‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন’

একদিকে করোনা, অন্যদিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ। সঙ্গে আছে লকডাউনের কারণে আয়-রোজগারহীন মানুষের আহাজারি। একদিকে হাসপাতালে সিট নেই, করোনা রোগীর চিকিৎসার সুযোগ নেই, অন্যদিকে অনেক মানুষের ঘরে খাবার নেই। দেশ বর্তমানে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন। অবশ্য শুধু বাংলাদেশ এবং শুধু করোনা নয়, নানা সংকটে গোটা পৃথিবীই আজ জর্জরিত। পৃথিবী যেন সত্যিই এক কঠিন অসুখে আক্রান্ত। কবি জীবনানন্দ দাশ যাকে বলেছিলেন ‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন’!

এ এমন এক সময়, যখন সংকটের পর সংকট ক্রমাগত মাথাচাড়া দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা অথবা প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাগুলো যথাযথভাবে সেসব মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। করোনায় পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশ পর্যুদস্ত। পাশাপাশি চলছে আরও নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগও। উদাহরণ হিসেবে প্রথমে সাইবেরিয়া বা উত্তর-পশ্চিম কানাডাসহ আরও কিছু দেশে উষ্ণতার তরঙ্গ এবং দাবানলের ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। সেই সঙ্গে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির কথাও বলা যেতে পারে। যেসব দেশের বাসিন্দারা এমন বন্যার খবর কেবল গণমাধ্যম থেকেই জানতেন, এবং যাদের ধারণা ছিল, এসব কেবল বহুদূরের দেশে হয়ে থাকে, যা সম্পর্কে তাদের খুব স্পষ্ট ধারণা নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলছে মানবসৃষ্ট দুর্যোগ। মিয়ানমারে সামরিক স্বৈরশাসকের সঙ্গে সাধারণ মানুষের লড়াই এবং রক্তপাত অব্যাহত আছে। আফগানিস্তানে তালেবানদের হত্যাযজ্ঞ অব্যাহত আছে। সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন, পূর্ব আফ্রিকায় সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা সমানতালে চলছে। সবখানে সাধারণ মানুষ সীমাহীন দুরবস্থার কবলে নিপতিত হচ্ছে।

এদিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, এক ‘অমর ভাইরাস’ তার প্রায় এক ডজন প্রজাতিকে নিয়ে ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে। যার বিপরীতে কোনো ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা সমষ্টিগত প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করা সেভাবে সম্ভব নয়। সম্প্রতি ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি নিবন্ধ জানাচ্ছে, ‘সার্স-কোভ-২’ ভাইরাস মরবে তো না-ই, বরং তা আগামী বছরগুলোতে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বাতাসের গতিতে এদিক ওদিক দৌড়ে বেড়াবে। এ কথার মর্মার্থ এই যে, যাকে এক সময় ‘স্বাভাবিক জীবন’ বলে মনে করা হতো, সেই জীবনছন্দ খুব তাড়াতাড়ি ফিরবে বলে মনে হয় না। পাশাপাশি গণতন্ত্র ও উদারপন্থার যুগ আপাত মুক্ত সমাজগুলোতে ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা, অস্বচ্ছতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার অভাবে উবে যেতে বসেছে। নব্য স্বৈরতান্ত্রিক শাসকরা সর্বত্রই নতুন প্রযুক্তি মারফত নজরদারির সমাজ গড়ে তুলছেন। দানবাকার করপোরেট সংস্থাগুলোর শুঁড় ক্রমেই সর্বত্র প্রবেশ করছে। যা দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়ে চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কোনো সংশোধনমূলক পদক্ষেপ না নিলে বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক জর্জ অরওয়েলের বিভিন্ন রচনায় বর্ণিত ‘দুঃস্বপ্নের কাল’ নেমে আসতে পারে।

শক্তিধর দেশগুলোর কর্র্তৃত্বের দ্বন্দ্ব তো রয়েছেই। যখন আঞ্চলিক স্তরে প্রভুত্বের উদ্দেশ্য নিয়ে চীনের বহুমুখী ক্ষমতার উত্থান শুরু হলো, তখন তাকে আটকানোর জন্য আমেরিকার সংগ্রাম বিশ্বের ক্ষমতা-কাঠামোর মধ্যে এক পরিবর্তনকে দৃশ্যমান করে তুলল। ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ’ এক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলো। এই ধরনের ক্ষমতাকেন্দ্রের বদল সাধারণত সামরিক সংঘাতের মাধ্যমেই দেখা যায়। নাৎসি জার্মানির উত্থানের পেছনে যেমন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একটা বড় ভূমিকা ছিল। যেভাবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে জাপানের উত্থান ছিল এক দশকব্যাপী রুশ-জাপান যুদ্ধের অপ্রত্যাশিত ফল।

সাম্প্রতিক সংকটের পেছনে অন্যতম কারণ হলো ক্রমবর্ধমান অসাম্য। যা ধনী-দরিদ্র-মধ্যবিত্ত নির্বিশেষে যাবতীয় দেশের সামাজিক ভবিষ্যৎ স্থিতাবস্থাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এক আপাত অবহেলিত সচেতনতা কঠিন বাস্তব থেকে বেরিয়ে গিয়ে সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় এবং জাতিভিত্তিক বৈরিতার মধ্য দিয়ে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। যার জন্য দায়ী মূলত শাসকদের অতিলোভ ও মূঢ়তা। ইতিমধ্যে নীতিনির্ধারকরা রাজস্ব ও আর্থিক নিরীক্ষা চালাতে গিয়ে মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সম্মুখীন হয়ে পড়ছেন। এসব ঘটনার পেছনে যে শক্তিগুলো ক্রিয়াশীল, সেগুলোর শেকড় অত্যন্ত জটিলভাবে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, সামাজিক ক্রিয়াকর্মের দুর্বলতা, ইতিহাসঘটিত গণস্মৃতি, ক্ষমতা ও সম্পদের প্রতি আদিম লিপ্সা এবং প্রযুক্তির নিরন্তর কুচকাওয়াজ ইত্যাদির মধ্যে নিহিত। এই সব কিছুই এমন এক অনাগত সভ্যতার কথা বলে, যখন ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ওপরে মানবিক নিয়ন্ত্রণ স্থাপিত। এক ধরনের বিশেষ মানব প্রজাতি নির্মিত এবং যখন পৃথিবী বিবর্তনের কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে গিয়েছে। প্রতিটি অগ্রগতিই এমন মায়া তৈরি করে যে, প্রতি মুহূর্তেই মনে হয়, সাহিত্যিক চার্লস ডিকেন্সের ভাষায় ‘এই বুঝি আমরা সরাসরি স্বর্গে পৌঁছে যাচ্ছি।’ ডিকেন্সকে অনুসরণ করে এ কথাও বলা যায় যে, আমরা সবাই ‘ভিন্ন রাস্তায়’ সরাসরি স্বর্গে পৌঁছাচ্ছি। কিন্তু এই মোহে পড়ে পুরো সিস্টেমের মধ্যেই অসুখ বাসা বেঁধেছে। সেই অসুখের শিকার শুধু রাষ্ট্র নয়, ব্যক্তিমানুষও। যার উপসর্গ, অসম্ভব উচ্চাশা, ক্ষমতার লোভ, হিংসা ও স্বার্থপরতা। অস্থির এই সময়ে সেই অসুখ ছড়িয়েছে মহামারীর মতো। স্বার্থপরতা কিন্তু আগেও ছিল, এখনো আছে। তবে তার মাত্রাবৃদ্ধি হয়েছে। নিস্পৃহভাবে অপরের মুখ ম্লান করে দেওয়ার ব্যাপারে কোনো কার্পণ্য নেই। সংবাদমাধ্যমে তেমন খবর প্রকাশিত হয় নিয়মিত। প্রযুক্তির কল্যাণে ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী, আর মানুষ সেই ছোট পৃথিবীর মধ্যে আরও ছোট ঘরে বৃত্তাবদ্ধ করে ফেলছে নিজেকে। সমাজের অসম বিকাশ, জীবন-জীবিকার সংকট, যৌথ পরিবারের অবলুপ্তি, নিঃসঙ্গতা প্রভৃতি স্বার্থপরতার মাত্রাবৃদ্ধির কারণ। আমাদের এই বসুন্ধরা মানুষের স্বার্থপরতা আর নির্দয়তায় পীড়িত হচ্ছে প্রতিদিন।

এই প্রবণতাগুলোর মোকাবিলা কোনো নাগরিক কীভাবে করবেন? পৃথিবী এই মুহূর্তে জলবায়ুগত পরিবর্তনের মারাত্মক বিপদের সামনে দাঁড়িয়ে। কিন্তু তা থেকে সাবধান হওয়ার সময় চলে গিয়েছে। চলছে মাশুল গোনার পালা। সামাজিক অসাম্য এবং তা থেকে জন্মানো রাজনৈতিক বিপদগুলো নতুন সমাজ-শর্ত দাবি করে। যেখানে ধনীরা স্বল্পমেয়াদি স্বার্থরক্ষাকে দূরে সরিয়ে ভাবনাচিন্তা করবেন। এক ব্রিটিশ মন্ত্রীর কথা মনে পড়ছে, যিনি গত শতকের প্রথমার্ধে তার জাতপাতভিত্তিক সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের জন্য যথাযথ কারণেই অপমানিত হয়েছিলেন। তার নাম উইনস্টন চার্চিল। কিন্তু তার কিছু অন্য দিকও ছিল।

সংস্কারক চার্চিল খনি শ্রমিকদের জন্য দৈনিক আট ঘণ্টার কাজের সময় বেঁধে দেওয়া, ন্যূনতম পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা, শ্রমিকদের আহারের জন্য অবকাশ নির্ধারণ করা, নিয়োগকেন্দ্র স্থাপন, বেকারদের জন্য রাষ্ট্রের তরফে ভর্তুকিসহ বীমা প্রকল্প ইত্যাদি করেছিলেন। শোষক চরিত্রের মালিকপক্ষকে আদালতে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা অবশ্য তার কাছ থেকে আশা করা যায় না। কিন্তু তিনি সম্পদের ভিত্তিতে কর নির্ধারণের পক্ষপাতী ছিলেন। তার মানে এই নয় যে, চার্চিল একজন বাম মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি ছিলেন। বরং বলা যায় চার্চিল ছিলেন স্বচ্ছতর ব্যবস্থার পক্ষে। তেমন স্বচ্ছতর ব্যবস্থা আবার প্রয়োজন, যা সংকটাপন্ন গণতন্ত্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করবে। এমন ব্যবস্থা না থাকলে এই বিপন্নতার গভীরে পৌঁছে তা মেরামত সম্ভব নয়। নানা সংকটে জর্জরিত সাধারণ মানুষ তাই হতাশ হয়ে জীবনানন্দের মতোই যেন অনুভব করছে ‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন।’ কিন্তু এ অসুখ কেমন, তা কেউ তেমন জানে না। আর এখানেই আমাদের ভয় ঘাপটি মেরে বসে আছে। যা আমাদের অচেনা, অজানা, তাকেই আমাদের যত ভয়। রোগের চেয়ে ভয় ছড়িয়ে যায় বেশি। ভয়ের মতো ছোঁয়াচে আর কী-ই বা আছে! তবে সবাই ভীতু নয়, কেউ কেউ ভীতু। অনেকে কিন্তু লড়াই করে। লড়াই করে জেতে। অন্যরা সেই লড়াইয়ের জয় ভোগ করে।

মহাভারতের উপখ্যানে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন, এই যুদ্ধে যদি তোমার মৃত্যু হয়, তবে স্বর্গবাস করবে। যদি জয়ী হও, তবে তুমি হবে পৃথিবীর অধীশ্বর। কিন্তু লড়াইটা তো করো। সেই প্ররোচনা যেন আজও বাতাসে ঘুরে ঘুরে মানুষকে কিছু বলে। আমাদের চার দিকে তো বেঁচে থাকারই ঢেউ, বেঁচে থাকারই আধিপত্য। কত কষ্ট করেও তো কত মানুষ নানাভাবে বেঁচে থাকাটুকু ধরে রেখেছে। কত মূল্যবান এই বেঁচে থাকাটুকু, তা কি আর সবাই বুঝতে চায়! মনে রাখতে হবে যে, মানুষ যেমন অসুখে কাবু হয়, শেষ পর্যন্ত মানুষই পৃথিবীর অসুখ সারানোর ক্ষমতা রাখে।

লেখক লেখক ও কলামনিস্ট

chiros234@gmail.com