বর্শায় সোনা গাঁথলেন নিরাজ

অভিনব বিন্দ্রা প্রায়ই আক্ষেপ করতেন। তারপর আর কেউ অলিম্পিকের একক ইভেন্টে ভারতকে স্বর্ণপদক এনে দিতে পারেনি ভেবে প্রায়ই দুঃখ প্রকাশ করতেন এই শুটার। ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকে সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে ১০ মিটার এয়ার রাইফেলের স্বর্ণ জিতে ইতিহাস গড়েছিলেন এই শুটার। তারপর কেটে গেছে ১৩টি বছর। হয়েছে অলিম্পিকের দুটি আসর। কিন্তু লন্ডন ও রিওতে সোনার হাসি হাসা হয়নি কোনো ভারতীয়র। বিন্দ্রার সেই আক্ষেপ কাল ঘুচিয়ে দিয়েছেন নিরাজ চোপড়া। অলিম্পিকের ইতিহাসের দ্বিতীয় ভারতীয় হিসেবে জিতে নিয়েছেন একক ইভেন্টে কাক্সিক্ষত সোনার পদক। তাও সেটা ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড থেকে। যে ডিসিপ্লিনে অতীতে কখনই পোডিয়ামে ওঠা হয়নি কোনো ভারতীয়র। ১৯০০ প্যারিস গেমসে অবশ্য অবিভক্ত ভারতবর্ষের হয়ে অংশ নিয়ে পুরুষ ২০০ মিটার ও ২০০ মিটার হার্ডলসে রুপা জিতেছিলেন ব্রিটিশ অ্যাথলেট নরম্যান প্রিচহার্ড। পুরুষ জ্যাভলিন থ্রোতে দুই চেক প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে সেরা হয়েছেন ২৩ বছরের হরিয়ানার তরুণ নিরাজ। দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় ৮৭.৫৮ মিটার ছুড়েই সবাইকে ছাড়িয়ে যান কৃষকের ঘরে জন্ম নেওয়া এই ভারতীয়।

নিরাজের হাত ধরে অলিম্পিকের ইতিহাসে দশম স্বর্ণপদকের স্বাদ পেল ভারত। এর আগে পুরুষ হকিতে ভারত সোনা জিতেছে আটবার। টোকিও অলিম্পিকে এটি ভারতীয়দের সপ্তম পদক, যা তাদের বসিয়েছে ৪৭তম স্থানে। এক আসরে ভারতের সর্বোচ্চ পদক জয়ের রেকর্ডও এটি। এই ইভেন্টে রুপা ও ব্রোঞ্জ জিতেছেন চেক প্রজাতন্ত্রের দুই প্রতিযোগী জাকুব ভাদলেজচ ও ভিতেজসøাভ ভেসেলি। তবে দুজনের কেউই নিরাজের প্রথম প্রচেষ্টার ৮৭.০৩ মিটারও পেরুতে পারেননি। ভাদলেজচ ৮৬.৬৭ মিটার ছুড়ে রুপা ও ভেসেলি ব্রোঞ্জ নিশ্চিত করতে ছুড়েছেন ৮৫.৪৪ মিটার।

বাছাইয়ের ইতিহাস গড়ার একটা ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছিলেন নিরাজ। বাঘা বাঘা জ্যাভলিন থ্রোয়ারদের পেছনে ফেলে বাছাইয়ের প্রথম প্রচেষ্টাতেই ৮৬.৫৯ মিটার ছুড়ে সবার ওপরে থেকে ফাইনাল নিশ্চিত করেন তিনি। কাল ফাইনালের প্রথম প্রচেষ্টাতেই বুঝিয়ে দেন দিনটি তার। দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় নিজেকে ছাড়িয়ে যান তিনি। তৃতীয় প্রচেষ্টা তেমন ভালো হয়নি। চতুর্থ ও পঞ্চম প্রচেষ্টা ফাউল হয়। ষষ্ঠ ও শেষ প্রচেষ্টার আগেই অবশ্য স্বর্ণপদক নিশ্চিত হয়ে যায় তার। শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত হওয়ার শেষ প্রচেষ্টায় ৮৪.২৪ মিটার ছুড়ে আনুষ্ঠানিকতা সেরেই উল্লাসে মেতে ওঠেন নিরাজ।

এর আগে ভারোত্তোলনে রুপা জিতে টোকিও গেমসে ভারতের নাম পদক তালিকায় তোলেন মীরাবাঈ চানু। এরপর রিওতে রুপাজয়ী শাটলার পিভি সিন্ধুর হাত ধরে আসে ব্রোঞ্জপদক। বক্সার লাভলিনা বরগোহাই ব্রোঞ্জ জিতে পদকসংখ্যা তিন করেন। ভারতীয় পুরুষ হকি দল ৪১ বছর পর পদকের স্বাদ পায় ব্রোঞ্জ নির্ধারণী ম্যাচে জার্মানিকে হারিয়ে। রেসলার রবি কুমার রুপা ও বজরং পুনিয়া ব্রোঞ্জ জেতেন। এরপর নিরাজের হাত ধরে কাটে স্বর্ণপদকের খরা।

দেশকে স্বর্ণপদক এনে দিতে পেরে গর্বিত নিরাজের কাছে সব কিছুই অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে, ‘এটা সত্যিই কল্পনাকে হার মানাচ্ছে। অ্যাথলেটিকসে ভারত প্রথমবারের মতো স্বর্ণপদক পেয়েছে আমার মাধ্যমে, যা আমাকে গর্বিত করেছে। একক ইভেন্টে এর আগে আমরা একবারই স্বর্ণপদক জিতেছিলাম। দীর্ঘদিন পর দেশ আরেকবার স্বর্ণজয়ের আনন্দে ভেসেছে। বাছাইপর্বেই ভালো পারফরম্যান্স করার পর থেকেই মনে হচ্ছিল ফাইনালে আরও ভালো কিছু করার সামর্থ্য আমার আছে। তবে ভাবিনি শেষ পর্যন্ত পদকের রংটা হবে সোনালি। আমি সত্যি আমার দেশের জন্য গর্বিত।’ অভিনব বিন্দ্রাও তাৎক্ষণিক প্রশংসায় ভাসিয়েছেন টুইট করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার টুইটারে নিরাজের প্রশংসা করেছেন।

স্তুতির পাশাপাশি নিরাজের জন্য আকর্ষণীয় অর্থ পুরস্কারের ঘোষণাও শুরু হয়ে গেছে ভারতজুড়ে।