বেড়েই চলেছে পদ্মা নদীর পানি। ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে গত পাঁচ দিন এ নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে ফরিদপুর ও কুষ্টিয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। প্রায় ৩০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে। পানির সঙ্গে তীব্র নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা।
ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, পদ্মা নদীর গোয়ালন্দ পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় ৭ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। গতকাল শনিবার বিকেলে তা বিপদসীমার ৪১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এতে জেলা সদর, চরভদ্রাসন, সদরপুর ও ভাঙ্গা উপজেলার শতাধিক গ্রামের প্রায় ২৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে বেশ কয়েকটি সড়ক।
ফরিদপুর সদর উপজেলার নর্থ চ্যানেল, ডিক্রিরচর ও চরমাধবদিয়া ইউনিয়নের ৫০টি গ্রামের ৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ডিক্রিরচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান মিন্টু জানান, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে দুর্গতদের আশ্রয়কেন্দ্রে আনা হবে।
নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোস্তাকুজ্জামান জানান, পানিবন্দি ১৩ শতাধিক পরিবারের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে।
ফরিদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুম রেজা জানান, আশ্রয়কেন্দ্রে বন্যাদুর্গতদের রাখার প্রস্তুতি এবং পর্যাপ্ত শুকনো খাবার, শিশুখাদ্য ও গবাদি পশুর জন্য খাদ্য মজুদ রাখা হয়েছে।
চরভদ্রাসন উপজেলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোতালেব হোসেন মোল্লা জানান, তার উপজেলার চার ইউনিয়নের তিনটিই পদ্মার চরাঞ্চলে। মানুষের মধ্যে নদীভাঙনের আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সদরপুরের তিনটি ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামে পানি ঢুকেছে। প্রায় ৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি জীবন কাটাচ্ছে। সদরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান কাজী শফিকুর রহমান জানান, পানিবন্দিদের খোঁজখবর রাখছেন তারা। দ্রুত দুর্গত এলাকায় সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে।
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, ‘সদর উপজেলার কিছু এলাকায় দুর্গতদের সহায়তা করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তালিকা পেলে ত্রাণ বিতরণ করা হবে।’
কুষ্টিয়ায় ভাঙছে পদ্মার পাড় : পদ্মা নদীর কুষ্টিয়া অংশে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। জেলার হার্ডিঞ্জ পয়েন্ট, শিলাইদহ ও গড়াই নদীর রেলসেতু পয়েন্টে পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। গতকাল ভোর ৬টায় হার্ডিঞ্জ পয়েন্টে ১৪ দশমিক ২০ ও গড়াই সেতু পয়েন্টে ১২ দশমিক ৪৮ সেন্টিমিটারে পৌঁছে।
এতে জেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করেছে। তলিয়ে গেছে ফসলি জমি। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্টা দিয়ে শুরু হয়েছে ভাঙন। পানি বৃদ্ধি আগামীকাল সোমবার পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে বলে আভাস দিয়েছে পাউবো। ফলে দ্রুতই বিপদসীমা অতিক্রম করে আরও বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পাউবো কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আফছার উদ্দিন জানান, পাউবোর প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে পাঠানো সতর্কবার্তায় জেলার নদী ভাঙনপ্রবণ ২৫টি স্পট শনাক্ত করে সেখানে নজরদারির জন্য বলা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি স্পটে এ পর্যন্ত ৪০ হাজারের বেশি বালিভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে।
জেলার ছয়টি উপজেলার সবক’টির নিম্নাঞ্চলে কৃষিজমি, বসতঘর পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও নদীর পাড় ভেঙে ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। পাউবোর কুষ্টিয়ার উপসহকারী প্রকৌশলী মুস্তাফিজুর রহমান জানান, বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। প্রয়োজনের তুলনায় ব্যাগের সরবরাহ খুবই কম। টাকা দিয়েও চাহিদা মতো জিও ব্যাগ পাওয়া যাচ্ছে না।
ঠিকাদার হবিবর রহমান জানান, পাউবোর তালিকাভুক্ত ঠিকাদার হওয়ায় তাদের ওপর জরুরি কাজের বোঝা দেওয়া হয়। কিন্তু ঠিকমতো অর্থ ছাড় না হওয়ায় কাজে সমস্যা হয়।
পাউবো কুষ্টিয়ার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আবদুল হামিদ জানান, পদ্মা ও গড়াই নদীর বাঁধের সবক’টি ঝুঁকিপূর্ণ অংশে নজর রাখা হয়েছে। গুরুত্ব বিবেচনায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।