‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ ঠিকাদারকেই বেছে নিচ্ছে রাসিক!

একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ফের নতুন করে একটি সড়ক আলোকায়নের কাজ দিয়েছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক)। ‘হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন’ নামে ওই প্রতিষ্ঠানটির আগের কাজের সংশ্লিষ্ট নথিপত্র জব্দ করে তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এরই মধ্যে নতুন একটি প্রকল্পের কাজও তাদের দেওয়ায় জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন’ গত বছর রাজশাহী নগরীর ১৬টি জায়গায় সুউচ্চ ফ্লাডলাইট স্থাপন করে। ওই কাজে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এরপর রাসিকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে কাজের নথিপত্র জব্দ করে নিয়ে যায় দুদক। এরই মাঝে হ্যারো নগরীর নতুন বিলশিমলা থেকে কাশিয়াডাঙ্গা মোড় পর্যন্ত ৪ দশমিক ২ কিলোমিটার সড়কে সড়কবাতি বসানোর কাজ পায়। সড়কটির ডিভাইডারে বসানো হয়েছিল ১৭৪টি দৃষ্টিনন্দন বাতি। খুঁটিগুলোর ওপরের অংশে প্রজাপতির মতো ডানা মেলে থাকা দুই পাশে দুটি করে এলইডি বাতি লাগানো হয়। এ কারণে সড়কটি ‘প্রজাপতি সড়ক’  নামে পরিচিতি পায়। এসব বাতি বসাতে ব্যয় হয় পাঁচ কোটি ২২ লাখ টাকা। অথচ দুই মাস না যেতেই গত ৪ এপ্রিল বিকেলে মৌসুমের প্রথম হালকা ঝড়েই ৮৬টি খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরমধ্যে উপড়ে যায় ৪০টি, আর হেলে যায় ৪৬টি। হালকা ঝড়েই এত দামি বাতি ও খুঁটি হেলে পড়ায় অভিযোগ ওঠে অনিয়মের। কিন্তু এরইমধ্যে একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নগরীর আলিফ-লাম-মীম ভাটার মোড় থেকে ছোটবনগ্রাম, মেহেরচ-ী, বুধপাড়া, মোহনপুর হয়ে চৌদ্দপায় পর্যন্ত নির্মিত নতুন চার লেন সড়কে সড়কবাতি বসানোর কাজ পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী আশরাফুল হুদা টিটো নিজেই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি জানিয়েছেন, পুরো সড়ক নয়, অর্ধেক কাজ পেয়েছেন। বাকি অর্ধেক কাজ পেয়েছে আরেকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

টিটো আরও জানান, তিনি চীন থেকে সড়কবাতির খুঁটি এনে বসাবেন। তবে কত টাকার কাজ বা কাজের মেয়াদ কতদিনÑ সেসব বিষয়ে কিছু জানাতে চাননি টিটো। তিনি বলেন, ‘খুঁটি বসাতে আমরা ইতিমধ্যে খননের কাজ শুরু করেছি।’

জানা গেছে, ছয় দশমিক ৭৯৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে চার লেন এই সড়কটিতে সড়কবাতির খুঁটি বসানো হবে ২৮৫টি। এরমধ্যে ২৪০টি খুঁটিতে দুটি করে মোট ৪৮০ সড়কবাতি এবং বাকি ৪৫টি খুঁটিতে একটি করে বাতি বসানো হবে।

বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার বিষয়ে বক্তব্য জানতে রাসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক ও বিদ্যুৎ) রেয়াজাত হোসেনের মোবাইল ফোনে গত কয়েকদিন ধরে কল করা হলেও তিনি ধরেননি। অফিসে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। আর অফিসের টেলিফোনে কল করলে ওই শাখার কর্মচারী বলেন, ‘স্যার অফিসে নাই।’

তবে কয়েকদিন আগে অন্য একটি প্রতিবেদনের বিষয়ে কথা বলার সময় প্রকৌশলী রেয়াজাত হোসেন নতুন করে হ্যারোর কাজ পাওয়ার কথা স্বীকার করেন।

দুদকের রাজশাহী জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, ১৬টি ফ্লাডলাইট বসানোর কাজে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর সিটি করপোরেশন থেকে ওই কাজের নথিপত্র জব্দ করা হয়েছে। কিন্তু করোনার কারণে আর এ ব্যাপারে অগ্রগতি হয়নি।’

অভিযোগ থাকার পরও হ্যারোকে কাজ দেওয়াকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে নগরবাসী। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর রাজশাহী জেলা সভাপতি আহম্মেদ শফিউদ্দিন বলেন, ‘আইনগতভাবে এই কাজে যদি কোনো অভিযোগ থেকে থাকে সেটি যারা সিদ্ধান্ত গ্রহণের কর্র্তৃপক্ষ তাদের দ্বারা এটি খতিয়ে দেখতে পারে। আইনগত বিষয়টি দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। আর দ্রুততম সময়ে দুদকের তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া উচিত।’

সুশাসন বিষয়ক গবেষক সুব্রত পাল বলেন, ‘যে অভিযোগগুলো হ্যারোর বিরুদ্ধে এসেছে সেগুলোর সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিকে সিলগালা করা উচিত। আর একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পরও সিটি করপোরেশন এগুলো আমলে না নিলে নেতিবাচক হবে।’