৩ থেকে ৯ আগস্ট। স্বপ্নের মতো ক’টা দিন। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অন্যতম সেরা সাফল্যের। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই সিরিজে প্রাপ্তির খাতা একদম পরিপূর্ণ বাংলাদেশের। অবশ্য একটা কিন্তু আছে, তা হলো ব্যাটিং। পুরো সিরিজে দলীয় বা ব্যক্তিগত রানের হিসাব ধরলে খুশি হওয়া যায় না মোটেই। আবার ওই রকম কঠিন উইকেটে ব্যাটসম্যানদের প্রতি আঙুলও তো তোলা যায় না। তাদের হয়ে জয়ের কাজ যে করেছেন বোলাররা। স্মরণীয় এ অর্জনের পরও বাংলাদেশকে শুনতে হচ্ছে একটি প্রশ্ন, এমন উইকেটে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি কতটা হলো। গত দুই সিরিজ ধরে জাতীয় দলের সঙ্গে থাকা নির্বাচক আবদুর রাজ্জাক এই মানসিকতার বিরুদ্ধে। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, তার কাছে অস্ট্রেলিয়া সিরিজ বিশ্বকাপের প্রস্তুতির জন্য ছিল না মোটেই। সেভাবে দেখতেও চান না তিনি। বরং এই সিরিজ জয়ের আত্মবিশ্বাসটাই বড়। সাবেক এ স্পিনারের চোখে– সিরিজ জেতাটাই তো আসল প্রস্তুতি।
যে কোনো আসরের আগে মনোবল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইতিবাচক মানসিকতায় টুর্নামেন্টে কত দলের ভাগ্যই তো বদলে যায়। সেই মানসিকতাটাই যদি না আসে তবে লড়াইয়ের সাহসটাই তো তৈরি হয় না। অস্ট্রেলিয়াকে ঘরের মাঠে ৪-১ এ সিরিজ হারিয়ে ইতিবাচক মানসিকতা অর্জিত হয়েছে ক্রিকেটারদের। তবুও ধীর ও নিচু উইকেট বানোনোর সমালোচনা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিশ্বকাপের আগে এমন উইকেটে না খেললেও হতো এই পরামর্শও আসছে। আবদুর রাজ্জাক বিষয়টিতে পাল্টা প্রশ্ন রাখছেন ব্যাটিং উইকেট করে হেরে গেলে ক্ষতি তো বাংলাদেশেরই। বিশ্বকাপের আগে সিরিজ হারের ধাক্কা সামলানো তখন সহজ হতো কি? তাই রাজ্জাকের আহ্বান সিরিজ জয়কেই বড় করে দেখা উচিত, ‘দেখুন জেতার চেয়ে বড় প্রস্তুতি হয় না। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সিরিজটি আমরা এত ভালোভাবে জিতলাম তবুও কেন উইকেট-কন্ডিশন নিয়ে প্রশ্ন আসে। এখানে যদি ব্যাটিং উইকেট হতো, তাহলে অস্ট্রেলিয়া জিতত, আমরা দেখতাম। কিন্তু এখন আমরা সিরিজ জিতেছি এই ভালো ও সাফল্যের জিনিসটি ভুলে অন্য কথা হচ্ছে। এখানে যদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কথাই ধরা হয়, তাহলে বিশেষজ্ঞের তো প্রয়োজন নেই। দল নির্বাচনের জন্য নির্বাচকদের দরকার হবে না, কোচদের দরকার হবে না। আসলে আইসিসির টুর্নামন্টে তো সবসময়ই ভালো উইকেট থাকে স্পোর্টিং উইকেট। আর ওমান বা আমিরাতের উইকেট তো আহামরি কঠিন হবে না। তাছাড়া যে কোনো কন্ডিশনে জেতার অভ্যাস তৈরিটাই তো বড় ব্যাপার। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজকে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি সিরিজ তো বলা যাবে না, কারণ আমরা তো অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে প্রস্তুতি করব না। এই সিরিজ জয়ে আমি অবশ্যই ক্রিকেটারদের সাধুবাদ দিতে চাই। তারা পুরো সিরিজেই দারুণ খেলেছে। তাই আবারও বলছি সিরিজ জয়ের চেয়ে বড় প্রস্তুতি হয় না।’
জিম্বাবুয়ের পর অস্ট্রেলিয়া, টি-টোয়েন্টিতে এই প্রথম টানা দুই সিরিজ জিতল বাংলাদেশ। ৮ ম্যাচে ৬ জয়। টি-টোয়েন্টিতে এমন সাফল্য বাংলাদেশের এটাই প্রথম। এরপর নিউজিল্যান্ডের সঙ্গেও বড় ব্যবধানে জিতলে বিশ্বকাপের আগে সেরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে যেতে পারছে মাহমুদউল্লাহরা। টানা দুই সিরিজে জয়ের জন্য ক্রিকেটারদের নিবেদন বা আগ্রহ চোখে পড়ার মতো। প্রতি ম্যাচেই বাকিদের ব্যর্থতা ঢাকার মতো পারফরম করে দিচ্ছেন কেউ কেউ। বিষয়টিকে দারুণ ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন রাজ্জাক। তার কাছে টি-টোয়েন্টিতে জয়ের প্রক্রিয়া অনেকটাই শিখে ফেলেছে বাংলাদেশ, ‘আগে আমরা টি-টোয়েন্টিতে জিততাম কম। এখন জিতে চলেছি। আসলে কীভাবে জিততে হয় তা শিখছি। টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টগুলো কিন্তু আনপ্রেডিক্টেবল হয়, ভুল হলে তা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ কম থাকে। আবার এক ম্যাচে যে-রকম হয়, পরের ম্যাচে দেখা যায় ভিন্ন পরিস্থিতি। তাই আমি বলব এখন আমরা একেক পরিস্থিতিতে কীভাবে ম্যাচ জিততে হয় সেটা শিখছি।’
অস্ট্রেলিয়া সিরিজে বাংলাদেশের সেরা প্রাপ্তি মোস্তাফিজুর রহমানের ফিরে আসা। ইনজুরির সঙ্গে লড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলা ফিজ যেন সেই ২০১৫-তে ফিরিয়ে আনলেন। পুরো সিরিজে ১৭ ওভার বল করে ৬০ রান দিয়ে হয়েছেন সবচেয়ে ইকোনমিক্যাল বোলার। ওভারপ্রতি মাত্র ৩.৫২ রান দিয়ে নিয়েছেন ৭ উইকেট। গত দুই সিরিজে মোস্তাফিজকে খুব কাছ থেকে দেখা রাজ্জাক জানান, অনেক পরিশ্রমের পরই সেরাতে ফিরেছেন ফিজ, ‘আসলে আমাদের কন্ডিশনে স্পিনারদের সুযোগ বেশি থাকে। আর এইরকম পিচে মোস্তাফিজ যে পরিকল্পনায় বল করে সেভাবে সফল হওয়ার চান্স বেশি। যে সময়টায় সে ভালো করেনি তখন সবাই জানে যে কত কঠিন ইনজুরি সে পার করেছে। তাছাড়া ইনজুরির পর নানা পারিপাশির্^কতা কাটিয়ে একজন ক্রিকেটারকে ফিরে আসতে হয়। একটু সময় নিলেও সে সেসব কিছু কাটিয়ে ফিরেছে। একজন বোলার ব্যাটসম্যানদের রিড না করলে উইকেট পেত না বা ভালো মানের বোলার হয় না। এটা স্বাভাবিক। মোস্তাফিজ সবসময়ই ব্যাটসম্যানদের রিড করতে পারত। সেই ধারাবাহিকতায় এখন বেশি উইকেট পাচ্ছে।’