হামলা, সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি মামলার বরিশালে সমঝোতা হয়েছে মেয়র ও প্রশাসনের মধ্যে। জানা গেছে, বিভাগীয় কমিশনারের আহ্বানে তার বাড়িতে এই সমঝোতা বৈঠক হয়। বৈঠকে আওয়ামী লীগ নেতা, প্রশাসনের কর্মকর্তা, বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন। তবে ছিলেন না ইউএনও।
গত ১৮ আগস্ট রাতে বরিশাল সদর উপজেলা পরিষদে হামলা-সংঘর্ষসহ অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। এর জেরে পাল্টাপাল্টি মামলার ঘটনাও ঘটে। তবে রোববার রাতে দুপক্ষের সমঝোতা হয়। আর সমঝোতা বৈঠকের মাধ্যমে গত চার দিনের শহর জুড়ে থমথমে পরিস্থিতিরও অবসান হয়।
সোমবার সকাল থেকেই নগরজুড়ে আলোচনায় ছিল রাতের সমঝোতা বৈঠক। বিভিন্ন চায়ের দোকান বাজারে মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল রাতে প্রশাসনের বৈঠকের বিষয়টি। সাধারণ মানুষ বলছে, সমঝোতা হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে।
তারা বলছেন, বিষয়টি সামনের দিকে এগিয়ে গেলে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হতো। এখানে হারজিতের কোনো বিষয় নেই। সমাধান হয়েছে এটাই বড় বিষয়।
নগরের সদর রোড এলাকার ব্যবসায়ী আলতাব বলেন, বরিশালে এমন ঘটনা আগে কখনো দেখি নাই। যা হয়েছে তার একটা সমাধান দরকার ছিল। প্রশাসন সেটাই করেছে।
বাজার রোড এলাকার ব্যবসায়ী সামসুল বলেন, আমরা অশান্তি চাই না। মেয়র ও প্রশাসনের মধ্যে যে ঘটনা ঘটেছে, তা দেখে আমরা অবাক হয়েছি। তবে আমরা শান্তি চাই। আমরা ব্যবসা করে খাই। দু’পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকলে আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও ভালো চলে না।
নগরের রূপাতলী এলাকার সজীব বলেন, সমাধান হয়েছে সেটাই বড়। এই ঘটনা আমাদের বরিশালে আর যাতে না ঘটে সেদিকে সকলের লক্ষ রাখা উচিত।
ওই ‘সমঝোতা বৈঠক’ ফলপ্রসূ হয়েছে বলে জানিয়েছেন বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এ জাহাঙ্গীর।
জানা গেছে, বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) মুনিবুর রহমানের সরকারি বাসভবনে হামলা ও পরবর্তী উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনে প্রশাসন ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের সমঝোতা বৈঠক আহ্বান করে বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার।
বৈঠকে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট এ কে এম জাহাঙ্গীর, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস, বিসিসির প্যানেল মেয়র গাজী নঈমুল হোসেন লিটু, বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল ইসলাম বাদল, সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শাহাবুদ্দিন খান, বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি এস এম আক্তারুজ্জামান, জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার, জেলার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন, র্যাব-৮ এর অধিনায়ক জামিল হাসান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে উভয় পক্ষ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করে নেয়ার ব্যাপারে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
তবে এ বিষয়ে প্রশাসনের কেউ আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেননি।
বৈঠকে অংশ নেয়া একটি সূত্র জানিয়েছে , ওই রাতের ঘটনা ‘ভুল বোঝাবুঝি’ থেকে হয়েছে বলে আলোচনা হয়। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে বিষয়ে সবাই একমত হন। একই সঙ্গে শান্তি-শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সবাই সহযোগিতা করবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়।
বৈঠক শেষে বিভাগীয় কমিশনারের বাড়ির সামনে প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতারা ছবি তোলেন। যা রাতেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।
এ বিষয়ে সোমবার ইউএনও মুনিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম না। তবে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে উদ্ভূত পরিস্থিতি অবসানে সমঝোতা হয়েছে’।
সোমবার সকালে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শাহাবুদ্দিন খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা যারা বৈঠকে ছিলাম তারা সবাই একমত হয়েছি। আমরা সবাই বরিশালের ভালো চাই, বরিশালে সুন্দর আইন-শৃঙ্খলা চাই, উন্নয়ন চাই। আমরা সবাই মিলে সুন্দরভাবে কাজ করব। সে বিষয়টি বৈঠকে বলা হয়েছে’।
রোববার রাতে বৈঠক থেকে বেরিয়ে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট এ কে এম জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল ইসলাম বাদলের সরকারি বাসভবনে তাদের চায়ের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমন্ত্রণ পেয়ে তিনিসহ বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, বিসিসির প্যানেল মেয়র চা-চক্রে যোগ দেন।
তিনি বলেন, চা-চক্রে উপজেলা পরিষদ চত্বরে ১৮ আগস্ট রাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। আলোচনার মাধ্যমে সেই দিন রাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝির অবসান ঘটেছে।
জাহাঙ্গীর হোসেন আরো বলেন, বৈঠকে সবপক্ষ অতীতের ভুল বোঝাবুঝি ভুলে নান্দনিক বরিশাল গড়ার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। পাশাপাশি ১৮ আগস্ট রাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলাগুলো উভয় পক্ষ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রত্যাহারের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে বিষয়েও সবাই সতর্ক থাকবেন বলে আশ্বস্ত করেন। বলা যায় ইতিবাচক বৈঠক হয়েছে।
গত ১৮ আগস্ট রাতে উপজেলা পরিষদ চত্বরে লাগানো ব্যানার-ফেস্টুন অপসারণকে কেন্দ্র করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনিবুর রহমানের বাসায় হামলার অভিযোগ ওঠে। হামলাকারীদের রুখতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ-যুবলীগের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
প্রতিবাদে বুধবার মধ্যরাত থেকে বরিশালে সড়ক ও নৌ যান চলাচল বন্ধ থাকে প্রায় ৭ ঘণ্টা। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বর্জ্য অপসারণের কাজ বন্ধ রাখেন বিসিসি’র পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা।
হামলার ঘটনায় ১৯ আগস্ট উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে দুটি মামলা হয়। দুটিতেই বরিশাল সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহকে প্রধান আসামি করা হয়।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের শতাধিক নেতাকর্মীদের মামলায় আসামি করা হয়।
মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে বৃহস্পতিবার থেকে নগরের সড়ক ও বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য অপসারণ ও পরিবহন কার্যক্রম বন্ধ রাখেন পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। এতে দুর্ভোগের শিকার হন নগরবাসী। এরপর মেয়রের নির্দেশে শনিবার রাত ৯টা থেকে বর্জ্য অপসারণের কাজ শুরু করেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা।
তবে বুধবার রাতের ঘটনার রেশ তখনো কাটেনি। রোববার দুপুরে বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) প্যানেল মেয়র ও জেলা আইনজীবী সমিতির সম্পাদক রফিকুল ইসলাম এবং বিসিকের রাজস্ব কর্মকর্তা বাবুল হাওলাদার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পৃথক দুটি নালিশি আবেদন দাখিল করেন।
নালিশি আবেদনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনিবুর রহমান ও কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুল ইসলাম, উপপরিদর্শক (এসআই) শাহ্ জালাল মল্লিক ও পাঁচ আনসার সদস্যের বিরুদ্ধে সিটি মেয়রকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলিবর্ষণ, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশের লাঠি চার্জসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়।
সমঝোতা নিয়ে বিসিসি’র বিজ্ঞপ্তি
‘অতীতের সব ভুল বোঝাবুঝি ভুলে নান্দনিক বরিশাল গড়ার লক্ষ্যে নগর প্রশাসন ও জেলা প্রশাসন ঐক্যবদ্ধ ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার’ প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে বরিশাল সিটি করপোরেশন।
রোববার রাতে বরিশালের বিভাগীয় কমিশনারের বাস ভবনে সমঝোতা বৈঠকের পর সোমবার দুপুর ১টার দিকে গণমাধ্যমে এই বিজ্ঞপ্তিটি পাঠানো হয়।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা এই বিজ্ঞপ্তি প্রদান করেন।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, গত ১৮ আগস্ট রাতে বরিশাল সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সঙ্গে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ভুল বোঝাবুঝির কারণে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছিল তার অবসানকল্পে রোববার (২২ আগস্ট) রাতে বরিশাল বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অতীতের সব ভুল বোঝাবুঝি ভুলে নান্দনিক বরিশাল গড়ার লক্ষ্যে নগর প্রশাসন ও জেলা প্রশাসন ঐক্যবদ্ধ ও আন্তরিকতার সঙ্গে কার করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করছে বরিশাল সিটি করপোরেশন।