শেষে আহরণ হয়েছে ২০ কোটি ২৩ লাখ ৩৬ হাজার টাকা।
জুন মাসে ৩৬ কোটি ১ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাস শেষে আহরণ হয়েছে ২৮ কোটি ৭৭ লাখ ৯৭ হাজার টাকা।
এতে সদ্য সমাপ্তকৃত ২০২০-২১ অর্থবছরে রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩১২ কোটি ২৯ লাখ টাকা, বছর শেষে এর বিপরীতে আহরণ হয়েছে ৩৯৯ কোটি ২৬ লাখ ৩২ হাজার টাকা। এতে করে লক্ষ্যমাত্রার অধিক ৮৬ কোটি ৯৭ লাখ ৩২ হাজার টাকা রাজস্ব আহরণ হয়েছে।
এর আগের ২০১৯-২০ অর্থবছরে হিলি স্থলবন্দর থেকে রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৭১ কোটি ৬১ লাখ টাকা এর বিপরীতে বছর শেষে আহরণ হয়েছিল ১৮৯ কোটি ৮৪ লাখ ১৬ হাজার টাকা। এতে করে ওই সময় ৮১ কোটি ৭৬ লাখ ৮৪ হাজার টাকা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম রাজস্ব আহরণ হয়েছিল।
হিলি স্থলবন্দর আমদানি রপ্তানিকারক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা মনে করেছিলাম করোনার কারণে হয়তো বা ব্যবসাবাণিজ্য স্থবির হওয়ার কারণে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত নাও হতে পারে। কিন্তু চালের আমদানি শুল্ক কমানোর ফলে গত জানুয়ারি মাস থেকে বন্দর দিয়ে যে পরিমাণ চাল আমদানি হয়েছে একমাত্র এর কারণেই রাজস্ব আহরণ বেড়েছে।
এছাড়া বন্দর দিয়ে অন্যান্য পণ্যের সাথে বছরজুড়ে পাথর আমদানি অব্যাহত ছিল যার কারণেই এই বাড়তি রাজস্ব আহরণ সম্ভব হয়েছে। তবে শূন্যরেখা থেকে শুরু করে বন্দরের গেট পর্যন্ত সড়কটি খারাপ হওয়ায় বন্দর দিয়ে আমদানি রপ্তানি কম হচ্ছে। সড়কটি যদি ভালো থাকতো তাহলে বন্দর দিয়ে গড়ে প্রতিদিন ৪’শ ট্রাক পণ্য আমদানি-রপ্তানি হতো যার ফলে বন্দর থেকে ৫শ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আসতো।
হিলি স্থলবন্দর আমদানি রপ্তানিকারক গ্রুপের সভাপতি হারুন উর রশীদ বলেন, হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি করে তা দেশের বিভিন্ন স্থানে সহজভাবে পৌঁছানো যায়। যার কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানের আমদানিকারকরা হিলি স্থলবন্দর ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। যার কারণে করোনা মহামারীর মাঝেও আমদানিকারকরা বেশি করে পণ্য আমদানির ফলে বন্দর থেকে বাড়তি রাজস্ব আহরণ সম্ভব হয়েছে। তবে আরও বেশি পরিমাণ রাজস্ব এই বন্দর থেকে আহরণ করা সম্ভাবনা রয়েছে। হিলি স্থলবন্দরের রাস্তাঘাটগুলো সরু ও ভাঙাচোরাসহ বন্দরের বেশ কিছু অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। এগুলো যদি নিরসন করা হয় তাহলে আরো কয়েকগুণ রাজস্ব আহরণ করা সম্ভব।
বাংলাহিলি কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুল আজিজ বলেন, ভারত অংশে প্রায় ৪শ মিটারের মতো সিঙ্গেল সড়ক রয়েছে যা প্রশ্বস্তকরণের জন্য আমাদের দু’দেশের ব্যবসায়ীদের মাঝে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে একাধিকবার তাদের বলা হয়েছে। তারা এই সড়কটি প্রশ্বস্তকরণের বিষয়ে আমাদেরকে তারা আশ্বস্ত করেছেন এবং এর কাজ অব্যাহত রয়েছে বলে তারা আমাদের জানিয়েছেন। যদি সড়কটি প্রশ্বস্তকরণ করা হয় তাহলে একই সাথে দুটি করে ট্রাক যদি যাওয়া-আসা করতে পারে তাহলে বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি আরও বাড়বে।
হিলি স্থলবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা সোহরাব হোসেন বলেন, বন্দর দিয়ে দুদেশের মাঝে আমদানি রপ্তানি বাণিজ্য কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তবে বন্দর দিয়ে পূর্বে ফলসহ অধিক শুল্কযুক্ত পণ্য আমদানি হতো তা বিগত ৪/৫ বছর ধরে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রয়েছে।
এর ফলে সরকার যেমন বাড়তি রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে তেমনি বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের দৈনন্দিন আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এসব পণ্যগুলো যদি আবারও চালু করা যায় সরকারের রাজস্ব আয় যেমন বাড়বে বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের দৈনন্দিন আয় বাড়বে একইসাথে বন্দরে কর্মরত শ্রমিকদের আয় বাড়বে।
হিলি স্থল শুল্ক স্টেশনের উপকমিশনার কামরুল ইসলাম বলেন, হিলি স্থল শুল্ক স্টেশনে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩১২ কোটি ২৯ লাখ টাকা যার বিপরীতে রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৩৯৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা। এতে করে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আহরণে প্রবৃদ্ধি ২৮ শতাংশের বেশি।
বিগত অর্থবছরের তুলনায় এটি ১১০ শতাংশের মতো বেশি। হিলি স্থল শুল্ক স্টেশন দিয়ে আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি করে আমাদের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক চেষ্টা করেছেন আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করার জন্য ফলে রাজস্ব আহরণ বেশি হয়েছে।