খাল দখল করে প্লট বিক্রি

সাভারের তেঁতুলঝোড়া-বনগাঁও ইউনিয়নের বুক চিরে বয়ে গেছে বামনী খাল ও সংলগ্ন বিশাল জলাশয়। যেখানে একসময় চলাচল করত ছোট জাহাজ ও কোশা নৌকার মতো বিভিন্ন প্রকারের বড় বড় নৌযান। বলিয়ারপুর, যাদুরচর, চান্দুলিয়া, হেমায়েতপুর, জয়নাবাড়ী, মধুরচর ও মেইটকাসহ আশপাশের বিভিন্ন জনপদের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র পথ এই বামনী খাল ও সংলগ্ন জলাশয়। ব্রিটিশ শাসনামলে পরিচালিত সরকারি জরিপের (সিএস) পর্চায় খালের অস্তিত্ব থাকলেও পরে দেশের চলমান সর্বশেষ জরিপের (বিএস) পর্চায় দেখা যাচ্ছে, বামনী খালের অস্তিত্বই নেই, সেই দাগে এখন দেখানো হয়েছে পাকা রাস্তা।

এলাকাবাসী বলছে, খালের জমি দখলের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে জালিয়াতির মাধ্যমে বামনী খালকে কাগজে-কলমে হাওয়া করে দিয়েছে স্থানীয় কয়েকটি হাউজিং কোম্পানি। স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধিসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির গড়ে তোলা তিনটি আবাসন প্রতিষ্ঠান কয়েক মাস ধরে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দিনরাত মাটি ফেলে খালটি ভরাট করছে প্রকাশ্যেই। অথচ বামনী খালের অবস্থান সরকারি জমি দেখভালের দায়িত্বে থাকা সাভার উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড কার্যালয়ের সর্বোচ্চ ২০০ গজের মধ্যে।

এদিকে বিক্ষোভ-মানববন্ধনসহ এলাকাবাসীর নানা প্রতিবাদের মুখেও মাটি ভরাট করে বামনী খালে দখল কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে হাউজিং কোম্পানিগুলো। উল্টো আন্দোলন না করার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে প্রতিবাদকারীদের। এমন পরিস্থিতিতে ইতিমেধ্যে কমপক্ষে ২০টি গ্রামের পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পানির প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতে বাড়িঘর তলিয়ে যাচ্ছে। রাস্তাঘাটও তলিয়ে যাওয়ায় নৌকায় চলাচল করতে হয়। এছাড়া বৃষ্টির পানির সঙ্গে বিভিন্ন কারখানার ময়লা-আবর্জনামিশ্রিত পানি এসে বাড়িঘরে জমছে। ফলে গার্মেন্টস শ্রমিকসহ বিভিন্ন বাড়িঘরের ভাড়াটিয়ারা অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে চরম কষ্টে দিনযাপন করছেন সেখানকার বাসিন্দারা।

বনগাঁও ইউনিয়নের সত্তরোর্ধ্ব আনসার মিয়া। বিলীনের হুমকির মুখে থাকা বামনী খাল দখলের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে তিনি হতাশ কণ্ঠে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই খালে কত বড় বড় কোশা নৌকা আইতো। আমরা মাছ ধরতাম। এই কথা কইয়া হইবো কী? এহন তো খালই নাই, প্লট হইয়া গেছে সব। ওই যে ব্রিজের নিচ দিয়া হেইদিক সবই খাল ছিল।’

বামনী খাল দখলকারী কারও নাম সরাসরি না বললেও ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বৃদ্ধ আনসার মিয়া আরও বলেন, ‘এহন তো মালিক হইয়া গেছে সবাই, কয় আমগো বাপ-দাদার জমি, আমরা কিনছি।’

এভাবেই বিশাল বামনী খাল এখন বিলীনের পথে। আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল-ভরাটে খালটির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। সেই সুযোগে দখল হওয়া বামনী খালেই প্লট বিক্রি করছে তিনটি আবাসন প্রতিষ্ঠান। তবে খাল দখলের অভিযোগ স্বীকার করছে না কোনো প্রতিষ্ঠানই। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো একে অন্যকে দোষারোপের মাধ্যমে দায় শেষ করছে। অভিযুক্তদের কেউ কেউ দাবি করছেন, তারা নিজেরাই খাল রক্ষার জন্য মানববন্ধনসহ যে যে জায়গায় যাওয়া দরকার সেখানেই যাচ্ছেন। আর স্থানীয় প্রশাসনও সিএস জরিপে উল্লিখিত খাল উদ্ধার না করে উল্টো যেন দখলদারদের পক্ষ নিচ্ছে। সাভার উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ‘রেকর্ড অনুযায়ী যেভাবে খাল আছে, সেই সীমানা নির্ধারণের কাজ চলছে।’

বামনী খাল ও সংলগ্ন জলাশয়ের বেশিরভাগ অংশ দখলের অভিযোগ উঠেছে নূর মোহাম্মদ নামে এক আবাসন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। তার প্রতিষ্ঠানের নাম ‘জমজম নূর বিল্ডার্স’। দখলদারের তালিকায় রয়েছে সুগন্ধা হাউজিং কোম্পানি নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান, যা আগে ‘আলমনগর’ নামে পরিচিত ছিল। এছাড়া খালের শেষদিক দখলের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বনগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এসএ হাউজিংয়ের বিরুদ্ধে। এসব প্রতিষ্ঠান বালু ফেলে খাল ভরাট করে প্লট বিক্রয় করছে। খাল উদ্ধারের জন্য মানববন্ধন এবং সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করায় প্রতিবাদকারীদের প্রাণনাশ এবং বিভিন্ন ধরনের ঝামেলায় ফেলার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে দখলদার নূর মোহাম্মদের বিরুদ্ধে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বলিয়ারপুর, যাদুরচর, চান্দুলিয়া, হেমায়েতপুর, জয়নাবাড়ী, মধুরচর ও মেইটকাসহ বিভিন্ন এলাকার পানি নিষ্কাশনের একমাত্র পথ বামনী খাল। বেশ কিছুদিন ধরে সেই খালের পানি প্রবাহ বন্ধ করে প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় খালটি ভরাট করছে জমজম নূর বিল্ডার্স। সরেজমিন দেখা যায়, জমজম নূর বিল্ডার্স খালের বড় একটি অংশ ভরাট করে সেখানে ইতিমধ্যে দীর্ঘ একটি রাস্তা নির্মাণ ও বেশ কিছু প্লট তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি সেখানে প্লট বিক্রির জন্য বড় একটি সাইনবোর্ডও ঝুলিয়েছে। প্রকাশ্যে দীর্ঘদিন ধরে এই ভরাটকাজ চললেও সাভার উপজেলা প্রশাসন দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তবে সম্প্রতি এলাকার বাসিন্দা লন্ডনপ্রবাসী সরকার আবু তাসেক ছুটিতে বাড়ি এসে খালটি ভরাটের প্রতিবাদসহ খালের দখল হয়ে যাওয়া জমি উদ্ধারের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে আবেদন করেন। পাশাপাশি তিনি ভুক্তভোগী এলাকাবাসীদের একত্রিত করে খাল উদ্ধারের দাবি জানিয়ে মানববন্ধনসহ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। সম্প্রতি আয়োজিত ওই মানববন্ধন কর্মসূচিতে বক্তারা বামনী খালকে সচল করার দাবি জানান। একই সঙ্গে পানি প্রবাহ বন্ধকারীদের আইনের আওতায় এনে সিএস পর্চা অনুযায়ী খালটি উদ্ধারের দাবি জানানো হয়। তবে এসব করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন তাসেক। তাকে বিভিন্নভাবে হুমকিধমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে দখলদার নূর মোহাম্মদের বিরুদ্ধে। এমন পরিস্থিতিতে নিজের জীবনশঙ্কার কথা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন তিনি।

সরকার আবু তাসেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ম্যানেজ করে সরকারি বামনী খাল ভরাট করছে জমজম নূর বিল্ডার্স ও এর মালিক নূর মোহাম্মদ। খালটি ভরাটের কারণে হেমায়েতপুর, জয়নাবাড়ী, যাদুরচর, মধুরচরসহ প্রায় ২০টি গ্রামে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সিএস নকশায় বামনী খালের অস্তিত্ব বিদ্যমান। ভূমি জরিপকারীদের সহায়তায় জালিয়াতির মাধ্যমে সম্প্রতি হওয়া বিআরএস পর্চায় ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির খতিয়ানে নথিভুক্ত করা হয়েছে এই খালকে। তাই ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি ও এলাকাবাসীর স্বার্থের কথা বিবেচনায় নিয়ে মাটি ভরাট করে খালটি বন্ধ না করার জন্য বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। এ ঘটনার পর থেকে দখলদার নূর মোহাম্মদ ও তার লোকজন বিভিন্নভাবে আমাকে হুমকিধমকিসহ ঝামেলায় ফেলার চেষ্টা করছেন। যে কারণে এখন আমি নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কিত।’

খাল দখলের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জমজম নূর বিল্ডার্সের স্বত্বাধিকারী হাজি নূর মোহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার জমি আমি ভরাট করছি এবং আমরা পাবলিকের জমিও ভরাট করে দিচ্ছি।’

তবে নূর মোহাম্মদ চারটি পর্চা ও নকশায় তার হাউজিং প্রকল্পের ভেতরে কোনো খাল নেই বলে দাবি করলেও সিএস পর্চায় খালের অস্তিত্ব রয়েছে এবং বর্তমানে সরেজমিনও খাল রয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এলাকাবাসীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড গঠিত তদন্ত কমিটি ও তাদের সার্ভেয়ার টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এমন তথ্য জানিয়েছে।

খালের আরেক দখলদার সুগন্ধা হাউজিংয়ের কর্ণধার জাহাঙ্গীর আলম দাবি করেন, খালের কোনো জমি তারা দখল করেননি। তারা নিজেরাও চান খালটি প্রশস্ত করা হোক। তাহলে খাল দখল করল কে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অন্য কোনো হাউজিং কোম্পানির বিরুদ্ধে আমি কিছু বলতে চাই না।’

তবে খাল দখলের জন্য সুগন্ধা হাউজিংকে দায়ী করেছেন আরেক অভিযুক্ত বনগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও এসএ হাউজিংয়ের কর্ণধার সাইফুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুগন্ধা হাউজিং, যা আগে আলমনগর হাউজিং নামে পরিচিতি ছিল তারা রাতের আঁধারে ট্রাক দিয়ে বালু এনে তারপর ভরাট করছে। এখানে আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। আমরা খালের জমি ভরাট করিনি। বরং আমরা মানববন্ধন করছি যে খাল রক্ষা করতে হবে।’

খাল দখলের অভিযোগ ওঠা এই জনপ্রতিনিধি আরও বলেন, ‘খাল উদ্ধারের জন্য এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে আমি যাইনি। খালের কোল ঘেঁষে বেশিরভাগ জমিই আমাদের আত্মীয়স্বজনদের। সেই জমিগুলো দখলের জন্য পাঁয়তারা করছে তারা। বালু দিয়ে খাল ভরাট করে আরও এগোচ্ছে।’

বামনী খাল ভরাটের বিষয়ে জানতে চাইলে পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী নুরুল আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খাল ভরাটের বিষয়ে অভিযোগ পেয়ে আমরা সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। সেখানে সরকারি বামনী খালের পেট ভরাট করে রাস্তা নিয়ে গেছে জমজম নূর বিল্ডার্স। এছাড়া তারা সরকারি হালটও দখল করেছে, যা মেপে সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে তাদের ভরাট করা অংশ নিজ দায়িত্বে ক্লিয়ার করতে বলা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দিলে সেই অনুযায়ী পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সাভার উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাজহারুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসিল্যান্ড অফিস থেকে পরিদর্শন করা হয়েছে। রেকর্ড অনুযায়ী যেভাবে খাল আছে, সেই সীমানা নির্ধারণের জন্য কাজ চলছে। চলমান এ কাজের সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডও আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বামনী খালের বিষয় আমাদের নলেজে আসছে, আমরা রেকর্ড অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’

নিজের কার্যালয়ের ২০০ গজের মধ্যে খাল ভরাটকাজ চললেও তা রোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা জানতে চাইলে সাভার উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রহমত উল্লাহ বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে একটি অভিযোগ করা হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সরকারি হালট চিহ্নিত করে লাল নিশানা লাগিয়ে দিয়েছি। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট তহশিলদারকে খাল ভরাটকারীদের বিরুদ্ধে মামলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এর আগেও খাল ভরাটের বিষয়টি জানিয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর প্রতিবেদন দিয়েছি। তবে সেখান থেকে খালটি উদ্ধার এবং দখলদারের বিষয়ে কোনো ধরনের নির্দেশনা এখনো পাওয়া যায়নি।’

পরিবেশবিদরা বলছেন, মানবদেহের শরীরে যেমন আর্টারি (শ্বাসনালি) রয়েছে, ঠিক তেমনি খাল, বিল, নদীগুলো কোনো ভূখ- ও এর জনপদের আর্টারির মতো। খাল-বিল যদি না থাকে তাহলে পরিবেশের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। এ প্রসঙ্গে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের ইকো সিস্টেম (বাস্তুসংস্থান) গড়েই উঠেছে আমাদের নদীনালা, খাল-বিল ঘিরে। মানবদেহের শরীরে যেমন আর্টারি রয়েছে, ঠিক তেমনি খাল-বিল, নদীগুলো আমাদের আর্টারির মতো। খাল-বিল যদি না থাকে তাহলে আমাদের পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। যারা এরকম দখলদার আছে তাদের বড় ধরনের শাস্তি দেওয়া দরকার। আমাদের উচিত হবে এই নদী, খাল-বিল রক্ষা করা। এগুলোর অভাবে ভূগর্ভস্থ পানিরও সমস্যা হবে। যার ফলে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।’