গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে নারীর বিরুদ্ধে অসংবেদনশীল আচরণ বন্ধসহ আট দফা দাবি জানিয়েছে ‘স্ফুলিঙ্গ’ নামে নারীদের একটি প্ল্যাটফর্ম।
শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলরুমে এক গোলটেবিল বৈঠকে এ দাবি জানানো হয়।
নারীর বিরুদ্ধে মোরাল পুলিশিং, গণমাধ্যমের অসংবেদনশীলতা এবং আইন ও বিচার বিভাগে পক্ষপাতিত্বের প্রতিবাদে এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
এতে বলা হয়, নারীর বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মোরাল পুলিশিং এবং গণমাধ্যমে নারীর ব্যক্তিগত জীবনকে উন্মুক্ত করে কেলেঙ্কারিকরণের সংবাদ প্রচার করে সমাজের প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক জনমতকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। এটাকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রভাবশালীদের অপরাধকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়।
পাশাপাশি বিচার বিভাগের বিশেষ ক্ষমতাশীল গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাতিত্ব এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক আইনের অপব্যবহার করে নারীদের নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন করার বিষয়টি প্রায়শই পরিলক্ষিত হচ্ছে বলে দাবি করে ‘স্ফুলিঙ্গ’।
সংগঠনটি মনে করছে, একটি রাষ্ট্র এবং তার প্রতিষ্ঠানসমূহের দীর্ঘদিনের অগণতান্ত্রিক এবং পুরুষতান্ত্রিক চর্চাই নারীর বিরুদ্ধে এই অন্যায্যতা তৈরি করছে।
গোলটেবিল বৈঠকে সংহতি জানিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘এই মুহূর্তে বাংলাদেশ আইন-আদালত বলে কিছু নেই। তাই ক্রসফায়ার, গুমের মতো অহরহ ঘটনা আমরা দেখতে পাই।’
তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় বাহিনী যাকে গুলি করতে চায়, তাকেই মেরে ফেলতে পারে। ক্রসফায়ারের পর এই সকল রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিবৃতি যে মিথ্যা তা সমাজের সবাই জানে।’
আনু মুহাম্মদ মনে করেন, ‘গণমাধ্যম নারীবিদ্বেষী এই সকল সংবাদ পরিবেশন করে মূলত জনমত তৈরি করতে যা ইতোমধ্যে ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় নীতিমালা দিয়ে সমাজে প্রচলিত রয়েছে।’
ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সানজিদা নীরা বলেন, ‘গণমাধ্যম এবং বিজ্ঞাপনসমূহ তাদের কাটতি বাড়াতে নারীদের নিয়ে এই ধরনের অসংবেদনশীল সংবাদ পরিবেশন করে।’
আইনজীবী সুলতানা আক্তার রুবি ১৯৯৫ সালের ইয়াসমিন ট্র্যাজেডির ঘটনাটি স্মরণ করে বলেন, ‘তখন একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল ইয়াসমিনের ন্যায়বিচারের পক্ষে। পুরো দেশের সামাজিক আন্দোলন, জনমানুষের আন্দোলন ইয়াসমিন ধর্ষণ এবং হত্যাকাণ্ড অপরাধে ন্যায়বিচারকে সম্ভব করেছিল। অথচ আমাদের এখন সেই গণতান্ত্রিক পরিবেশটাই নেই।’
গোলটেবিল বৈঠকে স্ফুলিঙ্গের পক্ষ থেকে ৮ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হচ্ছে-
১. গণমাধ্যমকে মুক্ত এবং স্বাধীন করতে হবে।
২. আইনের অপব্যবহার করে নাগরিকের ব্যক্তিপরিসরে ঢুকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা বন্ধ করতে হবে।
৩. প্রতিটি গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে নারীর বিরুদ্ধে অসংবেদনশীল আচরণ, শব্দ চয়ন এবং ছবি ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
৪. গণমাধ্যমে নারীর বিরুদ্ধে অসংবেদনশীল সংবাদ পরিবেশন, শব্দ চয়ন এবং ছবি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে এবং তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
৫. প্রতিটি সাংবাদিক এবং গণমাধ্যমকর্মীদের উল্লেখিত নীতিমালা বিষয়ে অবগত করতে হবে এবং জেন্ডার সংবেদনশীলতার প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
৬. নারীর বিরুদ্ধে সমাজের প্রচলিত মোরাল পুলিশিংয়ের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমকে সোচ্চার থাকতে হবে।
৭. নারীর সহিংসতা সংক্রান্ত অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে হবে। এ সকল অভিযোগে তদন্ত না করে অভিযুক্তকে আইনি প্রক্রিয়া থেকে অব্যাহতি দেওয়া যাবে না।
৮. বিচার বিভাগকে স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ করতে হবে।
এতে সশরীরে এবং ভার্চুয়ালি অন্যদের মধ্যে অংশ নেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন, আলোকচিত্রী এবং বাংলাদেশ সাম্যবাদী আন্দোলনের সদস্য জান্নাতুল মাওয়া, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সম্পাদক খান আসাদুজ্জামান মাসুম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য লুনা নুর, নারী মুক্তি কেন্দ্রের ঢাকা নগরের সভাপতি তাসলিমা বিউটি, বিপ্লবী নারী ফোরাম ঢাকা নগরের সদস্য আমেনা আক্তার, আইনজীবী তাসমিয়াহ নুহাইয়া আল আমিন, কথাসাহিত্যিক নুরন্নবী শান্ত, কবি ও সাংবাদিক রহমান মুফিজ, উন্নয়নকর্মী ফেরদৌস আরা রুমী, ওয়াইডাব্লিউসি স্কুলের প্রধান শিক্ষক জেসমিন দিনা প্রমুখ।
গোলটেবিল বৈঠকের শুরুতেই অবস্থানপত্র পাঠ করেন স্ফুলিঙ্গের সদস্য পূরবী তালুকদার। পুরো বৈঠকটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করে স্ফুলিঙ্গের সদস্য মোশফেকা আরা শিমুল এবং ইশরাত জাহান উর্মি।